কুমিরের খোঁজে সুন্দরবন-332901 | A টু Z | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


কুমিরের খোঁজে সুন্দরবন

আল মারুফ রাসেল

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কুমিরের খোঁজে সুন্দরবন

 

এবারের পরিকল্পনা ছিল খানিকটা আলাদা। নোনা পানির কুমিরের খোঁজে যাব সুন্দরবন। এ জন্য নোনা কুমির নিয়ে খানিকটা পড়াশোনাও করে নিতে হলো। একসময় বাংলাদেশে তিন ধরনের কুমির পাওয়া যেত। মিঠা পানির কুমির তো দেশের প্রকৃতি থেকে বিলুপ্তই হয়ে গেছে। তবে ‘মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক’ থেকে কয়েকটি মিঠা পানির কুমির এনে ছাড়া হয়েছে বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারের পুকুরে। ঘড়িয়ালও মহা সংকটে। তাদের দিন কাটছে পদ্মা আর যমুনায়। ওদের সংখ্যাও কমছে আশঙ্কাজনকভাবে। আর বাকি রইল নোনা পানির কুমির। এককালে বাংলাদেশের দক্ষিণের সমুদ্ররেখার পুরোটা জুড়েই ছিল নোনা পানির কুমিরের আনাগোনা। এমনকি গত শতকের সত্তরের দশকেও কক্সবাজারের চকোরিয়ায়ও নোনা পানির কুমির দেখা যেত। এখনো কালেভদ্রে বাংলাদেশের উপকূলের অন্যান্য এলাকায় দু-একটি কুমির ধরা পড়ে, পত্রিকায় খবর হয়।

শীতকালে কুমির জল থেকে ডাঙায় উঠে রোদ পোহায়—এ তথ্যকে পুঁজি করেই কুমির দেখতে চলে এলাম সুন্দরবন। সুন্দরবনে ঘোরা ও কাজ করার আগের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে কুমির দেখার সুযোগ বেশি। তাই কটকা-কচিখালীর মতো পর্যটনবান্ধব জায়গা ছেড়ে চাঁদপাই এলাকায়ই দিন দশেক কাটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মংলা থেকে আমির হোসেন ভাইয়ের যন্ত্রচালিত নৌকাই হয়ে উঠল আমাদের থাকা-খাওয়ার একমাত্র ঠিকানা। সঙ্গে অবশ্য বন বিভাগেরও একখানা লঞ্চ পাওয়া গেল। এর আগেও আমির ভাইয়ের নৌকায় অবস্থান করে সুন্দরবনে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমাদের। ডলফিন জরিপ, বাঘ জরিপসহ নানা ধরনের কাজে অংশ নিয়ে কালু ভাইও রীতিমতো ওয়াইল্ড লাইফের নানা বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

চাঁদপাই রেঞ্জের জোংরা টহল ফাঁড়ির এলাকায় কুমিরের আনাগোনা রয়েছে—এ তথ্য পাওয়া গেল স্থানীয়দেরই কাছে। সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমে জোংরা টহল ফাঁড়ির আশপাশের খাল আর নদীগুলো ঘুরে দেখব। ফল পাওয়া গেল দুপুরের ভাটার সময়ই। ভাটায় বেরিয়ে আসা কাদার মধ্যে গোল গোল পাতার মতো আগাছায় শুয়ে আছে বিরাট এক কুমির। টহল ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা তরুণ অফিসার মোবারক হোসেন জানালেন, এই পাতাগুলোর নাম ‘চরকাদা শাক’। চিংড়ি দিয়ে রাঁধলে নাকি সেই রকম হয় খেতে! এরপর আরো দুদিন কাটানো হলো জোংরার জঙ্গলের খালে-নদীতে। খালগুলোর নামগুলোও চমত্কার-পাখিমারার খাল, বড় বস্তার খাল, সাহেব-বিবির খাল, মরা পশুর খাল, কলসভাঙা, ঝাপসি, ভদ্রা, ঢাংমারী, ঘাগরামারী, লাউডোব ইত্যাদি। সব খালে কুমির কমবেশি থাকলেও ভদ্রার খাল একটু বেশিই চমকে দিল। টলটলে তুঁতগোলা রঙের পানি, আর সেই সঙ্গে মাছের প্রাচুর্যের কল্যাণে এই খাল কুমিরের স্বর্গরাজ্য। বেশকিছু কুমিরের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল এই খালেই।

