kalerkantho


বসনে বর্ণমালা

টাইপোগ্রাফি বা মুদ্রণশৈলী হচ্ছে বর্ণের শৈল্পিক উপস্থাপনা। পোশাকের ডিজাইনে এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাষার মাসে পোশাকে টাইপোগ্রাফি ব্যবহারের আদ্যোপান্ত জানালেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বসনে বর্ণমালা

মডেল : বারিশ ও সজীব, পোশাক : নিত্য উপহার, ও কাপড়-ই-বাংলা, সাজ : ফেমিনা, ছবি : কাকলী প্রধান

টাইপোগ্রাফি মানে বর্ণের অলংকরণ। এটা এমন এক আর্ট, যার মাধ্যমে বর্ণ অলংকৃত করা হয়।

যেমন ধরুন, আপনার নামটাকে সোজাভাবে না লিখে প্রথম অক্ষরটা একটু বড় করে লিখলেন, পরে ছোট, তার পরেরটা আরো ছোট। কিংবা  একটা শব্দের প্রথম অক্ষরটা একটু অন্যভাবে লিখলেন বাকি শব্দ একই রকম থাকল—এই কৌশলগুলোকেই একত্রে টাইপোগ্রাফি বলা হয়। আমাদের ডিজাইনাররা নানাভাবে নানা উপলক্ষে পোশাকের নকশা হিসেবে টাইপোগ্রাফি ব্যবহার করছেন।

টাইপোগ্রাফি অনেক পুরনো শিল্পকলা। অনেক আগে থেকেই মুসলমান শিল্পীরা কোরআন ও হাদিসের বাণীকে শৈল্পিকভাবে লিখে রাখতেন। এ জন্য আরবি ক্যালিগ্রাফি বা টাইপোগ্রাফি অনেক সমৃদ্ধ। ক্যালিগ্রাফি ও টাইপোগ্রাফির অর্থ এক হলেও ক্যালিগ্রাফি (চারুলিপি/লিপিকলা) বলতে একচ্ছত্রভাবে আরবি টাইপোগ্রাফিকেই বোঝানো হয়। যেহেতু আগে কম্পিউটার ছিল না, তাই তখন হাতেই ক্যালিগ্রাফি করা হতো। আর সেসব ক্যালিগ্রাফির উদ্দেশ্য ছিল উপহার দেওয়া, ঘরের দেয়ালে বাধাই করে ঝুলিয়ে রাখা অথবা কোনো ধর্মীয় বাণীকে সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

 

শুরুটা ষাটের দশকে

নিত্য উপহারের কর্ণধার বাহার রহমান জানালেন, ‘এ দেশে পোশাকে টাইপোগ্রাফির শুরুটা ষাটের দশকে। শিল্পী কামরুল হাসানের হাত ধরে। নিউ মার্কেটে রূপায়ণ নামে পোশাকের দোকান ছিল তাঁর। তিনি একুশের শাড়িতে প্রথম টাইপোগ্রাফি ফুটিয়ে তোলেন। ’

স্টুডিও এমদাদের ডিজাইনার এমদাদ হক জানালেন, ‘আশির দশকের শেষভাগে টাইপোগ্রাফি নিয়ে কিছু কাজ করেছিল ফ্যাশন হাউস আড়ং। টাইপোগ্রাফি দিয়ে পোশাকের নকশা করার ধারণাটা জনপ্রিয় করেছিলেন ‘অ্যান্ডেজ’-এর ডিজাইনার আনিলা হক। সালটা সম্ভবত ১৯৯৫। অক্ষরের নানা বিন্যাসে শাড়ি ও ব্লাউজের ক্যানভাস এঁকেছেন। স্ক্রিন প্রিন্ট ও ব্লক প্রিন্টেই পোশাকের জমিন অলংকৃত করতেন। প্রায় একই সময়ে টাইপোগ্রাফি নিয়ে কাজ করেছিলেন বিবিআনার ডিজাইনার লিপি খন্দকার। তিনি জানালেন, ‘সেবার ফ্যাশন হাউস আড়ঙের জন্য জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতা দিয়ে কামিজের নকশা করেছিলাম। ’ ৮৬ কি ৮৭ সালে এমদাদ হক নিজেও টাইপোগ্রাফি নিয়ে কাজ করেছিলেন। জানালেন, ‘শাড়ির আঁচলে, পাড়ে, জমিনে নানাভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের লুইপা, কাহ্নপার পদ ব্যবহার করেছিলাম। ’

তবে টাইপোগ্রাফির পোশাক সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করার কাজটি করেছে ফ্যাশন হাউস নিত্য উপহার। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো টি-শার্টে টাইপোগ্রাফির নকশা করে তারা। শিল্পী সব্যসাচী হাজরা রবি ঠাকুরের ‘নব আনন্দে জাগো’ আর শিল্পী ধ্রুব এষ জীবনানন্দের ‘আকাশলীনা’ কবিতা দিয়ে টি-শার্টের নকশা করেছিলেন। এখন বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস, মা দিবসসহ বিশেষ দিবসের পোশাকে টাইপোগ্রাফির নকশা করছে। বর্ণ ও শব্দের বিন্যাসে আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং শিল্প সংস্কৃতির অনেক বিষয় ফুটিয়ে তোলেন ডিজাইনাররা।

 

