kalerkantho


ধবল জ্যোত্স্নায়

তুষার কাব্য

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ধবল জ্যোত্স্নায়

আমরাই ফার্স্ট। আমরা মানে, আমি আর অনুপ।

সেই ঢাকা থেকে আমরা দুজন কক্সবাজারে পৌঁছে গেলেও দলের বাকিরা তখনো চট্টগ্রাম থেকে এসে পৌঁছতে পারেনি। হাতে সময় থাকায় নাশতা করে চলে গেলাম কক্সবাজার ৬ নম্বর ঘাটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ওরা ছয়জন’ও এসে পৌঁছল। আটজনের দল আমাদের। এক দুরন্ত কাফেলা! এক ফাঁকে ট্রলার রিজার্ভ করলাম। তার আগেই প্রয়োজনীয় বাজারসদাই করা হয়ে গেছে। এক রাতের জন্য মোটামুটি যা যা লাগবে সব জায়গা করে নিয়েছে ট্রলারে। আসলে আমাদের জলযানটাকে ট্রলার না বলে স্পিডবোটের বড় ভাই বলাটাই শ্রেয়! পুরনো হলেও এখনো ওটা বেশ চওড়া আর তাগড়া জোয়ান আছে। বোঝাই যায়, এককালে ৪০-৫০ জন যাত্রী নিয়ে দিব্যি দাবড়ে বেড়িয়েছে সমুদ্রের বুকে। ট্রলার ছাড়তেই আমাদের উচ্ছ্বাস সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে দূর আকাশের সঙ্গে মিলতে থাকে। একেকটা ঢেউয়ের সঙ্গে ঝকঝকে দুপুরের রৌদ্রও এসে গলা মেলাচ্ছে যেন। আর সেই সিম্ফনি গিয়ে মিশছে দূর সোনাদিয়া দ্বীপে। জোয়ার আর ভাটার খেলায় পড়ে আমাদের সমুদ্র যাত্রাও বেশ দীর্ঘায়িত হলো। ভাটার কারণে অনেকটা পথ ঘুরে যখন সোনাদিয়ায় পা রাখি, ততক্ষণে মধ্যদুপুর।

দ্বীপে আমাদের স্বাগত জানালেন নাসির ও গিয়াস ভাই। দারুণ আন্তরিক এই দুই ভাই দ্বীপে থাকা সময়টুকু আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন অকৃপণভাবে। আগেই বলে রাখায় আমাদের দুপুরের খাবারটা রান্না হয়েছে তাঁদের বাড়িতেই। জম্পেশ খানাদানা করে এসেই তাঁবু ফেললাম সমুদ্রের পারে। ঝাউবনটা পেছনে রেখে চারটা তাঁবু দাঁড়িয়ে গেল সাগরের দিকে মুখ করে। নাসির ভাইয়ের তথ্যমতে পূর্বপাড়া আর পশ্চিমপাড়া—এই দুই পাড়া মিলেই সোনাদিয়া দ্বীপ। পূর্বপাড়ায় থাকে ১৫০ পরিবার, আর পশ্চিমপাড়ায় ১৭০ পরিবারের বসবাস। প্রায় প্রতিটি পরিবারই মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত।

বিকেল হতেই লাল কাঁকড়ার খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। এখানে সমুদ্র যেন একটু বেশিই শান্ত। ভয়ংকর গর্জন করে বিশাল কোনো ঢেউ আছড়ে পড়ে না এই নিরিবিলি দ্বীপে। বরং আলতো পরশ এঁকে যায় শুধু আদরের চুম্বনে। যেন অলিখিত কোনো চুক্তি আছে সাগরের সফেদ ফেনার সঙ্গে। বিনিময়ে অমোঘ ভালোবাসার বিনিময়টাও হয়ে যায় এক রকম নীরবেই। এই শান্ত সমুদ্রে গাঙচিলেরাই একমাত্র সাক্ষী সেই ভালোবাসার। মাঝেমধ্যে বহু দূরে মাছ ধরার ট্রলারের ছায়াটাই কেবল দেখা যায়। দ্বীপের একদম শেষ প্রান্তে এসে দেখা পেয়ে গেলাম একঝাঁক লাল কাঁকড়ার। মনুষ্য জাতির দেখা পেয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে যায় গর্তে। তাড়াহুড়োয় যারা নিজেদের আবাসস্থল খুঁজে নিতে পারেনি, ওদের সঙ্গে জমল বেশ। অনেকক্ষণ ধরে ওদের সঙ্গে চলল ‘কানামাছি খেলা’।

