kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুনশ্চ মসলিন

বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে মসলিন। অভিজাতদের পছন্দের শীর্ষে এ কাপড়ের খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। ইংরেজ ঔপনিবেশিক সময়কার হারিয়ে যাওয়া মসলিন নানা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ফিরছে সগৌরবে। মসলিন প্রত্যাবর্তনের খবর জানালেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পুনশ্চ মসলিন

মসলিন মানে বাংলার তাঁতিদের গৌরবের গল্প, যে গল্পের খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। এমনই মিহি ছিল যে একটি আংটির ভেতর দিয়ে ঢোকানো যেত বাংলার মসলিন।

একসময় মসলিন ছিল দামি উপহার। অভিজাতদের ঘরে শোভা পেত মসলিন। ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের ফলে রাতারাতি কপাল পোড়ে তাঁতিদের। যন্ত্রের সঙ্গে পেরে ওঠেনি তাঁতিদের মানবিক আঙুলগুলো। জীবিকার তাগিদে মসলিন কারিগরদের কেউ চাষি হয়েছে, কেউ বা নৌকার মাঝি, কেউ বা খুঁজে নিয়েছে অন্য উপায়। নানা কারণে এখন বিলুপ্তপ্রায় এক ঐতিহ্যের নাম মসলিন।

তবে মসলিনকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দেখা গেছে আবারও। সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরে দৃক, আড়ং ও জাতীয় জাদুঘরের যৌথ আয়োজনে মাসব্যাপী ‘মসলিন উৎসব’ ছিল আশাজাগানিয়া। সতেরো, আঠারো শতকে ঢাকাই মসলিনের যে ঐতিহ্য, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিয়েছেন দৃকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ও তাঁর দল। তিন বছরের বেশি সময় গবেষণা চালিয়ে তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন মসলিনের মূল উৎস ‘ফুটি কার্পাস তুলা’। গাজীপুরের শ্রীপুরে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় এ তুলা চাষ করেছেন। তা থেকে সুতা তৈরি করে স্থানীয় কারিগর দিয়ে দুটি মসলিন শাড়িও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফুটি কার্পাসগাছের তুলা দিয়ে দৃক স্থানীয় তাঁতিদের দিয়ে যে কাপড় বুনন করেছে, তা ৩০০ কাউন্টের। তাই ধরে নেওয়া যায়, শত বছর পর নতুন করেই ফিরে আসছে গৌরবের মসলিন।

উৎসবে গিয়ে দেখা হলো নারায়ণগঞ্জের মসলিনশিল্পী মো. আল-আমিনের সঙ্গে। পূর্বপুরুষরা মসলিনের কাজ করতেন। তাঁদের কাছ থেকেই মসলিন বানানো শিখেছেন। এখন মূলত জামদানির কাজ করছেন। তিনি জানালেন, ‘মসলিনের মূল উপাদান সূক্ষ্ম সুতা। এটি প্রস্তুত করাও বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এ ছাড়া রয়েছে উত্পাদন খরচ ও দক্ষ কারিগরের মজুরি। সব মিলিয়ে দাম পড়ে যায় অনেক। সেই দামে কেনার লোকও খুব কম। তবে সরকারের সুনজর পেলে মসলিনের হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধার সম্ভব। ’

মসলিনের ধরন

আমরা সাধারণত যে কাপড়গুলো পরি, তা ৪০, ৫০ কিংবা ৬০ কাউন্টের। কাউন্ট যত বেশি হয়, কাপড়ও তত সূক্ষ্ম হয়। মসলিন অনেক সূক্ষ্ম কাপড়। তবে এখন মসলিন নামে যে ধরনের কাপড় বাজারে আছে, কাউন্টের দিক থেকে সেগুলো বেশ কম বলে জানিয়েছেন ডিজাইনাররা। এ প্রসঙ্গে স্টুডিও এমদাদের ডিজাইনার এমদাদ হক বললেন, ‘মসলিনের তো অনেক ধরন আছে। সেদিক থেকে জামদানিও মসলিনের একটা ধরন। আমাদের এখানে এখন যে ‘মসলিন’ কাপড় উত্পাদিত হচ্ছে সেগুলো টু বাই টু প্লাই কিংবা টু বাই থ্রি প্লাই সুতার। চেষ্টা চলছে এগুলো কিভাবে আরো মিহি করা যায়। এখন যে মসলিন পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, টপস এমনকি পাঞ্জাবিও তৈরি হচ্ছে। ’

শাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই

আগে কেবল মসলিনের শাড়ির কথাই শোনা যেত। এখন মসলিনের থান দিয়ে শাড়ির পাশাপাশি, সালোয়ার-কামিজ, টপস. কুর্তি—সবই হচ্ছে। এগুলো কিভাবে করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিজাইনার তানিয়া কাউসারি দিশা বললেন, ‘ প্রথমে তাঁতিদের কাছ থেকে মসলিন থান কাপড় সংগ্রহ করি। সেই কাপড়ে নিজেরা ডিজাইন করি। শাড়ির পাশাপাশি টপস, কামিজ, কুর্তা এগুলোও বানাচ্ছি একই প্রক্রিয়ায়। ’

