kalerkantho


কোনারক সূর্য মন্দিরে

ফখরে আলম   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কোনারক সূর্য মন্দিরে

ওড়িশা ট্রাভেলসের বাস এসে থামল সূর্য মন্দিরের সামনে। বাস থেকে নেমে ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে পা রাখি সূর্য মন্দিরে। একজন লোক খুব নিচু গলায় জানতে চাইল, ‘বাবু, গাইড লাগে গা?’ ওকে বললাম, গাইড নিতে পারি, তবে বাংলায় সব বুঝিয়ে বলতে হবে। লক্ষণ দে নামের গাইড ভদ্রলোকটি উড়িয়া হলেও এরপর সে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি। মন্দিরে ঢোকার প্রবেশপথের দুই দিকে বিশাল আকৃতির দুটি সিংহ পা চাপা দিয়ে রেখেছে দুই হাতিকে। লক্ষণ বললেন, ‘সিংহ আর হাতিগুলো আস্ত এক মর্মর পাথর দিয়ে তৈরি। ’ মাথা উঁচু করে ২২৮ ফুট উঁচু সূর্য মন্দির দেখে নিই। ঘোড়ায় টানা রথের মতো করে মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে। সেই রথটিকে টানছে সাতটি ঘোড়া। এখানে সাতটি ঘোড়া মানে হচ্ছে সপ্তাহের সাত দিন। আর এই সাত দিনের ওপর ভর করে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। মন্দির দর্শন শুরু হয় বাঁ দিক থেকে। পাথরে খোদাই করে মন্দিরের দেয়ালে উত্কীর্ণ করা হয়েছে দুই দিকে ১২টি করে ২৪টি চাকা। দূর থেকে দেখলে রথের চাকা মনে হবে। আদতে এগুলো সূর্য ঘড়ি। ১২ মাস ২৪ পক্ষ ছাড়াও প্রতিটি চাকায় আটটি করে স্পোক ছিল। এগুলো হচ্ছে দিনের অষ্ট প্রহর। একটি চাকা বাদে অন্য চাকাগুলোতে এখন আর সময়টা দেখা যায় না। সেই চাকায় বড় স্পোক ছোট স্পোক এখনো সময় জানান দিচ্ছে। ৯ ফুট ব্যাসের চাকার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি।

মন্দির তৈরির গল্প শোনাল লক্ষণ, ‘পূর্ব গঙ্গা বংশের রাজা প্রথম নরসিংহ দেব দক্ষিণ বাংলা জয়ের স্মারক হিসেবে ১২৪৩-৫৫ সালে সূর্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ১২ একর জমির ওপর ১২ হাজার শ্রমিক, ১২০০ স্থপতির ১২ বছরের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এ মন্দির। খরচ হয়েছিল ৪০ কোটি স্বর্ণমুদ্রা।

১৮৩০ সালে খুরদার রাজা এই মন্দিরে আক্রমণ চালিয়ে তিনটি প্রবেশ তোরণ ক্ষতিগ্রস্ত করেন। এখান থেকে বেশ কিছু ভাস্কর্যও লুট করে নিয়ে যান। ১৮৬৯ সালে মন্দিরের উঁচু ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ৬০ ফুট উঁচু জগমোহনটি সংস্কার করে ব্রিটিশরা। এটি এখন মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ। ৭১ মণ ওজনের ২০ ফুট লম্বা ৮-১১ ইঞ্চি চওড়া লোহার খণ্ড মন্দিরের ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে। আর কোনো চুন-সুরকি, সিমেন্ট ছাড়াই শুধু দুই হাজার টন পাথর দিয়ে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দিরের চূড়ায় ছিল ৫৩ টনের একটি চুম্বক। লর্ড কার্জন ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরের সংস্কার করেন। এরপর মন্দিরের উত্তর গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন মূল মন্দিরের ভেতর প্রবেশও সংরক্ষিত। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরের সংস্কারকাজ করছে।

মন্দিরের দেয়ালে দেখা মিলে নানা রকম কারুকাজ। নাম না-জানা শত শত দেব-দেবী, ছয় হাতের শিব, পৌরাণিক মূর্তি, নর্তকি, মিথুন মূর্তি, রাজদরবারের নানা দৃশ্য, রাজার যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি, বালিকা বধূ, বাল্যবিয়ে, বিয়ের শোভাযাত্রা, সমকামিতা, ফাঁদ দিয়ে হাতি ধরা, জিরাফ, মৃদঙ্গ-করোতাল-বীণা, বাদ্যরতা, মোহিনীদের অপরূপ ভাস্কর্য, বউ-শাশুড়িসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিপুণভাবে পাথর কেটে মন্দিরের দেয়ালে উত্কীর্ণ করা হয়েছে। আমাদের অবাক দৃষ্টিতে সব ধরা পড়ে। মন্দিরের গায়ে রয়েছে এক হাজার ৭০০-এরও বেশি হাতির ভাস্কর্য। গাইড বললেন, ‘এখানে আরো পাঁচটি মন্দির রয়েছে। ড্যান্সিং হল মন্দির, জগমোহন মন্দির, প্রধান মন্দির, ছায়া দেবীর মন্দির ও মায়া মন্দির। ঘুরে ঘুরে সব দেখি-সূর্য দেবতার অভিনব মূর্তি থেকে শুরু করে মন্দিরের সবুজ মাঠের বাঁ দিকে থাকা দুটি হাতি আর রণসাজে প্রস্তুত ঘোড়া পর্যন্ত। এই হাতি, ঘোড়াও পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। অভিনব স্থাপনাশৈলীর ছায়া দেবীর মন্দিরটিও দেখি। এই মন্দিরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বঙ্গোপসাগর, চন্দ্রভাগা নদী। আহা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সাগর আর নদী দেখার অনুভূতিটাই অন্য রকম।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সোহাগ, ঈগল, গ্রিন লাইন, শ্যামলী পরিবহনে এক হাজার ৭০০ টাকা ভাড়ায় কলকাতা নিউ মার্কেটে। নিউ মার্কেট থেকে ৫০ টাকা ভাড়ায় হাওড়া স্টেশন। হাওড়া থেকে ‘পুরী’ কিংবা ‘দুরন্ত’ এক্সপ্রেসে ৫২০ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার পর পুরী। ভাড়া এসি থ্রি টায়ার ৯০০ টাকা। পুরী থেকে ওড়িশা ট্রাভেলের বাসে ৪০০ টাকায় ৬৪ কিলোমিটার দূরে পুরীর রাজধানী ভুনেশ্বর ঘুরে কোনারক সূর্য মন্দির।


মন্তব্য