kalerkantho


আপনার শিশু

সন্তান পালনের নানা পদ্ধতি

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সন্তান পালনের নানা পদ্ধতি

একটি শিশু মানুষ হিসেবে কেমন হবে, তার অনেকখানি নির্ভর করে তাকে কোন পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হচ্ছে তার ওপর। নগরভিত্তিক সমাজে শিশুরা চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকে। তারা বাইরে থেকে শেখার সুযোগ খুব কম পায়, আর এ কারণেই মা-বাবার লালন-পালন পদ্ধতি শিশুর ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। শিশুটি আত্মবিশ্বাসী ও সহযোগিতার মনোভাব সম্পন্ন হবে, নাকি বিদ্রোহী অথবা প্যাসিভ হবে, তা লালন-পালনের ওপর নির্ভর করে। একটি শিশুকে শুধু মা-বাবাই লালন-পালন করেন না, পরিবারের সবাই লালন করে থাকে। তাই পরিবারের সবাইকে শিখতে হবে শিশু কোন পদ্ধতিতে লালন-পালন করতে হয়। মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই একটি ভালো পদ্ধতি ব্যবহার করে শিশুকে লালন করতে হবে। আসুন জেনে নিই শিশু লালনের কী কী পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে এবং সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি।

শিশু লালন-পালন পদ্ধতি

শিশু লালন-পালনের কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। এগুলো হলো অথোরেটারিয়ান, পারমিসিভ, ওভার প্রটেক্টিভ, আনইনভলভমেন্ট এবং অথোরেটেটিভ। এগুলোর বাংলা নাম দিলে সঠিক অর্থটি আসে না, তাই ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করা হলো।

অথোরেটারিয়ান

এই পদ্ধতির মা-বাবারা কড়া শাসনের মধ্যে ছেলেমেয়ে মানুষ করতে চান। আদেশ করামাত্রই ছেলেমেয়েরা তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা করেন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কড়া নিয়ম-কানুন মানতে হবে। ‘আমি বলছি তাই মানতে হবে’ এ জাতীয় মনোভাব থাকে। ছেলেমেয়েদের কোনো ধরনের স্বাধীনতা থাকে না। এ পদ্ধতিতে পালন করা সন্তানরা অনেক সময় মনে করে যে মা-বাবা তাকে ভালোবাসে না। নিয়ম-কানুনগুলো মা-বাবারা বকাঝকা বা মারধরের মাধ্যমে শেখানোর চেষ্টা করেন। ছেলেমেয়েরাও তা মেনে চলে। তবে তারা নিয়মগুলো ভালো বা যুক্তিযুক্ত মনে করে না; বরং মা-বাবার বকা ও মার খেতে হবে এই ভয়ে তা মানে। এর ফলে শিশুরা নিজের আচরণ নিজেই কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তা শেখে না; বরং তারা তুলনামূলকভাবে কম আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া তাদের স্বনির্ভরতার দিক থেকেও ঘাটতি থাকতে পারে। ফলে অনেকে কিশোর বয়সে এসে নানা রকমের ভুল করে ফেলে। যেমন : নেশার মধ্যে জড়িয়ে যায় এবং সব কিছু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেহেতু মা-বাবার, ফলে তারা তাদের নেশা থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্বও মা-বাবার বলে মনে করে। বড় হওয়ার পর তাদের সম্পর্কগুলোর মধ্যেও এর একটা প্রভাব পড়ে।

পারমিসিভ

এই পদ্ধতি আগের পদ্ধতির (অথোরেটারিয়ান/স্বৈরাচারী) চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে তেমন কোনো নিয়ম-কানুন নেই। নিয়ম থাকলেও তা খুবই এলোমেলোভাবে থাকে। শিশুর সব চাহিদা বলামাত্রই পূরণ করা হয়। শিশুটি বিপদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা না থাকলে শিশু যা করতে চায়, তাতেই মা-বাবা অনুমতি দেন। সমাজ কিভাবে তাদের প্রত্যাশা করে তার কোনো ধারণা মাতা-পিতা দেন না। এই শিশু-কিশোররা পরবর্তী সময়ে হটকারী, অসংযত, আক্রমণাত্মক আচরণ করে ও অবিবেচক হয়। কারণ তারা শিখতেই পারে না তাদের আচরণের নেতিবাচক প্রভাব কী এবং কিভাবে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ফলে তারা তাদের নিজেদের চাহিদার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এদের অনেকে অনেক সৃজনশীল হলেও তা ভালো কাজে লাগাতে পারে না।