যা থাকে নকশায়

খনার বচন, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের বিভিন্ন পদ, জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুধীন্দ্রনাথ কিংবা আবুল হাসানের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের চিঠি, গান, স্বাক্ষর, গল্পের লাইন ইত্যাদি মূর্ত হয়ে ওঠে পোশাকে। এ ছাড়া থাকে ঋতুভেদে নানা শব্দমালা ও অক্ষর। যেমন গ্রীষ্মের পোশাকে বিভিন্ন শব্দমালা দিয়ে গ্রীষ্মের আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়।

কাপড়-ই-বাংলার কর্ণধার মোরসালিন আহমেদ বিথুন জানালেন, ‘বর্ণমালা কেবল নকশায় নয়, অনেক সময় মোটিফ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের আদল, বসন্তে শিমুল-পলাশ ফুলের আদল ব্যবহার করে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কবিতা দিয়ে পোশাকের নকশা করেন ডিজাইনাররা। যেমন, বসন্তে পলাশের মোটিফ নিয়ে এর সঙ্গে জীবনান্দ দাশের কবিতার দুটি লাইন জুড়ে দিয়ে পুরো মোটিফ ফুটিয়ে তোলা হয়। কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির পোশাকে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতার কয়েক ছত্র কিংবা অ আ ক খ ইত্যাদি বর্ণমালাকে পাঞ্জাবি বা শাড়ির ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়।   নকশার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ই কাপড়ের রঙের বিপরীত কোনো রং দিয়ে টাইপোগ্রাফির নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। যেমন কালো কাপড়ের জমিনে সাদা হরফের লেখা থাকে। এতে করে টাইপোগ্রাফিটা ভালোভাবে ফুটে ওঠে বলে মনে করেন মোরসালিন আহমেদ।   

বিবিআনার কর্ণধার ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, ‘শুধু যে বর্ণ বা শব্দমালাকে পোশাকে প্রিন্ট করে দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টা সে রকম নয়। টাইপোগ্রাফির মাধ্যমে নকশায়ও বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। যেমন কালো রঙের কামিজের বুকের দুই পাশে সাদা রঙের টাইপোগ্রাফির মাধ্যমে কনট্রাস্ট করা হচ্ছে। পাঞ্জাবির কেবল বুকে কিংবা হাতায় বর্ণমালা দিয়ে নকশা করা হচ্ছে। আবার টি-শার্টের পুরো বডিতে বর্ণমালার নানা খেলা রেখে হাতাটা একরঙা রাখা হচ্ছে। ’ মেয়েদের ওড়নায়, ব্যান্ডেনায় বিভিন্ন কবিতা স্থান পাচ্ছে। আবার টি-শার্টের বুকে নানা বর্ণমালা কিংবা নিচের দিকে বা পেছনে পিঠের ওপরের দিকটায় রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ বা নজরুলের কবিতার কয়েকটি লাইন বা কোনো জনপ্রিয় গানের দুটি লাইন তুলে দেওয়া হচ্ছে। পাঞ্জাবির বাটন লাইনে প্রিন্ট করে দেওয়া হচ্ছে অক্ষর বা ‘শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ লেখা কবিগুরুর স্বাক্ষর। আবার পাঞ্জাবির সামনের অংশে বুকের পুরোটাজুড়ে বিভিন্ন বর্ণমালার খেলা দেখা যায়। পেছনটা একরঙা। কামিজের ক্ষেত্রেও কামিজের সামনের অংশের পুরোটা টাইপোগ্রাফির নকশা দেখা যায়। হাতা ও ঝুলটা হয়তো ভিন্ন কোনো রঙের কাপড় দিয়ে করা। কেবল আঁচল ও পাড়ে বর্ণমালার নকশায় করা শাড়ি যেমন আছে, তেমনি পুরো জমিনটা নানা রঙের বর্ণমালা দিয়ে করা আর পাড় এবং আঁচল একরঙা—এমন শাড়িও মিলবে।

 

সব পোশাকেই বর্ণমালার খেলা

শুরুটা হয়েছিল শাড়ি দিয়েই। শাড়ির জমিন, আঁচল আর পাড়কেই ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করতেন ডিজাইনাররা। আনিলা হক ব্লাউজকেও বর্ণময় করেছিলেন। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঞ্জাবি। এখন শাড়ি-পাঞ্জাবি তো বটেই, ওড়না, কামিজ, টপস, ফতুয়া, কুর্তা, শার্ট, টি-শার্ট, কটি, শাল, রুমাল, ব্যান্ডেনা, উত্তরীয় থেকে শুরু করে পরিধেয় প্রায় সব ধরনের পোশাকেই টাইপোগ্রাফির ছাপ থাকছে। তরুণ-তরুণীদের কাছেও দারুণ জনপ্রিয় এ ধরনের পোশাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী শাকিলা জাহান বললেন, ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভীষণ ভক্ত আমি। আর প্রিয় কবির কবিতা লেখা শাড়ি পরে ক্যাম্পাসে এসেছি। বিষয়টি ভাবতেই ভালো লাগে। ’

 

কোথায় পাবেন

আড়ং, নিত্য উপহার, কে ক্রাফট, বিশ্ব রঙ, কাপড়-ই বাংলা, অঞ্জন’স, ওয়েস্ট রঙ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের শোরুমে টাইপোগ্রাফির নকশা করা পোশাক পাবেন।


মন্তব্য