kalerkantho


গরমে নরম তাঁত

তাঁতের শাড়ির জনপ্রিয়তা এখন বিয়েবাড়ি অবধি পৌঁছে গেছে। দেশীয় তাঁতে এসেছে আভিজাত্য আর নতুনত্বের ছোঁয়া। সুতি তাঁত বরাবরই জনপ্রিয়। নতুনত্ব এসেছে রেশম আর সুতির মিশেলে তৈরি হাফ সিল্ক তাঁত। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মারজান ইমু

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গরমে নরম তাঁত

চল্লিশোর্ধ্ব রাবেয়া মুহসিন জানালেন, হাফ সিল্ক তাঁতের বেশকিছু শাড়ি রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। উজ্জ্বল রং আর মার্জিত নকশার কারণে পছন্দ করেন এ শাড়ি। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া মেয়ে যেকোনো অনুষ্ঠানে এই শাড়িই পরতে পছন্দ করেন। স্নিগ্ধ হেসে আরো বললেন, মজার বিষয় হলো, একই শাড়ি আমাদের মা-মেয়ে দুজনকেই সমানভাবে মানিয়ে যায়। মেয়ে রায়না শাড়ির পাশাপাশি অবশ্য হাফ সিল্কের সালোয়ার-কামিজ, টপসও পছন্দ করে। তার মতে, হাফ সিল্কে ফেব্রিকসে বেশ একটা আভিজাত্য ভাব রয়েছে। একই সঙ্গে বেশ শৌখিনও। উৎসব বা জমকালো পার্টির জন্যই তোলা থাকে হাফ সিল্কের কামিজ। গ্রীষ্মের সফট রংগুলো পাওয়া যায়, সে জন্য হাফ সিল্কের পোশাক পছন্দ।

বিবিয়ানার ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, তাঁতের মধ্যে সবচেয়ে আরামদায়ক ও নরম কাপড় হলো হাফ সিল্ক। তাঁতিদের  কাছে যা আবার নরম তাঁত নামেই পরিচিত। বাজারে হালকা ও উজ্জ্বল দুই রংয়ে পাওয়া যায় তাঁতের হাফ সিল্ক। শুধু শাড়ি নয়, যেকোনো পোশাকেই হাফ সিল্ক আরামদায়ক। টপস, টিউনিক, শার্ট, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ সব কিছুতেই আরামের পাশাপাশি থাকে জমকালো ভাব। তবে সুতির তুলনায় বেশ স্বচ্ছ আর পাতলা কাপড় হাফ সিল্ক। তাই পোশাক তৈরিতে বাড়তি একটা লেয়ার জুড়ে দিতে হয়। ফলে যাদের বেশি গরম অনুভূত হয় তাঁরা গ্রীষ্মের দুপুরে হাফ সিল্কের পোশাক এড়িয়ে চলতে পারেন। এ ছাড়া হাফ সিল্কের সালোয়ার-কামিজ অধিকাংশই রাতের অনুষ্ঠানের উপযোগী করেই তৈরি হয়। কিন্তু গরমে হাফ সিল্ক শাড়ির যেকোনো সময়ের জন্যই উপযোগী।

হাফ সিল্ক তাঁতের নতুনত্ব নিয়ে রঙ বাংলাদেশের ডিজাইনার সৌমিক দাশ বলেন, দাওয়াত বা উৎসবে শাড়িতে একটু জমকালো ভাব চাই, যার পুরোটাই পাওয়া যাবে হাফ সিল্ক তাঁতে। তাঁতের নকশা ছাড়াও অ্যাপ্লিক, এমব্রয়ডারি বা হাতের কাজের মতো বাড়তি নকশা যোগ করে উৎসব-উপযোগী করা হয়েছে। সুতির চেয়ে এই ফেব্রিকসে যেকোনো রং খুব ভালো আসে। তাই নকশা ছাড়া প্লেইন একটা হাফ সিল্কের শাড়ি কিংবা কামিজ জমকালো লুক নিয়ে আসবে।

ধানমণ্ডি হকার্সের শাড়ির দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেল, শাড়ির রঙে প্রাধান্য পেয়েছে নীল, সবুজ, মেরুন, গোলাপি, অফহোয়াইট, পেস্ট, লেমন, ইয়োলো ইত্যাদি। আবার রাতে পরার জন্য থাকছে হলুদ, টিয়া, ম্যাজেন্ডা, কমলার মতো উজ্জ্বল সব রং। শাড়ির বুননে থাকছে কলকা, ফুল আর বরফি নকশার জমকালো কাজ। কোনো শাড়ির আঁচলের নকশায় শুধু তিন রঙের বুনন ব্যবহার করা হয়েছে। শাড়ির জমিন একরঙা, আঁচল আর পাড়ে আবার আলাদা দুটি রং।

