kalerkantho


অন্য কোনোখানে

সান্তা ক্লজের গ্রামে

হাসান শাহরিয়ার হৃদয়   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সান্তা ক্লজের গ্রামে

ফোনে তাপমাত্রা চেক করলাম। মাইনাস ১০। হু হু করে আরো নামছে। সকালে যখন অউলু থেকে রওনা দিয়েছিলাম, তখন ছিল মাইনাস ৭।

পাশে বসা হাজের শুকনো গলায় বলল, ‘মিনিটে মিনিটে এমন কমতে থাকবে নাকি? ঠাণ্ডায়ই তো মরে যাব। ঘুরব কী?’

‘উত্তর মেরুর কাছাকাছি আছি। কী আশা করছিলে?’

কিছু না বলে গজ গজ করল হাজের। তা দেখে মুচকি হাসলাম। দলের মধ্যে আমি আর ও-ই কেবল গরমের দেশের মানুষ। আমি বাংলাদেশের, আর হাজের তিউনিশিয়ার। আমার তো বেশ কয়েক মাস হয়ে গেছে ফিনল্যান্ডে।

মোটামুটি অভ্যস্তই হয়ে গেছি বলা যায়। তবে হাজের এসেছে সপ্তাহ দুয়েক হলো। বেচারি এখনো এ দেশের ঠাণ্ডায় অভ্যস্ত হতে পারেনি।

রোভানিয়েমি সিটি সেন্টারে আমাদের বাস থামল সকাল সাড়ে ১১টায়। বাস থেকে নেমে আবার তাপমাত্রা চেক করলাম। মাইনাস ১৪। যাক, ঘোরাঘুরি কিছু করা যাবে মনে হচ্ছে।

আমাদের সাতজনের দলকে পুরোপুরি মাল্টিন্যাশনাল বলা যেতে পারে। সাতজন সাত দেশের। আমি আর হাজের ছাড়া বাকি পাঁচজন হলো তাইওয়ানের সিন, জাপানের মিহো, স্লোভাকিয়ার ম্যাথুস, ইন্দোনেশিয়ার বায়ু ও ফিনল্যান্ডের তৌকো। আমরা সবাই থাকি ফিনল্যান্ডের উত্তরের ছোট্ট শহর অউলুতে। সবাই ‘ইউনিভার্সিটি অব অউলু’র শিক্ষার্থী। মাস্টার্স করছি। সপ্তাহখানেক আগে ক্যাফেতে বসে গল্প হচ্ছিল। সিন বলছিল, দ্রুত শীত নামছে। শীত মানেই শূন্যের নিচে ১৫-২০ ডিগ্রি। সূর্যবিহীন অন্ধকার জীবন। কোথাও ঘুরতে গেলে এখনই শেষ সুযোগ। তৌকো বলল, রোভানিয়েমি যাওয়া যায়। নভেম্বর বেশ ভালো সময়। চলো দুদিনের ঝোড়ো ট্যুর দিয়ে আসি।

রোভানিয়েমির প্রতি আমার আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। রাজধানী হেলসিংকির পর ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট। ফিনিশ ল্যাপল্যান্ডের রাজধানী। উত্তর মেরুর সীমানা শুরু হয়েছে এই রোভানিয়েমি থেকেই। গ্রীষ্মের কয়েক মাস ছাড়া সারা বছর কয়েক ফুট তুষারে ঢাকা থাকে। শীতকালে যখন বরফ সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন রীতিমতো জেগে ওঠে এই শহর। উত্তরের আকাশে নর্দান লাইট দেখতে ঝাঁকে ঝাঁকে হাজির হয় পর্যটক। বরফকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন করে রিসোর্টগুলো।

ইদানীং সব কিছু ছাপিয়ে রোভানিয়েমির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে সান্তা ক্লজ ভিলেজ। রূপকথা অনুযায়ী, সান্তা ক্লজের আদি নিবাস উত্তর মেরুতে। ক্রিসমাসের আগের রাতে শিশুদের জন্য নানা উপহার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এই বুড়ো। হরিণের টানা স্লেজে করে আকাশপথে দুনিয়া ঘুরে বেড়ান। ফিনিশ উপকথা অনুযায়ী রোভানিয়েমির সান্তা ক্লজ গ্রাম থেকেই সান্তার যাত্রা শুরু হয়। এটাই সান্তার ‘অফিশিয়াল ঠিকানা’।

সান্তা ভিলেজে বাস থেকে নেমে কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। আমার ধারণা ছিল, ছোটখাটো একটা গ্রামমতো কিছু একটা দেখতে পাব। যেখানে থাকবে বরফে ঢাকা কিছু কুঁড়েঘর। পুরো সান্তা ক্লজ ভিলেজ রীতিমতো একটা থিম পার্ক। বিশাল এলাকা। স্যুভিনির আর গিফটের দোকান দিয়ে ভর্তি। আর্কটিক ডিশের বেশ কিছু রেস্তোরাঁও আছে। সাফারি জোন আছে, যেখানে হরিণটানা স্লেজে চড়া যায়, স্কি করা যায়। গ্রামের পাশে আছে সান্তা পার্ক। ছোটদের জন্য নানা রাইড আছে ওখানে। সব মিলিয়ে হুলস্থুল কাণ্ডকারখানা।

তুষার ঢাকা চত্বরে আমরা কিছুক্ষণ বরফ ছোড়াছুড়ি করলাম। হঠাৎ একপাশে থাকা পিলারটার ওপর চোখ পড়ল। ওতে লেখা আছে ‘এখান থেকে উত্তর মেরু শুরু। ’ ওটার পাশে দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি তুললাম।

সান্তা ক্লজের বাড়িতে ঢোকার সময় সবারই বুক একটু ধকধক করছিল। কে জানে আসল সান্তা দেখতে কেমন হবেন। রূপকথার মতো হাসিখুশি মানুষ হবেন তো? 

বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর আরেকটি বিশাল দরজা। বাইরে লেখা, সান্তা ক্লজের অফিসের প্রবেশপথ। পাশে একটি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে সান্তা এই মুহূর্তে কী করছেন। আমরা ভেতরে পা রাখলাম। অন্ধকার করিডরের মতো। খুব মৃদুস্বরে ঘণ্টা বাজছে। মৃদু ভলিউমে ক্রিসমাসের গান বাজছে, ‘সান্তা ক্লজ কামস টু টাউন’। মিহো কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তার ভয় লাগছে। ভয় যে আমারও কিছুটা লাগছিল না তা কিন্তু নয়। এ কি রে বাবা! সান্তা ক্লজের বাড়ি এমন অন্ধকার ভূতের বাড়ির মতো হবে কেন?

অন্ধকার করিডর যেন হঠাৎই শেষ হয়ে গেল। আলোঝলমলে বিশাল একটি কামরায় চলে এলাম। চোখের সামনে বিশাল এক পেন্ডুলাম দুলছে। সেখান থেকেই ঘণ্টার মতো ঢং ঢং শব্দ হচ্ছে। চারপাশে রংবেরঙের গিফটবক্স ছড়ানো। দেয়ালে নানা রকম প্রাচীন শিল্পকর্ম। রুমের একপাশে প্যাঁচানো সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। সেটা দিয়ে দোতলায় উঠতেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। সান্তা ক্লজের অফিস। ১০-১২ জনের পেছনে লাইনে দাঁড়াতে হলো। সবাইকে তিন মিনিট করে সময় দেন সান্তা। শুনলাম, ক্রিসমাসে নাকি এই লাইন নিচতলা ছাড়িয়ে বাইরে পর্যন্ত চলে যায়।

এতদূর এসে সান্তার সঙ্গে ছবি না তুললে আফসোস থেকেই যাবে। মিনিট বিশেক লাইনে দাঁড়ানোর পর আমাদের পালা এলো। বিচিত্র টুপি আর লাল রঙের অদ্ভুত জামা পরা এক মেয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। জানা গেল, সে ‘এলফ’। সান্তার ‘সেক্রেটারি’। সে-ই আমাদের ছবি তুলবে।

বৃত্তাকার ঘরের একপ্রান্তে চিরাচরিত পোশাকে সান্তা ক্লজ বসে আছেন। রুপালি রঙের দাড়ি পেট পর্যন্ত নেমে এসেছে। পায়ে ঢাউস জুতা। সোনালি ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইয়াং পিপল! ওয়েলকাম টু মাই হোম!’

আমরা একে একে হ্যান্ডশেক করলাম সান্তার সঙ্গে। বেশ কিছু ভাষা জানেন তিনি। মিহোকে জাপানিজ, সিনকে চায়নিজ ভাষায় অভ্যর্থনা জানালেন। তৌকোকে ফিনিশে। আমার পালা এলো। আমি নাম আর দেশ বলতেই সান্তা বললেন, “হুম, বাংলাদেশ। তোমাদের ভাষাটা কঠিন। তোমরা যেন কিভাবে ‘হাউ আর ইউ’ বলো?”

‘কেমন আছ?’

সান্তা অবিকল আমাদের উচ্চারণে বললেন, ‘কেমন আছ?’

হাসতে হাসতে বললাম, ‘ভালো আছি!’

ছবি তোলা হলো। মিনিট দুয়েক গল্পও হলো। বের হওয়ার আগে সান্তা আমাদের সবাইকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ইয়াং পিপল, তোমাদের ওপর অনেক দায়িত্ব। ভালো থেকো। বিশ্বটাকে ভালো রেখো। ’ সত্যি না অভিনয়, কে জানে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা আমাদের সবার মন ছুঁয়ে গেল।

এরপর কিছুক্ষণ চলল কেনাকাটা। গেলাম সান্তার অফিশিয়াল ডাকঘরে। প্রতিবছর সারা বিশ্ব থেকে শিশুদের লাখ লাখ চিঠি আসে এই ঠিকানায়। প্রত্যেকটির উত্তর দেওয়া হয়। ডাকঘরের ভেতরটা ছবির মতো সাজানো।

সান্তা ভিলেজ থেকে যখন সিটিতে ফিরে যাচ্ছি, সবার মধ্যে অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করছিল। জানি পুরো ব্যাপারটাই বাণিজ্যিক। এই ভিলেজ থেকে লাখ লাখ ইউরো আয় করছে ফিনিশ সরকার। তার পরও মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণের জন্য যেন অন্য একটা জগতে চলে গিয়েছিলাম।

ছবি : লেখক


মন্তব্য