kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হাসানপুরের পাখির গ্রামে

এ কে এম তাজকির-উজ-জামান    

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হাসানপুরের পাখির গ্রামে

ছবি : লেখক

খুব বিরক্তি নিয়ে কাঠবিড়ালি তার লম্বা লেজটা নাড়িয়ে, মাথাটা উঁচু করে দেখল। গাড়ির হর্ন আর ড্রাইভার লিটনের ‘সর, সরে যা’ জাতীয় কথাবার্তায় খুবই বিরক্ত সে।

ভাবখানা যেন, তার নিজের রাজ্যে হঠাৎ এ কোন বেয়াদবের আগমন। গাড়ির আরোহীরা তাকে নিয়ে গবেষণা শুরুর আগেই খাবার নিয়ে কাঠবিড়ালিটা নিজেকে আড়াল করতে রাস্তা ছেড়ে পাশের ঝোপে ঢুকে পড়ল।

যাচ্ছি পাখির গ্রামে। অর্থাৎ নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের হাসানপুর গ্রামে। উপজেলা সদর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামটি প্রায় আট কিলোমিটার দূরে। প্রাকৃতিকভাবেই এ অভয়াশ্রমে গড়ে উঠেছে পাখিদের বসবাস। রাস্তার দুই ধারে তাল-নিমের সারি সারি গাছ। অর্জুন কিংবা কাঁঠালগাছের ফাঁকে ফাঁকে বাঁদরলাঠির (সোনালু) হলুদ ফুলগুলো যেন কিশোরীর কানের দুলের মতো দুলিয়ে দুলিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। সবুজ প্রকৃতি এখানে আরো আবেদনময়ী। নীল আকাশে পেঁজা কালো মেঘের ঘনঘটা আর পাখির পালকের স্পর্শের মতো হিমেল বাতাস পাখি দর্শনে এনে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। চলার পথে শুধু কাঠবিড়ালিই নয়, দেখা মিলল ঘুঘু, শালিক আর কাঠঠোকরার। এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ, হর্নের চিত্কার যেন বড়ই বেমানান।

মহাদেবপুরে কাজে যোগদানের পরই খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, কাছেপিঠেই এক গ্রামে রাজ্যের পাখির বসবাস। কাজের চাপে ওখানে যাওয়া হচ্ছিল না। এর মধ্যে খবর এলো, স্থানীয় বিলগুলোতে কারেন্ট জাল বসিয়ে পাখি ধরা হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখাই এবারের উদ্দেশ্য, বাড়তি হিসেবে পাখিদের গ্রাম দেখে আসা যাবে। পৌঁছলাম গিয়ে বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ। একটু মেঘলা দিন হওয়ায় অন্য দিনের চেয়ে আকাশটা একটু বেশি কালো।

পিচঢালা রাস্তাটা শেষ হয়েছে যেখানে, সেখান থেকে পাখিদের গ্রাম দেখতে আরো প্রায় সিকি কিলোমিটার যেতে হবে। কাঁচা রাস্তা ধরে আধাপাকা কিছু বাড়ি পেরিয়ে গ্রিলের একটি বড় গেটের সামনে এসে থামল আমাদের গাড়ি। ভেবেছিলাম বিশাল অভয়াশ্রমের ভেতরে ঢুকছি বোধ হয়; কিন্তু তা নয়, আসলে এটা একটা মসজিদ। অর্ধশতাব্দী পুরনো হাসানপুর জামে মসজিদ। এর সামনে একটি পুকুর। পুকুরের এক পাশ বাঁধানো। আটটা সিমেন্টের বসার বেঞ্চ রয়েছে এখানে। ছোট একটি বাগানের মাঝখানে গোল করে বাঁধানো বসার ব্যবস্থা। আর পুকুরের অন্য প্রান্তে সেই পাখিদের বসবাস।

ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে পাখি। নির্ভয়, নিশ্চিন্তে আপন নীড়ে। কত ধরনের পাখি আছে এখানে, কিভাবে শুরু হলো এই অভয়াশ্রমের? উত্তর দিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান। তিনি ও তাঁর জামাই এখানকার পাখিদের বন্ধু। পাখিদের এই অবাধ বিচরণে তাঁরা কাজ করছেন বহুদিন ধরে।

অনেক ধরনের পাখি আছে এখানে। সাদা রঙের বক, সাদা আর সোনালি ডানায় সোনাবক, সাদা-কালোয় মাখা শামুকখোল, পানকৌড়ি, ধূসর বর্ণের রাতচরা বা কানাবক এখানে মিলেমিশে আছে। ঘুঘু তো অগণিত। মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক দেখা যাবে হরহামেশাই। মান্নান সাহেবের হিসাবে পাঁচ হাজারের ওপরে পাখি আছে এখানে। আরো নতুন দু-তিন জাতের পাখির অস্তিত্ব থাকলেও তিনি সবার নাম জানেন না। অথচ শুরুটা ছিল মাত্র পাঁচ জোড়া দিয়ে।

সেটা ২০০৬ সালের গোড়ার দিকের কথা। মসজিদের পূর্ব পাশে গড়ে ওঠা কবরস্থানে পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়। আশপাশের গ্রামবাসীর সহায়তায় পাখি ধরা যাবে না, তাদের বিরক্ত করা যাবে না—এমনটা প্রচারণা শুরু করে সফলতা পাওয়া গেল। বছর দুই পেরোতেই পাখিদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল প্রায় ৫০ জোড়া। পাখিশিকারিদের প্রতিহত করা, প্রশাসনের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া নিশ্চিত করা আর সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টায় দিন দিন পাখির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মান্নান সাহেব বললেন, ‘আমরা এর আশপাশে কাউকে আসতে দিই না। ’