তাঁতের হাফ সিল্কে আরেকটি জনপ্রিয় বুনন হলো পাটি শাড়ি। পাটির মতো নকশা করে বুনন হয়েছে শাড়ি। বুননে এক বা একাধিক রঙের সুতা ব্যবহার করা হয়েছে। আঁচল আর পাড়ে কনট্রাস্ট রং। হাফ সিল্ক তাঁতের শাড়ির আর একটা বৈচিত্র্য হলো ছোট নকশার আঁচল। অন্যান্য শাড়ির আঁচলের চেয়ে কিছু শাড়ির আঁচলের নকশা বা ডিজাইন একটু ছোট করে তৈরি হয়েছে। শাড়ি পরতে অভ্যস্ত নন যাঁরা কিংবা যাঁদের উচ্চতা কম, তাঁদের কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে ছোট আঁচলের নকশা। ১২ থেকে ১৪ হাত লম্বা হয় এই শাড়ি। কিছু শাড়ির সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া হয় ব্লাউজ পিস। চওড়া জরিপাড়ও হাফ সিল্ক তাঁতের একটা জনপ্রিয় ডিজাইন।

 

অঞ্জন’সের ডিজাইনার শাহীন আহম্মেদ বলেন, তাঁতের হাফ সিল্কের বুননকৌশল, রং, ডিজাইন অন্য যেকোনো ফেব্রিকস থেকে আলাদা। শাড়ির পাড় ও আঁচলের নকশা এ শাড়ির মূল আকর্ষণ। জনপ্রিয়তার ধারবাহিকতায় শাড়ির সঙ্গে আছে হাফ সিল্কের তৈরি সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, টপসসহ শিশুপোশাক। স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি, কাঁথা স্টিচ, বিভিন্ন ম্যাটেরিয়ালের কাজ করা হয়েছে। একরঙা তাঁতের থান দিয়ে নানা পোশাক তৈরি করে তাতে একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করে কাজ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব বুনন ডিজাইন ব্যবহার করে তাঁতিদের দিয়ে বানানো তাঁতের শাড়িও আছে।

দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের শোরুমে মিলবে তাঁতের হাফ সিল্কের কামিজ, টপস, গাউনসহ বিভিন্ন পোশাক। বেশির ভাগই জমকালো ধাঁচের। এমব্রয়ডারি, সিকোয়েন্স, লেস, পার্ল-পুঁতিসহ নানা ধরনের ভ্যালু অ্যাড করা হয়েছে। রং নিয়ে বলার কিছু নেই। রঙের স্বর্গরাজ্য এই হাফ সিল্ক তাঁত। গ্রীষ্মের উপযোগী সব রংই পাবেন এসব পোশাকে।

অনলাইন শপ পটের বিবির ডিজাইনার ফোয়ারা ফেরদৌস জানালেন, দেশিয় ফেব্রিকস নিয়ে কাজ করতে ভালবাসি। দাম হাতের নাগালে হওয়ায় হাফসিল্কের জনপ্রিয়তা বেশি। নিজস্ব ডিজাইন দিয়ে হাফ সিল্ক তাঁতের শাড়ি তৈরি করি। ছিমছাম হাফ সিল্ক শাড়ির সঙ্গে একটা জমকালো ব্লাউজে ষোলআনা উৎসবের আমেজ ফুটে ওঠে।

যত্ন-আত্তি

শৌখিন কাপড় হাফ সিল্ক। তাই মনোযোগী হতে হবে যত্ন-আত্তির বিষয়ে। হাতে ধোয়ার একদমই পক্ষপাতী নন ডিজাইনার সৌমিক দাস। ড্রাইওয়াশের পরামর্শ দেন তিনি। জানালেন, সাদা, অফহোয়াইট, গোলাপি, হলুদ, সবুজ, আকাশি বা অন্যান্য হালকা রং নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তবে মেরুন, লাল, গাঢ় নীল বা বেগুনির মতো রং নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যায়। তাই পছন্দের পোশাকটি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে ড্রাইওয়াশই ভালো উপায়। আর ব্যবহারের পর ঘামে ভেজা কাপড় কখনোই তুলে রাখা যাবে না। আবার কড়া রোদও কাপড়ের ক্ষতি করতে পারে। খোলা বাতাসে শুকিয়ে রাখুন। আয়রন করার সময় পোশাকটি উল্টে নিন। একটু যত্ন নিলে অনেক দিন নতুন থাকবে।


মন্তব্য