ওভার প্রটেকটিভ

এ ধরনের মা-বাবা সন্তানকে পৃথিবীর সব রকম অনিষ্ট থেকে এতটাই দূরে রাখেন যে শিশুরা বাস্তবতা বুঝতে শেখে না। মা-বাবারা তাদের কোনো কষ্ট পেতে দেন না, সুনির্দিষ্ট বন্ধু ছাড়া অন্য বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মিশতে দেন না, ব্যথা পাওয়ার ভয়ে খেলতে পাঠান না, দুর্ঘটনার ভয়ে সাইকেল চালাতে দেন না, প্রেমে পড়বে তাই ছেলেমেয়েকে বিয়ে বাড়িতে যেতে দেন না বা দিলেও সার্বক্ষণিক তাদের সঙ্গেই থাকেন। তাদের সব কাজই মা-বাবা করে দেন। অনেকে এভাবে মানুষ করাকে ‘তোলা’ করে মানুষ করা বলেন। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী জীবনে বাস্তবতা না বুঝে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে, সামাজিকতা শিখতে পারে না, কষ্ট বা মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে শিখে না, অল্পতেই কাতর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিশু আত্মনির্ভরশীল হয় না ও কোনো কাজে আত্মবিশ্বাস পায় না।

আনইনভলভমেন্ট

পারমিসিভ ও ওভার প্রটেক্টিভ স্টাইলের সম্পূর্ণ বিপরীত হলো আনইনভলভমেন্ট স্টাইল। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা সন্তানের কোনো খোঁজ রাখেন না। সন্তানরা যা খুশি তা-ই করার সুযোগ পায়। সন্তান ভালো করলেও খোঁজ রাখেন না ও প্রসংশা করেন না। আবার ক্ষতিকর কোনো কাজ করলেও মা-বাবা তা জানার চেষ্টা করেন না। আর্থিক সংগতি থাকলে মা-বাবার একমাত্র দায়িত্ব হয় তাদের টাকা-পয়সা যা লাগবে দেওয়া। কোনো ধরনের গাইডলাইন তারা দেন না। কোনো যত্নও শিশু পায় না। শিশু হয়তো রাতে জ্বরে ভুগছে। কেউ জানতেও পারেনি তার জ্বর হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে জানলেও মা-বাবার সুযোগ হয়নি তাকে যত্ন নেওয়ার। শিশু তখন অনুভব করে তাকে কেউ ভালোবাসে না। সে একাকিত্বে ভোগে, দুশ্চিন্তা ও হীনম্মন্যতায় ভোগে এমনকি বড় হয়েও তাঁর সম্পর্কগুলোর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

অথোরেটেটিভ

বিশেষজ্ঞদের মতে শিশু লালনের সব চেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো অথোরেটেটিভ। এ পদ্ধতিতে শিশুর জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। শিশু এই সীমারেখার মধ্যে স্বাধীনতা ভোগ করে। আলোচনার মাধ্যমে নিয়ম-কানুনগুলো কখনো কখনো সামান্য শিথিলও করা হয়। শিশুরা বুঝতে পারে এ নিয়মগুলো ন্যায্য ও ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয় না। তাঁরা এটাও জানে, কোনো সমস্যা হলে মা-বাবার সঙ্গে নির্ভয়ে আলোচনা করা যাবে এবং সব সমস্যারই ভালো সমাধান বের করা যাবে। মা-বাবা প্রথমেই বকা দেবেন না বা শুধু শুধু তাদের দোষারোপ করবেন না। এ পদ্ধতিতে মা-বাবা নিয়ম তৈরি করে দেন। কিন্তু তার বাস্তবায়নের দায়িত্বের অনেকাংশ সন্তানদের হাতে তুলে দেন। সন্তান কোনো ভুল করে ফেললে মা-বাবা তাকে উচ্চ স্বরে তিরস্কার না করে শিশুর সঙ্গে বসেন, বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেন ও ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলেন। নিজের প্রত্যাশার কথা শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন এবং ভবিষ্যতে কিভাবে এ ভুল থেকে মুক্ত থাকা যায়, তা আলোচনা করেন। ফলে শিশুরা আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও ভালো আচরণ নিয়ে বেড়ে ওঠে এবং তারা শিখে যায় কিভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

প্রত্যেক মা-বাবা নিজস্ব জ্ঞান, পরিস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শিশুকে লালন-পালন করেন। কোনো মা-বাবাই পারফেক্ট নন। তাই পারফেক্ট না হতে পারার যন্ত্রণাও পাওয়ার দরকার নেই। যেটা করতে হবে : নিজেকে মূল্যায়ন করে দেখুন আপনি কোন পদ্ধতিতে সন্তান লালন করছেন এবং কিভাবে করলে আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য ভালো হবে।

 


মন্তব্য