kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কুমিরের খামারে একদিন

জাকির হোসেন

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কুমিরের খামারে একদিন

কুদুং গুহা দেখতে গতকালই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে চলে এসেছেন তানভীর ভাই। অতএব তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে সকাল সকাল চেপে বসলাম টেকনাফের বাসে।

নামলাম হোয়াইকং বাজারে। টেকনাফ থেকে বেশ আগেই। সেখান থেকে সিএনজিতে হরিপুর। তার পর থেকে হেঁটে কুদুং গুহা। গুহার ভেতরেও গেলাম। সে এক অ্যাডভেঞ্চার। সেটাও বেশ পানসে হয়ে গেল পরের ভ্রমণস্পটে গিয়ে। হাতে সময় থাকায় ভাবলাম, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির চাষ প্রকল্প থেকে না হয় একটু ঘুরে আসি।  

কুদুং গুহা থেকে ফেরার পথে উঠলাম একটি লোকাল মাইক্রোবাসে। সিট পেয়েছি একদম পেছনে। পাহাড়ি রাস্তা, উঁচু-নিচু। তার ওপর মাঝেমধ্যে বেরসিকের মতো হঠাৎ করে স্পিডব্রেকার হাজির, যা হওয়ার তাই হতে লাগল, মাথা বারবার মাইক্রোর ছাদের সঙ্গে বাড়ি খেতে লাগল। এ যে বিনে পয়সায় রোলার কোস্টার ভ্রমণ! যদিও তাতে আনন্দের রেশ ছিল না বিন্দুমাত্র। এভাবে ঘুনধুম এসে পৌঁছলাম। এটা হচ্ছে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা তুমব্রু গ্রামে গড়ে উঠেছে বেসরকারি কুমিরের খামার ‘আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেড’। ৩০ একরের বেশি এলাকা নিয়ে কুমিরের এই প্রজননকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ৫০টি কুমির উন্মুক্ত জলাশয়ে ছাড়া হয়েছে।

এই খামারে যাওয়ার রাস্তাটা বিটিভির উখিয়া উপকেন্দ্রের সংলগ্ন। ওটা এমনই উঁচু-নিচু যে রিকশা যেতে পারে না। এই রাস্তার জন্য সিএনজি দরকার। কিন্তু আশপাশে কোনো সিএনজি পেলাম না। দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মতো পথ। কুদুং গুহা ঘুরাঘুরির পর হাঁটার মতো আর শক্তি নেই। তারপরও মনে হলো এত দূর যখন এসেছি, খামার না দেখে যাবই না। হাঁটা শুরু করলাম। পথের দুই পাশে বিভিন্ন ফলের বাগান। তাতে ঝুলছে কমলা, পেঁপে, আম, ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ধরনের ফল।

বেশ খানিক সময় চলার পর গিয়ে পৌঁছলাম খামারে। ওখানকার মূল সড়কের পাশে ঝুলতে থাকা এক ব্যানারে লেখা কুমিরের প্রজনন সময়ের জন্য প্রদর্শনী বন্ধ। তা দেখে তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার দশা। এবারও পিছু হটতে নারাজ। ভাবলাম, আরে আমাদের দেশে তো কত কিছুই না লেখা থাকে! সব কাগজে-কলমে। এত কিছু ভাবলে চলে? খামারের সদর দরজায় গিয়ে দেখি ঘটনা সত্যি। প্রদর্শনী বন্ধ। গেটে তালা। ওখানকার সাইনবোর্ডেও লেখা রয়েছে ‘প্রদর্শনী বন্ধ, কুকুর হতে সাবধান। ’

খামারটা চারদিক দিয়ে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এদিক-সেদিক তাকালাম, কাউকে দেখতে পেলাম না। কাউকে পেলে হয়তো অনুরোধ করব আমাদের খামারটা দেখার সুযোগ করে দিতে। শেষে দেয়াল টপকেই ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরে বাঁশের বেড়া। ওসবের মধ্যে দিয়ে শরীর গলিয়ে ভেতর ঢুকে দেখি অনেকগুলো গ্রিড। প্রতি গ্রিডে দুটি করে কুমির। প্রথম গ্রিডের কুমিরগুলো দেখে আরেকটা গ্রিড দেখতে গেলাম। ওখান থেকে আবার প্রথমটার কাছে ফেরত আসার সময় একটি কুমির হাঁ করে দৌড়ে এলো। জলজ্যান্ত দুই পেয়ে খাবারের লোভে বোধ হয়। বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। এককেটা কুমির এত বড়, এত ভয়ংকর যে কি বলব। ভাগ্যিস ওগুলোর আর আমাদের মাঝখানে ইটের দেয়াল ছিল। খামারে ঢোকার আগে ভেবেছিলাম ছোট ছোট কয়েকটা কুমির দেখতে পাব।

দুই-একটা গ্রিড দেখার পরই দূর থেকে শোনতে পেলাম খামারের লোকজন আমাদের ডাকছে। পেছনে ফিরে দেখি তানভীর ভাই নেই। ওনাকে ডাকছি। কোনো খবর নেই। উনি তখন পুকুরের মতো একটা জলাশয়ের সামনে। ওখানে অনেক কুমির একসঙ্গে রাখা আছে, সেগুলো দেখছেন। অনেকক্ষণ ডাকার পর তাঁর টিকিটির দেখা মিলল। এ দিকে খামারের লোকজন আমাদের বিরতিহীনভাবে ডেকেই চলেছে। তানভীর ভাইকে ডাকতে এসে খামারের প্রায় সব গ্রিড এক পলক করে দেখে নিলাম। বেশির ভাগ কুমিরকেই রোদ পোহাতে দেখলাম।

ঝটিকা কুমির দর্শনের পর খামারের লোকজনের কাছে গেলাম। শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ—কোথা থেকে এসেছি, এখানে প্রবেশ নিষেধ, লেখা দেখিনি ইত্যাদি ইত্যাদি। অনুরোধ করলাম গেট খুলে দেওয়ার জন্য। ওদের কাছে চাবি থাকা সত্ত্বেও বলল, যে দিক দিয়ে ঢুকছি, সেখান দিয়েই যেন বের হই। তথাস্তু, তাই করলাম।

বের হওয়ার পর তারা কাহিনী শুরু করল। টাকা দাবি করে বসল। আরে বাবা, টাকা যদি নেওয়ার ইচ্ছা থাকত তাহলে আগে বললেই তো হতো। এত কথার তো কোনো দরকার ছিল না। যাই হোক অল্প কিছু টাকা দিলাম। মনে মনে বললাম, কষ্ট করে আসাটা সার্থক হয়েছে।

হেঁটে হেঁটে আবার মূল সড়কের দিকে যাচ্ছি। পথে একটা ট্রাক পড়ল। এখানটায় কোনো গণপরিবহন আবার চলে না। ভাবলাম এটাতেই না হয় চড়ে বসি। তবে ট্রাকের চালক রাজি হলো না। কি আর করা, আবারও হাঁটতেই হলো। মূল সড়কে এসে প্রথমে সিএনজি করে স্থানীয় বাজারে এলাম। এরপর সেখান থেকে বাসে করে সোজা কক্সবাজার। ছবি : লেখক


মন্তব্য