kalerkantho


শিবরী এখন নানারূপে

একটা সময় শাড়িতেই শিবরী ডাই ব্যবহার করা হতো। এখন ব্যবহার করা হচ্ছে সালোয়ার-কামিজ, টপস, পালাজ্জো, কুর্তি, শার্ট, পাঞ্জাবির মতো নানা পোশাকে। এর সঙ্গে ব্যাগ এবং নানা রকম ফেব্রিকস জুয়েলারিও যোগ হয়েছে—পিন্টু রঞ্জন অর্ককে এমনটাই জানালেন ডিজাইনার এস এম মাঈন উদ্দিন ফুয়াদ

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শিবরী এখন নানারূপে

মডেল : সাদিয়া ও তুষার সাজ : ভ্যালেনটিনা ছবি : কাকলী প্রধান পোশাক: মাঈন উদ্দিন ফুয়াদ

অনেকে শিবরীকে ‘বাটিক’ ভেবে ভুল করেন। আবার অনেকে প্রচলিত টাইডাইয়ের সঙ্গে শিবরীকে গুলিয়ে ফেলেন। আসলে জাপানি টেক্সটাইলের একটি অনন্য ডাইংপ্রসেস হলো শিবরী ডাই। বাংলায় এটিকে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ঢেউয়ের যেমন অসংখ্য বৈচিত্র্য, তেমনি শিবরী ডাইংও বৈচিত্র্যে ভরপুর। পোশাকে এ ধরনের ডাইংয়ের কাজটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। পরতে বেশ আরাম। সব ঋতুতে সব বয়সী মানুষের জন্য দারুণ মানানসই বলে শিবরী ডাইয়ের পোশাকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

প্রায় সব পোশাকেই শিবরী ডাই

আগে কেবল শাড়িতেই শিবরী ডাই ব্যবহার করা হতো। এবার শাড়ি ছাড়াও সালোয়ার-কামিজ, টপস, পালাজ্জো, লং ম্যাক্সিতে, কুর্তি, শার্ট, পাঞ্জাবির মতো নানা পোশাকে শিবরী ডাইয়ের ব্যবহার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। পোশাকে ফেব্রিক হিসেবে কটন, লিলেন, চায়নিজ লিলেন, ভিসকস লিলেন, পাতলা ডেনিম, সফট সিল্ক ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। ট্রেডিশনাল শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে শিবরীর কাজ এক অন্য রকম আবেদন সৃষ্টি করে।

 

রঙের উৎপত্তি

চা পাতা, মেহেদি পাতা, ইন্ডিগো ডাস্ট, কাঁঠাল, শিকড়-বাকল, ডালিয়া ফুল, ডালিম ফলের খোসা, হরীতকী, ঝাউগাছ, গাঁদা ফুল, সুপারি, পেঁয়াজ, গাব ফল, হলুদ, চাঁপা ফুল ইত্যাদি থেকে উত্পন্ন হরেক রকম প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে পোশাকে শিবরী ডাই করা হয়।

 

 

 

যেভাবে শিবরী ডাই করা হয়

কাপড় ভাঁজ করে, পেঁচিয়ে, হাতে সেলাই করে, বাঁধুনি দিয়ে শিবরী ডাই করা হয়। শিবরী ডাইয়ের ক্ষেত্রে কাপড়ের ভাঁজটাই হচ্ছে মুখ্য। কারণ ভাঁজটা যেভাবে দেওয়া হয়, কাপড়ের ওপর ডাইয়ের রেখাগুলো ঠিক সে রকমই হবে। নানা উপায়ে কাপড় ভাঁজ করা যেতে পারে। এটা নির্ভর করে ডিজাইনের রুচি ও চাহিদার ওপর।

পোশাকে সাধারণত ছয় রকমের শিবরী ডাই নিয়ে বেশি কাজ হয়। এগুলো হলো কানোকো, মিউরা, কুমু, নুইং, আরাশি ও ইটাজিমি। নামগুলো জাপানি ভাষার।