এখন প্রজনন মাস চলায় পাখিদের প্রায় প্রতিটি বাসায় ছোট ছোট ছানা। কোনো কোনো বাসায় এখনো পাখি ডিমে তা দিয়ে যাচ্ছে। কৌতূহল মেটানোর জন্য মান্নান সাহেবকে বলতেই তিনি নিয়ে চললেন কবরস্থানের দিকে। বাঁশবাগান, আমগাছ, খেজুরগাছ, হিজলগাছের ডাল আর শাখা-প্রশাখায় শুধু পাখি আর পাখি। বাসার ভেতর থেকে ছোট্ট ছানাপোনাগুলো ঠোঁট বের করে বাইরে উঁকি মারছে; হয়তো খাবারের আশায়। কাছেপিঠে হয়তো ওদের মা-বাবা খাদ্য সংগ্রহে গেছে। নির্জন পরিবেশটায় শুধুই পাখিদের কলকাকলি। মান্নান সাহেব পাখিদের এতটাই আপন যে পাখিরা তাঁকে ভয় পায় না। বাঁশের ডালে সোনাবক, রাতচরা কিংবা পানকৌড়ির রেডি ফ্ল্যাট। দূর থেকে যেগুলোকে আমগাছের পাতা মনে হচ্ছিল, কাছে এসে দেখলাম সেগুলো সবই পাখি। ন্যাড়া আমগাছটায় পাখিগুলো যেন ফুলের মতো ফুটে আছে।

মজার ব্যাপার হলো, পাখির এই অভয়াশ্রম সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক ও নিরাপদ। স্থানীয় মসজিদের মুসল্লি রহমান জানালেন, এয়ারগান নিষিদ্ধ করে দেওয়া দরকার। কথা বলার ফাঁকে উপস্থিত গ্রামবাসী দাবি তুলল, এখনো যারা পাখি মারে তাদের কঠোর সাজা দিতে হবে। বক প্রজাতির পাখিরা ছোট জলজ জীব খেয়ে বেঁচে থাকে। উড়ে উড়ে বিভিন্ন বিল, ধানক্ষেতে পাখিরা গেলে সেখানে কারেন্ট জাল পেতে রাখে শিকারিরা। আর সেখানে ভুলে আটকে যায় সহজ-সরল পাখিগুলো। সেসব বন্ধ করা দরকার।

পূর্ব দিকের পুকুরপাড়ে গাছগুলোর মাটি সরে গিয়ে শিকড় বের হয়ে পড়েছে। ফলে সামনের বর্ষায় গাছগুলো পড়ে গেলে বিপদ বাড়বে পাখিগুলোর। মান্নান সাহেব জানালেন, কবরস্থানে বড় গাছ না থাকায় অনেক পাখিই বাসা বাঁধতে পারছে না। পাশের ইউক্যালিপটাসগাছের বদলে অন্য গাছ থাকলে আরো বেশি পাখি এখানে আসতে পারত। এখনো অনেক পাখি আসে। জায়গা না পেয়ে আবার ফিরেও যায়।

২০১৩ সাল থেকে পাখির এই আনাগোনার খবর অনেকেই জানতে পারে। তখনই তত্কালীন নওগাঁর জেলা প্রশাসক মো. এনামুল হকের সাহায্যে পুকুরের এক দিকের ঘাট বাঁধানো এবং বসার জায়গা তৈরি করা হয়। গ্রামবাসীর দাবি, পুরো পুকুরটা বাঁধাতে পারলে পাখির বাসস্থান আরো মজবুত হতো।

পাখিদের গল্পে বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে আপ্যায়নের জন্য এলো গাছপাকা লিচু আর স্থানীয় নাকফজলি আম। নো ফরমালিন, নো কেমিক্যাল। আশপাশের গ্রামবাসীর সবারই নানা পরিকল্পনা, মতামত শুনতে শুনতে টের পেলাম পাখির প্রতি এখানকার মানুষের নিখাদ ভালোবাসা। শুধু রাতচরা আর সোনাবকের মিলেমিশে থাকা নয়, এখানে মিলেমিশে আছে মানুষ আর পাখিরাও।

হাসানপুর থেকে ফিরে আসছি। চোখে ভাসছে পাখি ওড়ার অসম্ভব সুন্দর সব দৃশ্য আর কানে বাজছে মধুর কূজন। চোখের সামনের নীল আকাশটা প্রলম্বিত হচ্ছে ধীরে ধীরে। সেখানে তো কোনো সীমারেখা নেই। তাহলে বাংলাদেশের অন্য গ্রামগুলো কেন একেকটি ‘হাসানপুর’ হচ্ছে না?

         

কিভাবে যাবেন

ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর, মহাখালী থেকে বাসে নওগাঁ। ভাড়া নন-এসি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, আর এসি ৬০০ টাকা। এরপর লোকাল বাসে মহাদেবপুর, ভাড়া ৩০ টাকা। হাসানপুর পর্যন্ত ইজিবাইক ও সিএনজি অটোরিকশায় ভাড়া ১৫ টাকা। নওগাঁ শহর থেকে মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায় (রিজার্ভ) ১৫০০ টাকায়। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে শান্তাহার আন্তনগর ট্রেন ছাড়ে। দ্রুতযান, একতা, লালমনি, রংপুর এক্সপ্রেসে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৬০ টাকা। নীলসাগর ছাড়ে ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে।


মন্তব্য