kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মুগ্ধতার লেক মাধবপুর

শিমুল খালেদ

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মুগ্ধতার লেক মাধবপুর

ছবি : লেখক

শ্রীমঙ্গল শহর ছেড়ে যাওয়ার পরই বোঝা গেল প্রকৃতিতে শরতের শুভ্র সতেজতার উপস্থিতি। সদ্য গত হওয়া বর্ষার বৃষ্টিতে নেয়ে চারপাশের অরণ্যগুলো বেশ সজীব দেখাচ্ছে।

সেই সব অরণ্য স্পর্শ করে আসা আর্দ্র বাতাসের হিম ভেজা পুলক অবারিত স্রোতের মতো আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল চোখে-মুখে-হাতে। খোলা জিপ ছুটে চলেছে অরণ্যের ঘ্রাণ মেখে, লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্টের সর্পিল বুক চিরে। গন্তব্য মাধবপুর। সকালের জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস আমাদের নামিয়ে দিয়েছিল শ্রীমঙ্গল স্টেশনে। সেখানে একপলক জিরিয়েই মাধবপুরগামী জিপে আমাদের চেপে বসা। মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা সকালের মিষ্টি রোদ কোথাও কোথাও অরণ্যের ঠাস বুনট ভেদ করে ফোঁটা ফোঁটা দাগের মতো ভেসে আছে কৃষ্ণবর্ণের পিচঢালা রাস্তার ওপর। কোথাও আবার নিরেট কালো, গাছপালার দঙ্গল ভেদ করে সূর্যালোক ওখানে পৌঁছতে পারেনি। উঁচু-নিচু পথে জিপটি মাঝেমধ্যে দুলুনি খাচ্ছিল আর মনে করিয়ে দিচ্ছিল বান্দরবানের চান্দের গাড়ির কথা। লাউয়াছড়া ছাড়িয়ে ভানুগাছ হয়ে মাধবপুর বাজারে পৌঁছার একটু আগে পড়ে মাধবপুরের মণিপুরি গ্রাম। মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের জন্য বিখ্যাত এই গ্রাম। প্রতিবছর রাস উৎসবের সময় দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকের ঢল নামে এখানে। চলন্ত জিপ থেকে মণিপুরিদের নিপুণ হাতে গড়া সাদা রঙের ছোট ঘরগুলোর ওপর চোখ মেলে রাখি। তাকিয়ে থাকি মন্ত্রমুগ্ধের মতো।

মাধবপুর বাজার থেকে লেকে যেতে হয় রিকশা করে। হেঁটেও যাওয়া যায়। তবে হুডখোলা রিকশায়ই যেতে যেতে প্রকৃতির সুধা আহরণ করা যায় মনের মতো করে। আমরাও রিকশার যাত্রী হই। দুই পাশে অবারিত বিস্তৃত চা বাগান—অনিন্দ্য, নিরেট সবুজ আর পরিপাটি। মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে হালকা বালুকাময় সাদা রাস্তা। সেটা কোথাও উঁচু, কোথাও বা নিচু। যেতে যেতে চোখে পড়ে চা শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য। কেউ কেউ চাগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। আবার অনেককেই শুকনো ডালপালা, কাঠ কুড়াতে ব্যস্ত মনে হলো।

হঠাৎই বিমূঢ়তায় ছেদ কেটে টিহ্ টিই টিই টি...কূজনে উড়ে দূর অরণ্যে হারিয়ে গেল অচেনা কোনো এক বিহঙ্গ।

যেতে যেতে পথের বাঁকেই পড়ল চা বাগানের ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের বাংলো। এখান থেকে লেকের দূরত্ব ২০০ থেকে ২৫০ মিটার। রিকশার দুলুনি খেতে খেতে চলেছি সেই পথেই। চড়াই-উতরাই পথের শেষে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। দূর থেকে সামনে তাকিয়ে স্রেফ উঁচু একটা বাঁধ দেখতে পাচ্ছিলাম, আর কিছু না। কিন্তু বাঁধের ওপর ওঠার পর সম্পূর্ণ দৃশ্যপটই যেন পাল্টে গেল। মনে হলো, যেন হঠাৎ করেই মঞ্চের পর্দা সরে গেছে! আর তাতে একমুহূর্তেই ভেসে ওঠা উঁচু-নিচু পাহাড়-উপত্যকার মধ্যে ছবির মতো সুন্দর মাধবপুর লেক। অসংখ্য পাহাড়সারির মধ্যে স্ফটিকস্বচ্ছ নীল জল দৃষ্টির পরিধি নিয়ে গেল অনেক দূর। শান্তস্নিগ্ধ দুপুরে পাখপাখালির কিচিরমিচির নীরবতার মধ্যে সুরের আল্পনা এঁকে দিচ্ছিল। সঙ্গে হালকা ফুরফুরে বাতাস—সব মিলিয়ে অপূর্ব। বাঁধের একপ্রান্ত থেকে লেকের সাত-আট ফুট ভেতরে চলে গেছে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি মাচা। তবে ঠিক বোঝা গেল না এটি পর্যটকদের বসার জন্য, নাকি গোসলের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে। তৈরির কারণ যা-ই হোক না কেন, ওতে বসে ঠাণ্ডা জলে পা ভিজিয়ে মন জুড়িয়ে নিতে তো কোনো মানা নেই!

