kalerkantho


হুমায়ুঁ কা মাকবারা

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হুমায়ুঁ কা মাকবারা

ট্রেন এসে দাঁড়াল দিল্লির হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে। এক এক করে নামলাম সবাই। ভোরের নাশতা তখনো করা হয়নি। অথচ বেলা পৌনে ১০টা। চা-নাশতা সারতে ঢুকলাম কাছের এক হোটেলে। পথে গালিব একাডেমিতে ঢুকে চারটি বই সঙ্গে নিয়ে নিলাম। এরপর পথ পেরিয়ে এলাম দিল্লির বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান ‘হুমায়ুঁ কা মাকবারা’র ঠিক নামলিপি বরাবর। উর্দু শব্দ ‘মাকবারা’ মানে সমাধিক্ষেত্র। মোগল সম্রাট হুমায়ুনের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এই সমাধিক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন তাঁরই প্রথম স্ত্রী হাজি বেগম—কথায় কথায় সফরসঙ্গীদের জানালাম সেটা। খানিকটা পথ পার হলেই চোখে পড়ল টিনের চালাঘেরা আঁকাবাঁকা সরু পথ। ‘মুনশি! এর ভেতরেই কি সম্রাট হুমায়ুনকে দাফন করা হয়েছে?’ সহপাঠী দেলোয়ারের কৌতূহলী প্রশ্ন।

মুচকি হেসে বললাম, ‘এগোতে থাকো। জানতে পারবে কদম দুই হাঁটলেই। ’ মিনিটখানেকের রাস্তা পেরিয়ে এলাম প্রাচীরঘেরা মাকবারার মূল প্রবেশপথে। পাঁচজনের জন্য পাঁচটি টিকিট নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। জল ছাড়া কিছুই সঙ্গে নেওয়া যাবে না, সতর্ক করল চেকার। তাই শুনে শামিম ভাই কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘চলুন, বাইরে গিয়ে পেটপুরে খাবার খেয়ে আসি তাহলে। ’ তা এককথায় উড়িয়ে দিয়ে নাজমুল বলল, ‘আরে ধুর! এক দুপুর না খেলে কী হবে? চলো ভেতরে ঢুকেই পড়ি। ’

ভেতরের সবুজ ঘাসে পা ফেলতেই দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। সবাইকে সম্রাট হুমায়ুনের সম্পর্কে বলতে লাগলাম। অস্থির নাজমুলের তা শুনতে বয়ে গেছে, ‘বইয়ে পড়েছি অনেক। সামনে চলো। দরকার হলে আবার পড়ে নেব। এখন দেখতে এসেছি, কাহিনি শুনতে নয়। ’ আলাপে আলাপে আমরা দক্ষিণের পথে কদম বাড়ালাম। হাজির হলাম ঈশা খাঁর সমাধিস্তম্ভের ঠিক সামনে বরাবর। এটি হুমায়ুনের সমাধি এলাকার ভেতরেই। প্রবেশপথ থেকে হাতের ঠিক ডানপাশে। নাজমুল তো আনন্দে ছোটাছুটি শুরু করে দিল। দেলোয়ার, শামিম ভাই সমাধিক্ষেত্র বরাবর সামনের মসজিদে চলে গেল। আমি আর মাহদি সমাধির পাশে দাঁড়ালাম। জিয়ারত করে ছবি তুললাম। অনেকগুলো কবরের মাঝ বরাবর ঈশা খাঁ শুয়ে আছেন। তিনি ছিলেন দিল্লির আফগান শাসক শের শাহর সভাসদ।

পথে দেখা হলো ইংল্যান্ড থেকে আসা কয়েকজন ভ্রমণকারীর সঙ্গে। ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে আমাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল ওরা। চলতে চলতে আবারও চলে এলাম সমাধির প্রবেশপথের রাস্তায়। এবার এগোতে লাগলাম সোজা। একটা ছোট্ট পাথুরে গেট এলো নাক বরাবর। এটা পেরিয়ে মাকবারার আরো দুটি গেট রয়েছে। চারপাশটা বেশ সবুজ। মুগ্ধ করার মতো। বিস্তর খোলা জায়গা আর চারপাশের সারিবদ্ধ লম্বা লম্বা গাছ-গাছালি। এসব সমাধিক্ষেত্রটির সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়েছে। নাজমুল ক্যামেরা বের করে ছবি নিতে লাগল। আর আমরা এগোলাম দ্বিতীয় গেটের দিকে। গেটটা বেশ উঁচু। সাদা বেলেপাথরে তৈরি। দূর থেকে সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করেছে। বিদেশি পর্যটকদের দেখলাম সারিবদ্ধভাবে দলীয় ছবি তুলতে। যাকে দেখছে তাকেই ‘এক্সকিউজমি প্লিজ’ বলে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করছে। সমাধির প্রতিটি ফটকের পাশেই ছোট্ট করে বসার আসন রয়েছে। বিশাল এই সমাধিক্ষেত্রটি দেখতে হাঁপিয়ে উঠলে এখানে বিশ্রাম নেওয়া যায়। আমাদের দলের দেলোয়ার এ সুযোগটি কাজে লাগাল। কী আর করা, ওকে রেখেই আমরা পা বাড়ালাম তৃতীয় ফটকের দিকে।

