kalerkantho


হিউয়েন সাঙের বিশ্ববিহারে

বাবর আলী

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হিউয়েন সাঙের বিশ্ববিহারে

খুব যে পরিকল্পনা করে সেবার ভাসু বিহারে হাজির হয়েছিলাম, তা কিন্তু নয়। মহাস্থানগড়ের এদিক-ওদিকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পুরাকীর্তিগুলো দেখে ওখানকার জাদুঘরে ঢুকলাম।

ওখানে মহাস্থানগড় থেকে খননকাজের সময় পাওয়া প্রত্নবস্তু ছাড়াও আশপাশের পুরাকীর্তিগুলো থেকে সংগ্রহ করা প্রত্নবস্তুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ঘুরে দেখতে দেখতে একটা ছবিতে গিয়ে চোখ আটকাল সবার। ছবির জায়গাটার নাম ভাসু বিহার। কয়েক ফুট দূরত্বে থাকা আরেকটা ছবিতে মহাস্থানগড়ের পুরো এলাকাটারই একটা মানচিত্র পেয়ে গেলাম। ওতে চোখ বুলিয়েই বুঝলাম, ভাসু বিহার আমাদের বর্তমান অবস্থান থেকে বেশ কাছেই। তৎক্ষণাৎ ‘উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’ টাইপ ব্যস্ততায় জাদুঘর থেকে বের হলাম। ভাগনে সুমন বাহন হিসেবে একটা ইজিবাইক ঠিক করে ফেলতেই সেটায় চেপে বসলাম।

মহাস্থানগড় জাদুঘরের বাঁ পাশের সড়কটা ধরেই ছুটল আমাদের হালকা-পাতলা বাহন। কয়েকটা বাঁক ঘুরতেই রাস্তার দুই পাশের দৃশ্যপট বদলে গেল। দেখা মিলল বেশকিছু দোতলা মাটির ঘরের। মাটির ঘর আগেও অনেকবার দেখেছি, তবে দোতলা মাটির ঘর এবারই প্রথম চর্মচক্ষে দর্শন হলো। বন্ধু জামশেদ তো সুন্দর একটা মাটির ঘর দেখে আনন্দের আতিশয্যে ওখানেই নেমে পড়ে আর কি! ঠিক হলো ফেরার সময় দোতলা মাটির ঘর দেখে যাব।

ইজিবাইকের চাকা আর মিনিট দশেক ঘুরতেই বিহারের মতোই দেখতে একটা স্থাপনায় গিয়ে পৌঁছলাম। স্থানীয় এক বাসিন্দাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এটিও একটি বিহার। তবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ভাসু বিহার নয়। আরো কিলোমিটারখানেক সামনে ওটার দেখা মিলবে। আর এখন যে বিহারটি সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা চারপাশে তালগাছে ঘেরা। বিহারটা ছোটখাটো হলেও বেশ দৃষ্টিনন্দন। এর পোশাকি নাম ‘বিহার ধাপ’ হলেও স্থানীয়রা একে ‘তোতারাম পণ্ডিতের ধাপ’ নামেই চেনে। মূল রাস্তার লাগোয়া এ বিহার ৫৭ মিটার দীর্ঘ ও ৬১ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট। বিহারের মাঝখানে রয়েছে খোলা একটি জায়গা, যার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ৩৭টি ভিক্ষু কক্ষের ধ্বংসাবশেষ। এ পুরাকীর্তিতে খননকাজ শুরু হয় ভাসু বিহারের খননকাজ শুরু হওয়ারও বেশকিছু সময় পর। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৬ সালের বিভিন্ন সময়ে এ স্থানে খননকাজ চলে। সে সময় খুব উল্লেখযোগ্য কিছুর সন্ধান পাওয়া না গেলেও ২০০৬-০৭ সালে আবার খননকাজ শুরু হয়। সেবারের খননকাজের ফলে সন্ধান মেলে দুটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষসহ নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সিংহ ভাগই স্থান পেয়েছে মহাস্থানগড় জাদুঘরে। ছোট্ট বিহারটি বেশ নজর কাড়লেও একটা ব্যাপার আমাদের খুব খারাপ লাগল-বিহারটা পড়ে আছে একদমই অরক্ষিত অবস্থায়। এর মধ্যেই খোয়া গেছে বেশ কিছু টেরাকোটা।