ডাইংয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে ডিজাইনটা ঠিক করতে হয়। সে অনুযায়ী ট্রেসিং। এরপর ট্রেসিংয়ে সুই দিয়ে ছিদ্র করে উপরি ভাগে কেরোসিন ও নীল পাউডার (লাইট কালারের ক্ষেত্রে, ডিপ কালারের ক্ষেত্রে কেরোসিনের সঙ্গে সাদা পাউডার) গুলিয়ে মিক্সারটা ট্রেসিং পেপারের ওপর ব্রাশ দিয়ে ঘষতে হয়। এভাবে ঘষলেই ডিজাইন অনুযায়ী কাপড়ের ওপর শিবরীর ডাই হয়ে যায়।  

পোশাকে শিবরীর বড় বড় লাইন করতে চাইলে কাপড় ভাঁজ করার পর তার ওপর নির্দিষ্ট মাপের কাঠ দিয়ে বেঁধে ডাই করা হয়। কাঠ কিভাবে বাধা হবে এবং এর সংখ্যা কেমন হবে তার ওপর নির্ভর করে ডাইয়ের রেখাগুলো বড় কি ছোট হবে। পোশাকে ঢেউ বা ঝরনার মতো ডাইয়ের জন্য আগে ডিজাইন অনুযায়ী কাপড় সেলাই করা হয়। এরপর পাইপের মধ্যে সুতা পেঁচিয়ে বাঁধা হয়। তারপর ডাই করা হয়।

 

সাধারণ মেশিনারি পদ্ধতিতে এই কাজটি পুরোপুরি করা সম্ভব নয়। এ জন্য হস্তশিল্পীদের দিয়ে এ কাজটি করতে হয়। বহুল সূচিবন্ধনীর সম্মিলনে একটি ডিজাইন সম্পন্ন হয়। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চাটিতলা গ্রামে জিয়াউল হক মামুনের তত্ত্বাবধানে ‘কর্মভূমি’ নামে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মাধ্যমে শিবরী ডাইংয়ের কাজটি করেন।

 

ডিজাইন বৈচিত্র্য

মেয়েদের কামিজ, কুর্তি, টপসের মতো পোশাকগুলোকে শিবরী ডাইয়ের রঙের সঙ্গে মিল রেখে বুকে ও কলারে  একরঙা কাপড়ের সঙ্গে চিকন পাইপিন ব্যবহার করে কনট্রাস্ট করা। কিছু পোশাকে শিবরীর সঙ্গে কাঁথা স্টিচ, হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করে নকশায় বৈচিত্র্য আনা হয়েছে।

হালফ্যাশনের কেইপ স্টাইলের কুর্তিতে শিবরী ইয়ক ব্যবহার দেখা গেল। লিলেনের পালাজ্জোতে জিগজ্যাকের মতো করে শিবরী ডাই ব্যবহৃত হয়।

ছেলেদের পাঞ্জাবিতে সলিড কালারের শিবরী ডাই করা হয়েছে। শিবরীর আবেদনটা যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য পাঞ্জাবির বডিতে আলাদা কোনো অলংকরণ করা হয়নি। বডির সঙ্গে কনট্রাস্ট করে ভিন্ন রঙের কলার ও প্লেট ব্যবহার এবং বোতাম নীল রঙের।

শার্টে কালার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে। প্রথমে সলিড কালারে ডাই। তারপর একে ভিনটেজ রূপ দেওয়ার জন্য কেমিক্যাল ব্যবহার করে কালারটাকে একটু ফেড করে দেওয়া হয়েছে। স্লিম ফিটের শার্টে কলারের ভেতরের অংশে ব্যান্ড ব্যবহার করা। শার্টের বডির সঙ্গে কনট্রাস্ট করে প্লেটজুড়ে দেওয়া। বোতামগুলোও ভিন্ন রঙের।

 

অন্যান্য

পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ ও জুয়েলারিতেও শিবরী যুক্ত করে টোটাল লুকটা একই আবহের মধ্যে রাখার চেষ্টা। মূলত শিবরী কাপড়ের সঙ্গে বোতামের ব্যবহার করে এসব জুয়েলারি বানানো হয়েছে। কানের দুল, ঝুমকার মতো শিবরী ডাইয়ের জুয়েলারিতে নানা রঙের বাটন ব্যবহার করে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে।


মন্তব্য