সুর্য্যি মামা বিদায় নিতে চাইলে আমরাও সেই খেলাধুলায় সমাপ্তি টেনে ফিরলাম নিজেদের ক্যাম্পে।

সারা দিনের অপেক্ষারও শেষ হতে চলল। একটু পর আকাশজুড়ে রাজত্ব করবে শুধুই জ্যোত্স্নারা। ধবধবে সেই পূর্ণিমায় নিজেদের ভিজিয়ে নিতেই আজ আমরা এই নির্জন দ্বীপে। অনেক দিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হওয়ার পথে। দলের একজন তো ইতিমধ্যে নিজেকে এই দ্বীপকে ‘রাজা’ বলে ঘোষণা করলেন। কারণ আমরা ছাড়া দ্বীপের এই অংশটায় আর কোনো জনমানুষের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। আমাদের রাজত্বে আমরাই যেন রাজা।

আজন্ম সাধ ছিল ধবধবে পূর্ণিমায় ফানুস উড়ানোর। সন্ধ্যা ছুটি নিতেই আস্তে আস্তে রাতের আকাশের দখল নিতে শুরু করল জ্যোত্স্না দল। সেই সঙ্গে আকাশের রংও বদলাতে শুরু করল ধীরে ধীরে। আকাশের গায়ে আজ আলোর ফোয়ারা। চাঁদ যেন তার সবটুকু যৌবন ঢেলে দিয়েছে। সেই আলোয় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি আমরা। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটার পর একটা ফানুস পাঠাতে লাগলাম চাঁদের দেশে। এর মধ্যেই তাঁবুর একপাশে শুরু হয়ে গেছে ফায়ার ওয়ার্ক। আগুনের ফুলকিও যেন আকাশ ছুঁতে চায় আজ। এমন ধবল জ্যোত্স্নায় নির্বাক হয়ে যাই। ওপরে আকাশ আর পাশে শান্ত সমুদ্দুর। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সুখের গান গাইতে গাইতে একসময় সবাইকে তাঁবুর ভেতর যেতেই হয়। কারো চোখে হয়তো ঘুম আসবে কিংবা কেউ বা সারা রাত জ্যোত্স্না দলের সঙ্গে গল্প করেই এমন একটি রাতকে ভোর করে দেবে সানন্দে। সেসব ভাবতে ভাবতে নিজেই চলে যাই স্বপ্নের দেশে।

-- ছবি : লেখক

 

কিভাবে যাবেন

 

 

প্রথমে কক্সবাজারের কলাতলী বা লাবণী পয়েন্ট থেকে কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাটে আসতে হবে। ওখানে মহেশখালী আসার জন্য স্পিডবোট পাওয়া যাবে। ভাড়া প্রতিজন ৭৫ টাকা। মহেশখালী ঘাটে পৌঁছতে সময় লাগবে ১২-১৫ মিনিট। এ ছাড়া ট্রলারে চড়েও আসতে পারেন। ভাড়া ৩০ টাকা। সময় লাগবে ৪৫-৫০ মিনিট। মহেশখালী ঘাটে নেমে রিকশা নিয়ে চলে আসবেন গোরকঘাটা বাজারে। ভাড়া ২০ টাকা। সেখান থেকে যেতে হবে ঘটিভাঙায়। সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া ১৫০-১৬০ টাকা। সময় লাগবে ৩০-৪০ মিনিট। ঘটিভাঙা থেকে সোনাদিয়া পশ্চিমপাড়ার উদ্দেশ্যে দিনে শুধু একটি ট্রলারই ছেড়ে যায়। ছাড়ার সময় জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে, তবে সাধারণত সকাল ১০টা বা ১১টার দিকে ছাড়ে। ৪০-৫০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় সোনাদিয়ায়। ভাড়া ৩০ টাকা। আবার সকালে সোনাদিয়া থেকে একটি মাত্র ট্রলারই ছেড়ে আসে মহেশখালী। সোনাদিয়ায় পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। রাত যাপন করতে চাইলে স্থানীয়দের বাসায় থাকতে হবে। অথবা সঙ্গে করে তাঁবু নিয়ে যেতে পারেন ক্যাম্পিং করার জন্য।   

 

 

ছবি : সীমান্ত দীপু


মন্তব্য