তোতারাম পণ্ডিতের ধাপের অধ্যায় শেষ করে ইজিবাইকে বসে একটু গা এলিয়ে দিতে না দিতেই পৌঁছে গেলাম ভাসু বিহারে। পুরো এলাকাটাই যেন সবুজের চাদরে মোড়ানো। বেশ বড়সড় এলাকাজুড়ে বিহারটা। একটু ছায়ার আশায় বিহারের ফটকের বাঁ পাশের বড় গাছটার ছায়ায় মাথা লুকালাম। সেখানে অপেক্ষা করছিল আরেক বিনোদনের পসরা। বিশাল সেই গাছ থেকে নেমে আসা অসংখ্য ঝুরিতে নানা কসরত দেখিয়ে যাচ্ছে টারজানের স্থানীয় সংস্করণ এক পিচ্চি। নিচ থেকে হাততালি দিয়ে ওকে উৎসাহ দিয়ে গেলাম। মারুফ ক্যামেরা নিয়ে নানা কসরত করে পিচ্চির সেসব কসরত ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পিচ্চি নেমে আসতেই পাপারাজ্জির মতো তাকে ঘিরে ধরলাম। পিচ্চিকে সঙ্গে একপ্রস্থ ফটোসেশন করে তবেই ক্ষান্ত দিলাম।

এবার নজর দিলাম বিহার দর্শনে। আকারে বিহার ধাপের তুলনায় রীতিমতো দশাসই ভাসু বিহার। তেমন একটা পর্যটকের দেখা মিলল না। তবে বিহারের পুরো এলাকায় স্থানীয়দের উপস্থিতি রীতিমতো চোখে পড়ার মতোই। স্থানীয় লোকজন জায়গাটাকে গোচারণ ক্ষেত্র হিসেবেই ব্যবহার করে থাকে!

স্থানীয়ভাবে ভাসু বিহার পরিচিত ‘নরপতির ধাপ’ নামে। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ইউনিয়নে অবস্থিত এই বিহার বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের স্মৃতিবিজড়িত। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ভদ্রলোক ৬৩৮ সালে এখানে পদার্পণ করেছিলেন। নিজের ভ্রমণবিবরণীতে তিনি এই বিহারকে ‘পো-শি-পো’ বা ‘বিশ্ববিহার’ নামে অভিহিত করেন। সে সময় বিহারের ৭০০ ভিক্ষুকে জ্ঞানার্জন করতে দেখেছিলেন হিউয়েন। তাঁর এসব তথ্য থেকে ধারণা করা হয়, হয়তো বা সে সময় ভাসু বিহার বিদ্যাপীঠ হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হিউয়েন সাঙের বিবরণের ওপর ভিত্তি করেই স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ভাসু বিহারকে বৌদ্ধ বিহার হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন। এ প্রত্নস্থলে খননকাজ শুরু হয় ১৯৭৩-৭৪ সালে এবং এর পরের দুই বছর তা অব্যাহত থাকে। এ সময় সন্ধান মেলে দুটি মাঝারি আকারের ‘সংঘারাম’ ও একটি মন্দিরের স্থাপত্যিক কাঠামোসহ বেশকিছু প্রত্নবস্তুর। বৃহদায়তন সংঘারামটির আয়তন পূর্ব-পশ্চিমে ৫৬ মিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ৪৯ মিটার। এর চার বাহুতে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য রয়েছে ৩০টি কামরা। আর অপেক্ষাকৃত ছোট সংঘারামটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৪৯ মিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে ৪৬ মিটার এবং এতে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য আছে ২৬টি ঘর। বিহারের অদূরে উত্তরমুখী মন্দিরটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৩৮ মিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে ২৭ মিটার। মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে দেখা মেলে একটি বর্গাকার মণ্ডপের এবং এর চারদিকে রয়েছে ধাপে ধাপে ওপরে উঠে যাওয়া প্রদক্ষিণ পথ। খননকাজ চলাকালীন প্রাপ্ত প্রায় ৮০০ প্রত্নবস্তুর মধ্যে ব্রোঞ্জের মূর্তি, পোড়া মাটির ফলক এবং পোড়া মাটির সিল বেশ গুরুত্ব বহন করে। এ ছাড়া এ সময় সন্ধান মেলে মূল্যবান পাথরের গুটিকা, মাটির গুটিকা, নকশাঙ্কিত ইট, মাটির প্রদীপসহ অসংখ্য প্রত্নবস্তু। এসব প্রত্নবস্তু ভাসু বিহারের শেষ সময়ের অর্থাৎ দশম বা একাদশ শতকের স্বাক্ষর বহন করে।

বিহার ধাপের মতো এটিও পড়ে আছে বেশ অরক্ষিত অবস্থায়। পুরো এলাকাটির বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে বিহারের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খেজুর ও তালগাছগুলো। সূর্যের শেষ রশ্মি পশ্চিম দিগন্তে ঠিকরে পড়তেই হিউয়েন সাঙের স্মৃতিবিজড়িত এই বিহার থেকে বিদায় নিলাম।   

ছবি: লেখক

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে বগুড়া যায় এসআর পরিবহন, টিআর ট্রাভেলস, শ্যামলী, হানিফ, কেয়া ইত্যাদি পরিবহনের এসি ও ননএসি বাস। শহরের মূলকেন্দ্র সাতমাথা বা ঠনঠনিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে চেপে সহজেই পৌঁছাতে পারেন বিহার ধাপ ও ভাসু বিহারে। পাশাপাশি দেখে নিতে পারেন মহাস্থানগড়ও।


মন্তব্য