kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঘাগুটিয়ার পদ্ম বিলে

বিশ্বজিৎ পাল বাবু   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঘাগুটিয়ার পদ্ম বিলে

সময়টা শরতের। তার পরও প্রকৃতিতে এই রোদ, এই বৃষ্টি।

সকালে মাথায় রোদ নিয়ে বের হলেও পদ্ম বিলে পৌঁছতে না-পৌঁছতেই বৃষ্টির আগমন। এর মধ্যে চারদিকে শোনা গেল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো এক আওয়াজ। এই বিলের মধ্যে এই আওয়াজ কোথা থেকে এলো? কৌতূহল মনের প্রশ্নের জবাব মিলল খানিক পরেই।

পদ্মের পাতায় মুষলধারে বৃষ্টি পড়ায় এমন শব্দের সৃষ্টি। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে বিলপারে থাকা একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। অপেক্ষাকৃত উঁচু ওই বাড়ি থেকে পদ্ম বিলে চোখ পড়তেই যেন মন ভরে ওঠে। আহা! প্রকৃতির কী অপরূপ সাজ! বিলে যেন আসন পেতেছে শত শত পদ্ম ফুল। শত একর বিলজুড়ে জলে ভাসছে পদ্ম। কেউ কেউ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছে, কেউ বা ছবি তুলছে। কেউ আবার ডিঙি নৌকায় চড়ে গিয়ে তুলে আনছে পদ্ম। এ যেন এক অন্য রকম উন্মাদনা পেয়ে বসেছে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে। হওয়ারই তো কথা। অনেকের মতে, পদ্মের এত বড় বিলের যে দেখা  মেলা ভার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম ঘাগুটিয়া। আর ওপারেই ভারতের পশ্চিম ত্রিপুরার আমতলী থানার মাধবপুর গ্রাম। বাংলাদেশ-ভারতের এই দুটি গ্রামের মাঝখানেই এই বিশাল পদ্ম বিলের অবস্থান। তবে বিলটার একটা বড় অংশই পড়েছে বাংলাদেশের ঘাগুটিয়া গ্রামে। হিন্দু ধর্মালম্বীদের দুর্গা দেবীর পূজায় কাজে লাগে এই পদ্ম ফুল। সে জন্য আশ্বিন মাসে এ বিল থেকে বাংলাদেশ-ভারতের মানুষ প্রচুরসংখ্যক পদ্ম ফুল সংগ্রহ করে থাকে। ভারতের স্থানীয় বাজারে এসব পদ্ম বিক্রিও হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কাগজে-কলমে বিলটির নাম ‘বিল ঘাগুটিয়া’। প্রতিবছর আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত এ বিলে পদ্ম ফুল ফোটে। বিল থেকে পানি নেমে গেলে ধীরে ধীরে পদ্মও এই বিল থেকে উধাও হয়ে যায়। বাকি সময়টুকুতে এখানে বোরো ধানের চাষ হয়।

স্থানীয়দের মতে, গত ৪০-৪৫ বছরের মধ্যে নাকি এ বছরই সবচেয়ে বেশি পদ্ম ফুটেছে বিলটিতে। ওই গ্রামের পাশের মিনারকুটেও রয়েছে আরেকটি ছোট্ট পদ্ম বিল। কার্তিক মাস পর্যন্ত এখানেও ফুল ফুটে থাকে। তবে বিলের আসল সৌন্দর্য দেখতে চাইলে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে আসাই ভালো।

কথা হলো, ঘাগুটিয়া বিলের পাশের এক বাসিন্দা মো. ইউনুস মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানালেন, পদ্ম বিলের টানে এখানে প্রতিবছর প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসে। তাঁর বাড়িতে বাঁশ দিয়ে তৈরি বসার জায়গায় গা এলিয়ে অনেকে পদ্ম বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করে। দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন পূজার সময়, বিশেষ করে ভারতের লোকজন এসে ওই বিল থেকে পদ্ম ফুল নিয়ে যায়। ইউনুস মিয়া বলেন, পদ্ম বিলটি সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করলে ভালো হতো।

পাশেই ছিলেন মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার মো. আব্দুল্লাহ। তিনি দিলেন একটা মজার তথ্য, ‘২০১৪ সালের দিকে দেশি-বিদেশি একটি গবেষকদল এখানে এসে পদ্মের শিকড় নিয়ে যায়। তবে পরে জানা যায়, ওই শিকড় নিয়ে তারা পদ্ম চাষের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ’

এত কথা শুনে মন চাইছিল পদ্ম ফুলের ছবি তোলার জন্য বিলের ভেতরে যেতে। কিন্তু যাবই বা কিভাবে? এ সময় চোখে পড়ল এক ছোট্ট ছেলে ডিঙি নৌকা চালিয়ে আমাদেরই দিকে আসছে। কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করলাম ওর নাম। বলল, ‘জুনায়েদ। বিলের কাছেই আমাদের বাড়ি। ’ নৌকা নিয়ে বিলে ঘুরতে বেড়িয়েছে ও। আমাদের ইচ্ছার কথা বলতেই এক কথায় রাজি হয়ে গেল। এত ছোট ‘মাঝি’র নৌকায় উঠতে খানিকটা দ্বিধা থাকলেও শেষমেশ জুনায়েদের নৌকাতেই ভেসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরই বুঝলাম ছোট হলেও মাঝি হিসেবে জুনায়েদ বেশ পাকা। বিলের মধ্যে গিয়ে দেখা মিলল আরো দুই কিশোর সাদেক ও রাসেলের সঙ্গে। ওরা এসেছে পদ্ম ফুল তুলতে। এগুলো দিয়ে নাকি ঘর সাজাবে। চাইলে বিল দেখতে আসা লোকজনকেও তারা ফুল তুলে দেয়। ওদের দেখাদেখি আমরাও কয়েকটা পদ্ম সংগ্রহ করি স্মারক হিসেবে। পদ্ম বিলে এসেছি, দু-একটা ফুল বাসায় না নিয়ে গেলে কি হয়!

ছবি: লেখক

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ট্রেনে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন। ভাড়া ট্রেন ও শ্রেণিভেদে ৬৫ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। স্টেশনে নেমেই সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ নিলে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় পৌঁছা যাবে বিল ঘাগুটিয়ায়। অটোরিকশা রিজার্ভ নিয়ে নিলেই ভালো। কেননা ঘাগুটিয়া এলাকায় অটোরিকশা নিয়মিত পাওয়া যায় না


মন্তব্য