এই ফটকটা আবার লাল বেলে পাথরের তৈরি। দেখতে অনেকটা তাজমহলের প্রবেশদ্বারের মতোই। দ্বিতীয়বারের মতো চেকার সবার টিকিট চেক করল। একটু সামনে যেতে না যেতেই বিস্ময়ে নাজমুলের চোখ দুটি চড়কগাছ, “আরে বাহ, এত দারুণ দৃশ্য! ‘পিকে’ ছবিতে তো দেখেছি এ অংশটা। ” বললাম, ‘হু, এই ছবির নায়িকা আনুশকা শর্মা এখানে রোমান্টিক গানের দৃশ্যে অভিনয় করেছেন। আর তাঁর পিছু নিয়েছিল আমির খান। ’

অনেকে বলেন, হুমায়ুনের সমাধি ভালো করে দেখলে নাকি তাজমহল আর দেখার প্রয়োজন হয় না। কেননা এটার আদলেই তৈরি হয়েছিল তাজমহল। পার্থক্য কেবল, তাজমহল সাদা বেলে পাথরে তৈরি আর এটা লাল বেলে পাথরের। দিল্লিতে কুতুব মিনার ও লাল কেল্লার পরে সবচেয়ে বেশি বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা হয় এখানেই। পুরনো স্থাপনার মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যের ধারক-বাহকও এই সমাধিক্ষেত্র। লাল বেলে পাথরের সুবিশাল এই স্থাপনা তৈরির কাজ শুরু হয় ১৫৬৫ সালে। আর শেষ হতে সময় লাগে সাত বছর। এর পর থেকে কত ঝড়ঝাপটা সহ্য করতে হয়েছে এটিকে। তার পরও এটার সৌন্দর্য আজও বিলীন হয়নি।

এবার মূল সমাধি, মানে সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি দেখার পালা। সমাধিক্ষেত্রটি বেশ উঁচু। খাড়া খাড়া সিঁড়ি ভেঙে চড়তে হয় ওপরে। সেখানেও খেলার মাঠের মতো খালি জায়গা। আশপাশে ২০-২৫টি কবরের মতো উঁচু উঁচু জায়গা দেখে নজর আটকাল আমাদের। মাহদি জিজ্ঞেস করল, ‘এসব কাদের?’ বললাম, ‘জানি না। ’ আশপাশে কোনো সাইনবোর্ডও দেখতে পেলাম না। হাঁটতে হাঁটতে ওপরে ভেতরের দিকটায় একদম মাঝ বরাবর চলে এলাম। আলিশান এক ঘর। এটাই সম্রাট হুমায়ুনের কবরঘর। এই ঘরের ঠিক নিচ বরাবর সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে বিচে শুয়ে আছেন মোগল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট। পাখিরাও পাশে বেশ জেঁকে বসেছে এখানে। কিচিরমিচির করে সুন্দর গান গাইতে শুরু করেছে। আমরা কবর জিয়ারত করে চললাম বাইরের খোলা প্রাঙ্গণে। হঠাত্ কবরঘরের পেছনে নজরে পড়ল পাথরে খোদাই করা কোরআন শরিফের আয়াতুল কুর্সি ও কালেমার নান্দনিক চিত্ররেখা। তখন বাইরে বইছে উত্তরের হাওয়া। দক্ষিণ-উত্তরপাশ ঘেঁষে নজর আটকাল সুবিশাল দুটি মসজিদে। এসব বানিয়েছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান। এখানে এসে কবর জিয়ারত করে নামাজ আদায় করতেন তিনি। কিন্তু এখন মসজিদ দুটিতে নামাজ পড়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলাম এসব ইমারতের দিকে। অসাধারণ সব কারুকার্য। মুসলিম বাদশাহদের এই স্মৃতিচিহ্ন মুহূর্তের জন্য আমাদের যেন ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই সময়ে।

সময়টা দুপুর বলেই কি না সূর্যটা তখন বেশ রেগে আছে। সবার সম্মতিতে চলে এলাম সমাধিক্ষেত্রের পূর্বপাশে। এদিকটায় বেশ গাছ-গাছালি। মনটা আনন্দে ছেয়ে গেল। পাশে থাকা দেবদারুগাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ। কয়েকজন ইংরেজ তখন আমাদের পাশে এসে বসল। আলাপে আলাপে জানাল দিল্লি ভ্রমণে তাদের ভালো লাগার গল্প। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলাম সমাধিক্ষেত্র থেকে।

 

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে দিল্লি এয়ারপোর্ট। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিক্যাবে হজরত নিজামুদ্দিন (হুমায়ুনের সমাধি)। ভাড়া ১৫০ রুপি। অথবা ঢাকা থেকে বাসে বেনাপোল বর্ডার। ভাড়া (এসি) ১১০০ টাকা। বর্ডার পেরিয়ে বাসে কলকাতা নিউ মার্কেট। ভাড়া ২৫০ রুপি। নিউ মার্কেট থেকে ট্যাক্সিতে হাওড়া রেলস্টেশন। ভাড়া ১৫০ রুপি। হাওড়া থেকে ‘রাজধানী’ বা ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’-এ নিউ দিল্লি রেলস্টেশন। ভাড়া (তৃতীয় শ্রেণি) ২৫০০ রুপি। নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে সিএনজিতে হজরত নিজামুদ্দিন। ভাড়া ৫০ রুপি।


মন্তব্য