kalerkantho


আপনার শিশু

গেমের নেশা

তানজির আহম্মদ তুষার,ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক,মনোবিজ্ঞান বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গেমের নেশা

খেলার মাঠ কমে যাওয়া ও প্রযুক্তির উত্কর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে একটি সমস্যাও সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো ভিডিও গেমের নেশা। আজকাল শিশুরা কম্পিউটারে বা প্লে স্টেশনে গেম খেলতে পছন্দ করে।

আমরা বড়রাও তাদের আদর করে গেমের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনে দিই। গেমের মাধ্যমে শিশুরা অনেক কিছু শিখতেও পারে আবার এই গেম যদি নেশার পর্যায়ে পড়ে তখন শিশুটির শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও লেখাপড়ার দিক থেকে ক্ষতিও হয়। তাই অভিভাবকদের লক্ষ্য রাখতে হবে শিশুর গেমটি যেন নেশার পর্যায়ে না পড়ে।

 

কী করে বুঝবেন

নিচের প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন আপনার শিশু গেমের নেশায় আক্রান্ত কি না। নিচের বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে বুঝতে হবে শিশুটি গেমের নেশার মধ্যে আছে।

♦         শিশুটি কি লম্বা সময়ের (তিন/চার ঘণ্টা) জন্য গেম খেলে?

♦          শিশুটি কি সময় মেনে গেম খেলতে ব্যর্থ হয়?

♦          গেম খেলার জন্য নির্ধারিত সময় শেষে উঠে পড়তে বাধ্য হলে অস্থির হয়ে যায়?

♦          শিশুটি কি অন্যান্য কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে (যেমন : সামাজিক যোগাযোগ, কারো বাসায় বেড়াতে যাওয়া বা বাইরের খেলাধুলা)?

♦          খেলার কারণে শিশুটির পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হচ্ছে?

♦          শিশুটি স্কুল থেকে দেওয়া বাড়ির কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে?

♦          সে কি খেলার জন্য ঠিকমতো স্কুল করছে না?

♦          শিশুটি কি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকছে  (গেম খেলার কারণে)?

♦          সে কি তার বন্ধু গ্রুপে কম মিশছে বা শুধু যারা গেম খেলছে তাদের সঙ্গে মিশছে?

♦          সে কি পারিবারিক নিয়ম ভঙ্গ করছে, যাতে সে আরো বেশি সময় ধরে গেম খেলতে পারে (যেমন : রাতে ঘুম থেকে উঠে গেম খেলছে বা বেশি খেলার জন্য মিথ্যা বলছে)?

♦          খাবার কম খাচ্ছে, গেমের সামনে বসেই খাচ্ছে, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে অবহেলা করছে, ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে না?

♦          সে কি গেম খেলতে নিষেধ করলে বা গেমের সময় কমানোর কথা বললে আক্রমণাত্মক আচরণ করে?

 

কী করণীয়

প্রতিরোধে : সব গেম শিশু-কিশোরদের জন্য নয়। অনেক গেম আছে শুধু বড়দের জন্য। তাই শিশুদের কম্পিউটার ও গেম দেওয়ার সময় লক্ষ রাখুন, যেন বয়স উপযোগী হয়। কোন কোন গেমে বয়স অনুযায়ী মুড সেট করা যায়, তাও করে নিতে পারেন।

গেম দেওয়ার শুরুতেই চুক্তি করে নিন যে সে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে কতটা সময় ধরে গেম খেলতে পারবে। দিনের কোন সময়ে খেলবে। বেশি খেললে মা-বাবার দায়িত্ব কি হবে তাও আলোচনা করুন।

পর্যবেক্ষণ করুন : অনেক মা-বাবা আছেন, যাঁরা গেম খেলতে দেখলেই অস্থির হয়ে যায়। শিশু-কিশোররা কিছুটা গেম খেলতেই পারে। তাই প্রথমেই অস্থির হয়ে যাবেন না। প্রথমেই অস্থির হয়ে গেলে শিশু বা কিশোরটি গেমের ব্যাপারে আপনার পরামর্শকে গুরুত্ব দেবে না। শিশুর গেম খেলার ধরন, এক নাগাড়ে কতক্ষণ ধরে খেলছে, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় গড়ে কতক্ষণ গেম খেলছে, গেম খেলার ফলে তার কী কী ক্ষতি হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করুন।