নকশায় স্বাধীনতা

দারুণ মিহি মসলিন কাপড়ের একটা বিশেষ সুবিধা হলো—ইচ্ছামতো নকশা করা যায়। তানিয়া কাউসারি জানালেন, যে কেউ যে ধরনের নকশাই চায় না কেন, করতে পারবেন।

এখন বসন্তকাল। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে প্রকৃতি। তাই ডিজাইনারদের বানানো মসলিনের পোশাকে এবার ফ্লোরাল মোটিফই প্রাধান্য পাচ্ছে। পাশাপাশি লতা-পাতাসহ প্রকৃতির অন্য অনুষঙ্গও ঠাঁই পেয়েছে মোটিফের ক্ষেত্রে—জানালেন তানিয়া কাউসারি দিশা। শাড়ির জমিনজুড়ে থাকছে ফুলেল মোটিফে মেশিন এমব্রয়ডারির কাজ। আঁচল আর পাড়ে মেশিন এমব্রয়ডারির পাশাপাশি হাতের কাজ, কারচুপির কাজও থাকছে। কামিজের বুকেও মেশিন এমব্রয়ডারির পাশাপাশি হাতের কাজ থাকছে। কামিজের হাতায় কাঁধ থেকে একটু নিচে, বাইরের অংশে ফুলেল মোটিফ ব্যবহার করে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। আবার ভিন্ন রঙের কাপড় ও লেইস ব্যবহার করেও নকশা করা হয়েছে।

রঙের বাহার

মসলিনের কথা মনে হলে চোখের সামনে অফহোয়াইট রং ভেসে ওঠে। এ প্রসঙ্গে ডিজাইনার এমদাদ হকও জানালেন, মসলিন মূলত অফহোয়াইট কালারেরই হয়ে থাকে। তবে ইদানীং সেই কালারেও কিছুটা বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। তানিয়া কাউসারি দিশা জানান, অফহোয়াইট কালারের পাশাপাশি মেরুন, নীলের মতো নানা উজ্জ্বল রং ব্যবহার করা হচ্ছে। সেটা কেমন তারও ব্যাখ্যা দিলেন তিনি, ধরুন শাড়ির জমিনটা অফহোয়াইটই থাকছে। কিন্তু এর আঁচল এবং পাড়ে অন্য রং করে আনা হয়েছে বৈচিত্র্য। মসলিন শাড়িতে মখমলের বা শার্টিন কাপড়ের আলাদা পাড় ব্যবহার হয়েছে। আবার সেই পাড়ে ভিন্ন রঙের লেইস যোগ করে কন্ট্রাস্ট করা। সালোয়ার-কামিজেই বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। তানিয়া কাউসারি বলেন, কিছু কামিজের বডি মসলিনের। হাতা ভিন্ন রঙের লিনেন বা অন্য কোনো কাপড়ের। একই ওড়নায় লাল, সাদা, মেরুনসহ বিভিন্ন রঙের শেড ব্যবহার করা হয়েছে।

যাদের জন্য

যাদের গড়ন পাতলা তাদের জন্যই মসলিন কাপড় বেশ মানানসই। কারণ মসলিন কাপড় একটু ফোলা। ফলে পাতলা গড়নের মেয়েদের শরীরে দারুণ মানিয়ে যাবে এটা। তবে যারা একটু মোটা, তাদের মসলিন এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ এটা পরলে আরো মোটা দেখাবে।

দাম

মসলিন কাপড়ের দাম নির্ভর করবে এর নকশার ওপর। শাড়ি পাবেন ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। সালোয়ার কামিজ পাবেন ৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকায়। টপস পাবেন সর্বনিন্ম ৪ হাজার টাকায়। চাইলে থান কাপড় কিনে নিজেও বানিয়ে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে টু বাই ওয়ান প্লাই সুতার থান কাপড়ের দাম পড়বে প্রতি গজ ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, টু বাই টু সুতার দাম প্রতিগজ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, আর টু বাই থ্রি সুতার প্রতিগজ ৪৬০ থেকে ৫৫০ টাকা।

একটু সতর্কতা

মসলিন কাপড় ব্যবহারের সময় একটু সতর্ক থাকতে হবে। ঘাম বা কোনো কারণে ভিজে গেলে মসলিন কাপড় একটু বাতাসে শুকিয়ে নেওয়া ভালো। না হলে কাপড় কুঁচকে যাবে। পরে আয়রন করেও আর এই কুঁচকানো ভাব দূর করা যাবে না। আর পরিষ্কার করতে হলে ড্রাইওয়াশ করানোই উত্তম। সালোয়ার-কামিজ ও টপস  ভাঁজ না করে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে  আর শাড়ি রোলারে রোল করে পেঁচিয়ে রাখুন।


মন্তব্য