জোংরা টহল ফাঁড়ি ছেড়ে হাড়বেড়িয়া টহল ফাঁড়ি। বাঘের কারণে যেমন কুখ্যাত, ঠিক তেমনি এটি পর্যটকদের কাছেও প্রিয়। এবার হাড়বেড়িয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হলো ঘোরাঘুরি। বেড়ির খাল, ধানশীরচর, পুটিয়া, মরা বেড়ির খাল, নন্দবালা খাল, পুটিয়ার ভারানি খালগুলো ঘুরে বেড়ানো হলো কুমিরের খোঁজে। কুমির তো পাওয়া গেলই, সেই সঙ্গে বন বিভাগের লোকদের কাছ থেকে জানা গেল কুমির সম্পর্কে অনেক রকমের তথ্যও। যেমন—ভাটার সময় নদী আর খালের দুই পাড় জেগে ওঠে। যেহেতু নদী বা খালের পাড়গুলো ঢালু থাকে, তাই নিজের শরীরকে মাটিতে আটকে রাখতে কুমিররা কিছু তৃণজাতীয় উদ্ভিদ, যেমন : চরকাদার শাক, ধানশী, নলঘাস, হুদোঘাস, ঘাস ব্যবহার করে থাকে।

হাড়বেড়িয়া টহল ফাঁড়ি থেকে চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়িতে যেতে হলো পুটিয়ার ‘ভারানি খাল’ (দুটি খাল কিংবা নদীর সঙ্গে খালের সংযোজন করে যে খাল) হয়ে। আর এই ভারানিতেই দেখা মিলল অসম্ভব সুন্দর একজোড়া পাখির। বাংলা নাম ‘কালামুখ প্যারাপাখি’ আর ইংরেজিতে ‘মাস্কড ফিনফুট’। অরণ্যবাসী নিভৃতচারী এই পাখি দেখতে ভাগ্যের সহায় লাগে।

চরাপুটিয়ায় আরো কটি দিন কাটানো হলো। চরাপুটিয়ায় মানুষের আনাগোনা কম। তাই জঙ্গলটা বেশ নীরব। এখানে কিছুক্ষণ রাতের আকাশে তাকিয়ে থাকলে উল্কাপাত দেখা যায় প্রায়ই। পশুর নদী, ইন্দুরকানী খাল, খুন্তা-কুদালিয়া চর, নাকজোড়া খাল, আরমোলের খাল ঘুরে খানিকটা হতাশই হতে হলো। কুমিরের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। কেন নেই, তাও জানা গেল স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে। কাছের লোকালয় থেকে মাছ ধরতে আসে এরা। ওদের কাছ থেকে জানা গেল এসব খালে ইদানীং মাছের বড় আকাল। কিছুদিন আগে কজন জেলে ইচ্ছামতো বিষটোপ দিয়ে মাছ ধরেছে। অবস্থা বেগতিক বুঝে হয়তো কুমিরগুলোও অন্যত্র সটকে পড়েছে।

আরমোলের খাল হয়ে চলে এলাম হরিণটানা টহল ফাঁড়িতে। ঘোরা হলো শ্যালা, দুধমুখী নদী, আলকির খাল, কলামুলার খাল। সময়টা গোলপাতা কাটার মৌসুম, তাই খালে খালে ব্যস্ততা। আর কুমিরও লা-পাত্তা। তাই ফেরত আসতে হলো আন্ধারমানিক। চাঁদপাই বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হওয়ায় সেখানের খালগুলোতে মানুষের আনাগোনাও সীমিত। জয়মনি তো আর এখন অজপাড়াগাঁ নেই। রীতিমতো গঞ্জের রূপ নিয়েছে। তাই মানুষের সঙ্গ নিতে জয়মনিতে থেকেই ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করা হলো। আন্ধারমানিক, টেংরাখালী খাল, শূয়োরমারা খাল, শ্যালা নদী, নন্দবালা খাল ঘুরে এবারের মতো ক্ষ্যান্ত দিতে হলো কুমির দর্শনের। সবশেষে প্রশ্ন করতে পারেন কেমন দেখলাম সুন্দরবনের নোনা কুমিরগুলো? উত্তরে বলতে পারি, এখানে যত খালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রায় সব কটিতেই কুমিরের কম-বেশি দর্শন মিলেছে। সেগুলো আকারে ছিল দুই ফুট থেকে ১৬ ফুট পর্যন্ত।

ছবি: লেখক

 

কিভাবে যাবেন

খুলনার মংলা থেকে ট্রলার আর লঞ্চ ভাড়া করা যায় সহজেই। বোটের আকৃতি, যাত্রীসংখ্যা ধরে খরচ বাড়তে-কমতে পারে। চাইলে যেকোনো খালে এক দিনের সফরও দিয়ে আসতে পারেন। তবে মাথায় রাখবেন, ভাটা যদি না থাকে, তবে কুমিরের দেখা পাওয়ার আশা খুব কম।

মন্তব্য