মাধবপুর চা বাগানকে পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষার জন্য ১৯৬৫ সালে তত্কালীন বাগান কর্তৃপক্ষ দুই সারি পাহাড়ের মধ্যে বাঁধ তৈরি করেছিল। এ বাঁধের জন্যই ছোট ছোট পাহাড় বা টিলাগুলোর পাদদেশে পানি জমে সৃষ্টি হয় মনোরম এই লেক। স্থানীয়রা একে ‘ড্যাম’ হিসেবেই চেনে। মাধবপুর লেকের দৈর্ঘ্য আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। লেকের পানিতে বেগুনি-নীলাভ আভা ছড়িয়ে ফুটে আছে অসংখ্য শাপলা। বেগুনি-নীল রঙের এই শাপলার প্রাচুর্যের জন্য অনেকে এই লেককে ‘লেক অব দ্য লোটাস’ নামেও চেনে। মাধবপুর লেকের দুই পাশের পাহাড়ের সৌন্দর্য দুই রকম। লেকের সৌন্দর্য ভালোভাবে উপভোগ করতে হলে পাহাড়চূড়ায় উঠতে হয়। বাঁ দিকের পাহাড়গুলো চা বাগান ও ছায়াবৃক্ষ শোভিত। আর অন্য পাশের পাহাড়গুলো বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ। এই পাহাড়গুলোর উচ্চতা ১০০ ফুটের মতো। আমরা লেকের বাঁ পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। লেকের পাড়ে পাড়ে পাহাড়ের পাদদেশের মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে হাঁটাপথ, যা এগিয়ে গেছে লেকের কিনারা ছুঁয়ে। কয়েকজন পর্যটককে দেখলাম লেকে মাছ ধরার জন্য বড়শি নিয়ে বসে গেছেন। আমরাও খানিক সময়ের জন্য দর্শক বনে গেলাম।

লেকের পাড়েই আছে পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি সুদৃশ্য ছাউনি। লেকের পাড় ধরে অনেকক্ষণ বেড়ানোর পর পাশের পাহাড়ে ওঠার জন্য ঘন চাগাছের ফাঁকফোকরের ট্রেইল দিয়ে পাহাড়চূড়ায় উঠে গেলাম। পাহাড়ের চূড়া থেকে মাধবপুর লেকের সৌন্দর্য অসাধারণভাবে ধরা দিল আমাদের কাছে। পূর্ব দিকে তাকালে দৃষ্টির সীমা বিস্তৃত হলো ত্রিপুরার নীলচে-ছাই রঙের পাহাড়শ্রেণি পর্যন্ত। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেষ বিকেলের পড়ন্ত সূর্যরশ্মি আর দূর দিগন্তে নীড়ে ফেরা পাখির ঝাঁক স্পষ্ট আভাস দিচ্ছিল, মহাকাল থেকে আরেকটি দিন চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও নীড়ে ফিরতে হবে। গোধূলির লালিমায় স্বর্ণালি-সবুজাভে অপূর্ব হয়ে ওঠা চা বাগান পেরিয়ে আমরা যখন মাধবপুর বাজারে ফিরলাম, দিনের শেষ আলোটুকু তখন নিঃশেষ হওয়ার পথে।

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে মাধবপুর লেকে যেতে চাইলে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। এ জন্য ধরতে হবে ঢাকা-মৌলভীবাজার বা ঢাকা-বিয়ানীবাজার রুটের বাস। প্রতিদিন এই রুটে চলে শ্যামলী, এনা, রূপসী বাংলা পরিবহনের বাস। ভাড়া এসি, নন-এসি যথাক্রমে ৫০০ ও ৭০০ টাকার মধ্যেই। যেতে পারেন ট্রেনেও। সে ক্ষেত্রে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল অথবা ভানুগাছ স্টেশনে। তবে ভানুগাছ নামতে চাইলে আগেভাগে জেনে নেবেন আপনার ট্রেনের স্টপেজ ভানুগাছে আছে কি না। শ্রীমঙ্গল বা ভানুগাছ নেমে রিজার্ভে জিপ, অটোরিকশা নিতে পারেন। অথবা লোকাল বাস বা লোকাল অটোরিকশার যাত্রীও হতে পারেন। রাত্রিযাপনের জন্য ফিরতে হবে শ্রীমঙ্গল শহরে।


মন্তব্য