kalerkantho


অন্য কোনোখানে

গদখালীর ফুলের রাজ্যে

ফখরে আলম    

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গদখালীর ফুলের রাজ্যে

যশোর শহর থেকে প্রাইভেট কারে রওনা হয়েছি। সঙ্গে আমার স্ত্রী, ছেলে আর মেয়ে।

আমাদের গাড়ি বেনাপোলের দিকে ছুটছে। ঝিকরগাছা বাজারের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। বাজার পার হয়েই বেশ পুরনো এক ব্রিজ। এটার নিচ দিয়েই বয়ে চলেছে মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদ। তবে এই নদ এখন কচুরিপানায় বন্দি। উঁকি দিয়ে দেখি, টলটলে পানি। সেই পানিতে সাঁতার কাটছে শিশুরা। হাজের আলী বাজার থেকে রাস্তার দুই পাশের প্রবীণ রেইনট্রিরা আমাদের স্বাগত জানায়। বেশ বড় বড় গাছ। সারিবদ্ধ গাছের শাখা-প্রশাখা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে এক বিশাল সবুজ তোরণ তৈরি করেছে। সেই তোরণের মধ্য দিয়ে ঢুকে পড়ি। পিচঢালা পথে পড়ে থাকা গাছের ছায়ারা রোদের সঙ্গে খেলা করছে। যশোরের জমিদার কালী পোদ্দার ১৮৪০ সালে এই রাস্তা তৈরি করেন। সেই তখনই রাস্তার দুই ধারে লাগানো হয় এসব রেইনট্রি। জমিদারের মা গাছের ছায়ায় ছায়ায় গঙ্গাস্নানে যাবেন সে জন্য নাকি যশোর শহরের মুড়লি এলাকা থেকে ভারতের গঙ্গাঘাট পর্যন্ত এসব গাছ লাগানো হয়। সেই প্রাচীন বৃক্ষগুলোর বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু হাজের আলী থেকে গদখালী পর্যন্ত থাকা গাছগুলো এখন বেঁচে আছে। রেইনট্রির ছায়ায় ছায়ায় আমরাও একসময় পৌঁছে যাই গদখালী বাজারে। চা খেয়ে পথের ক্লান্তি তাড়াই। চা খেতে খেতেই চোখে পড়ে রংবেরংয়ের নানা জাতের ফুলের বিকিকিনি। আমরা হেঁটে যশোর-বেনাপোল সড়ক ধরে কয়েক শ গজ এগিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো গদখালী মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দেখি মন্দিরের জানালা, পাশের গাছে, বিদ্যুতের খুঁটিতে দড়ি বাঁধা অসংখ্য ইটের টুকরা ঝুলছে। অনেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভগবানকে ডেকে ইটের টুকরা ঝুলিয়ে দিচ্ছে। পুরোহিত বললেন, ‘একে বলে ভারা বাঁধা। মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য এই ইট বাঁধা হয়। আর ইচ্ছা পূরণ হলে ইট খুলে নেওয়া হয়। ’ জানা গেল, মন্দিরটার বয়স প্রায় চার শ বছর। আর এই মন্দির নিয়ে গা-ছমছম করার মতো গল্পও আছে বিস্তর। একসময় পর্তুগিজ ডাকাত সরদার রডারিক এই অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে মানুষের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। একদিন সে স্থানীয় কমলেসের বাড়িতে হানা দেয়। সেখানে তাঁর সুন্দরী মেয়ে মাদালসার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় রডারিকের। মাদালসার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। ক্ষমা চেয়ে প্রেম নিবেদন করে। পণ করে, আর ডাকাতি করবে না। একপর্যায়ে মাদালসাদের বাড়ির পাশেই আশ্রয় নেয় রডারিক। আর মাদালসাকে পাওয়ার জন্য বাঘের সঙ্গে লড়াইও করে। এ ঘটনার পর মা কালীর নামে রডারিককে বরণ করে নেয় মাদালসা। পরে দু্জনেই সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে। তৈরি হয় একটি মন্দির। রডারিকের ‘গড’ আর মাদালসার ‘কালী’ নিয়ে এই মন্দিরের নাম হয় ‘গডকালী’ মন্দির। সেই নামের সূত্র ধরে পরে এই জায়গার নাম হয় ‘গদখালী’। প্রতিবছর পৌষ মাসে এখানে পৌষকালীর মেলা বসে। ভারত ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা আসে। মন্দির দর্শনের পর এবার পানিসারা গ্রামের দিকে এগোতে থাকি। পথের দুই ধারে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা, জারবেরা ফুলের ক্ষেত। কৃষকরা ফুলক্ষেতের পরিচর্যা করছে। কেউ ফুল তুলছে তো কেউ বা গোলাপে ক্যাপ লাগাচ্ছে। দুই কিলোমিটার পথ ফুলের গন্ধে মাতাল হয়ে পানিসারা গ্রামে পৌঁছি। শুধু আমরাই না, দেখা মিলল আমাদের মতো বেশ কিছু পর্যটকেরও। ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে তাঁরা হাজির হয়েছেন।