আলোচনা করুন : পর্যবেক্ষণ করার পর শিশুর সঙ্গে আলোচনা করুন। শিশুকেই প্রশ্ন করুন সে কতক্ষণ ধরে গেম খেলে, তার কী কী শারীরিক সমস্যা হচ্ছে, পড়াশোনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না ইত্যাদি। এ সমস্যাগুলো এমনই থাকলে তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনটা কেমন হতে পারে ভাবতে সাহায্য করুন।

পিসি বা গেম যন্ত্রে সতর্ক সংকেত লিখে রাখতে বলুন

শিশু-কিশোররা অনেক সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই কম্পিউটার বা প্লেস্টেশনের গায়ে সতর্কতা সংকেত লিখে রাখা যেতে পারে। যেমন : একটি ছাত্র তার কম্পিউটারের গায়ে ও গেমের ফোল্ডারে লিখে রেখেছিল ‘উড় ুড়ঁ ধিহঃ ঃড় ঢ়ধংং’। এর ফলে সে যতবার গেম খেলতে যেত ততবার লেখাটি দেখে ফেল করার ভয়ে পরীক্ষার মধ্যে আর গেম খেলেনি।

সেল্ফ মনিটরিং ডায়েরি : অনেক সময় শিশুরা প্রশ্ন করলেই সচেতন হয়ে যায়। আবার অনেক সময় শিশুরা বুঝতে পারে না যে এতটা সময় নষ্ট হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরটিকে বিভিন্ন ধরনের সেল্ফ মনিটরিং ডায়েরি দেওয়া যেতে পারে। যেমন :

সময়—সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র শনি রবি ৬-৯৯-১০ সঃপত্র ১০-১১১১-১২১২-১১-২২-৩৩-৪৪-৫৫-৬৬-৭৭-৮৮-৯৯-১০১০- এই ডায়েরিটিতে শিশুটি সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে প্রতিটি সময়ে কিভাবে কাটছে তা লিখবে। যেমন : আজ সোমবার সকাল ৯-১০টা এই সময় সংবাদপত্র পড়লে সোমবারের ৯-১০টার ঘরে ‘সংবাদপত্র’ লিখতে হবে। তাহলে শিশু-কিশোরটি তার দিন কিভাবে কাটছে তা টের পাবে। প্রতিটি দিন শেষে মোট কত ঘণ্টা গেম খেলা ও কত ঘণ্টা পড়াশোনা হলো তাও নিচে লিখতে বলতে হবে। এতে তার কাছে প্রকৃত সত্যটি অনুভূত হবে।

কখন ও কিভাবে গেম বন্ধ করতে হবে : কখনো কখনো এমন হয়ে যায় যে শিশু-কিশোরটি সব সময়ই গেম খেলছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে গেম বন্ধ করে দেবেন না। এভাবে বন্ধ করে দিলে তার মধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে। গেম  খেলার মধ্যে কথা বলবেন না। কারণ এ সময় সে আপনার কথার দিকে মনোযোগ ও গুরুত্ব দিতে পারবে না। তাই তার সঙ্গে কথা বলতে হলে তার গেমের একটি পর্যায় বা মিশন শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষ করুন অথবা গেমটি থামাতে (চধঁংব) বলে এরপর কথা বলুন। জিজ্ঞাসা করুন সে কতক্ষণ ধরে গেম খেলছে? আর কতক্ষণ খেলতে চায়? ঠিক কয়টার সময় গেম বন্ধ করবে? ধরুন সে বলল ‘আমি ১১:৩০ এ গেম বন্ধ করব’। ১১:২০ এ তাকে একটি সতর্কসংকেত দিন এবং দু-এক মিনিট আগে আবারও সতর্কসংকেত দিন। এরপর ঠিক ১১:৩০ এ গেম বন্ধ করতে বলুন।

পুরস্কার হিসেবে গেমের ব্যবহার : নির্দিষ্ট পরিমাণ পড়াশোনা বা বাড়ির কাজ করলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা বাড়তি সময়ের জন্য গেম খেলার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এভাবে গেমের আকর্ষণটি পড়াশোনার আকর্ষণে পরিণত করুন।

সাইকোথেরাপি : ওপরের কৌশলগুলো প্রয়োগ করেও যদি শিশুর গেমের নেশা থেকেই যায়, তবে তাকে সাহায্য করার জন্য কোনো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে সাইকোথেরাপি করানো যেতে পারে।


মন্তব্য