গ্রামের পশ্চিম দিকে অনেক এলাকাজুড়ে শেড দেওয়া। হেঁটে শেডের কাছে গিয়ে দেখি, লাইন দিয়ে জারবেরা ফুলগাছ লাগানো। লাল, হলুদ, সাদা, কমলা রঙের জারবেরা হাসছে। এগুলো এই এলাকার সবচেয়ে পুরনো ফুলচাষি শের আলীর ফুলক্ষেত (নাকি বাগান)। ১৯৮৩ সালে তিনিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ শুরু করেছিলেন। এখন পাঁচ হাজারের বেশি চাষি এক হাজার পাঁচ শ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ করছে। শের আলীর বাগান দেখে সামান্য পথ এগিয়ে দেখি, এক গ্রাম্য বধূ জারবেরা ফুলের স্টিক কাটছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয়। নাম তাঁর হাফিজা খাতুন। স্বামী ইসমাইল হোসেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে ফুলের চাষ করছেন। এই ফুল চাষই তাঁদের অভাব তাড়িয়ে সংসারে শান্তির ফুল ফুটিয়েছে। হাফিজা আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাঁর ফুলক্ষেত দেখান। তাঁর ক্ষেতের পাশেই দেখি ফুটে আছে নয়নাভিরাম গোলাপ। ফুলচাষি নূর ইসলাম এই গোলাপ ফুটিয়েছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে এই গোলাপ বিক্রির জন্য তিনি মন দিয়ে পরিচর্যা করছেন। এখানকার ক্ষেত থেকেই ফুলগুলো বিক্রির জন্য হাজির হয় গদখালীর ফুলের পাইকারি হাটে। এবার ফুলের হাট দেখতে চলে গেলাম সেখানে। ওখানে গিয়ে চোখে পড়ল ফুলের পাহাড়। গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা ফুলের বান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আলমসাধু (শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ভ্যান) গাড়িতে ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছে। চটের বস্তা দিয়ে বাঁধা হচ্ছে রজনীগন্ধার বান্ডেল। ফুলের হাটে কথা হয় ফুলচাষি ও বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিমের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এবার ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে হাট থেকে ১০-১২ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য আছে। আবহাওয়া বেশ ভালো। এ জন্য ফুলের রং, মানও হয়েছে ভালো। বিক্রেতারা ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্য অপেক্ষা করছি। ’ ভদ্রলোক আমার ছেলে-মেয়েকে নানা রঙের কয়েকটি জারবেরা ফুল উপহার দিলেন। ফুলের রাজ্য ছেড়ে আসতে কি ইচ্ছা হয়? তার পরও বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই।

ছবি : ফিরোজ গাজী

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ঈগল, গ্রীন লাইন, সোহাগ পরিবহনের বেনাপোলগামী এসি বাসে এক হাজার টাকা ভাড়ায় গদখালী। এক-দুই শ টাকা ভাড়ায় রিজার্ভে ইজি বাইক, ভ্যানে ফুলের রাজ্য ঘুরে আসতে পারেন।


মন্তব্য