kalerkantho

আপনার শিশু

শিশুদের জন্য গল্প পড়া

তানজির আহম্মদ তুষার

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক মনোবিজ্ঞা   

৪ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশুদের জন্য  গল্প পড়া

শিশুকে গল্পের বই পড়ে শোনালে তার ভাষা, ছন্দ, অক্ষরজ্ঞান ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। এ ছাড়া শিশুর কল্পক্ষমতা ও কৌতূহল বৃদ্ধি পায়। শিশুটির সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো যায়; অভিভাবক ও শিশু দুজনই আনন্দ অনুভব করতে পারে। এতে মা-বাবা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হয়। শুধু তাই নয়, শিশুটির মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময় বই পড়াকে কষ্টের মনে না করে আনন্দের মনে করে। জেনে নিই শিশুদের গল্পের বই পড়ে শোনানোর কিছু কথা ও কৌশল।

কোন সময়ে গল্প

ঘুমের আগে, পাঠের সময়, গোসলের সময়, বাসে, ট্রেনে বা গাড়িতে সব সময়ই গল্প পড়ে শোনানোর জন্য ভালো সময়। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে গল্প পড়ার অভ্যাস করতে পারেন। এতে শিশুটি গল্প শোনার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এ অভ্যাস পরবর্তী সময়ে তার ক্লাসের পড়ার ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে। গল্প পড়ে শোনানোর জন্য শান্ত পরিবেশ নির্ধারণ করুন। গল্পের প্রতি শিশুর প্রতিক্রিয়া কী সব সময় খেয়াল করুন। জোর করে গল্প শোনাতে যাবেন না। যখন দেখবেন সে আর গল্প শুনতে চাচ্ছে না তখনই থামিয়ে দিন। অন্য যেকোনো সময়ই তা শুরু করতে পারবেন। মনে রাখতে হবে শিশুদের কাছে গল্প খুবই প্রিয়, জোর করলে জিনিসটির প্রতি সে বিরক্ত হয়ে যেতে পারে।

টিভি বন্ধ রাখুন

গল্প বলার সময় টিভি, কম্পিউটার বা ট্যাব বন্ধ রাখুন, যাতে শিশু মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনতে পায়।

কিভাবে বসবেন

গল্প পড়ে শোনানোর সময়ে শিশুকে এমনভাবে কাছে নিয়ে বসুন যেন সে বই ও আপনার মুখ সহজেই দেখতে পারে। তবে বসাটি অবশ্যই শিশুর জন্য আরামদায়ক হতে হবে। প্রতিদিন একটি বিশেষ জায়গায় বা চেয়ারে বসে গল্প পড়ে শোনালে শিশুকে সহজেই গল্পের মধ্যে নিয়ে আসা যায়।

কিভাবে গল্প বাছাই করবেন

গল্পের মাধ্যমে শিশুদের সহজেই নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। যেমন-বাঘ ও রাখালের গল্পটি শিশুদের মিথ্যা না বলার জন্য উৎসাহিত করা হয়। এমন ধরনের গল্প বেছে নিন, যেটি শিশুর কাছে মজা লাগবে এবং সেখানে শিক্ষণীয় একটি বার্তা থাকবে। গল্পটি যদি আপনার মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির না হয় তাহলে তা থেকে সে বিপরীত ধরনের মূল্যবোধ পেতে পারে; তাই সতর্ক থাকুন। যদি এমন গল্প বলতেই হয় তবে তাকে বলে দিতে হবে যে এ বিষয়টি ওদের জন্য প্রযোজ্য, আমাদের জন্য নয়। বই পছন্দ করার সময় লক্ষ রাখতে হয় যেন বইটি রঙিন ও ছবিযুক্ত হয়। কিছু কিছু বই খুললে বিভিন্ন ছবি, পশুপাখির আকৃতি যেন বই থেকে উঠে আসে এবং বইটি নাড়ালে সেগুলোও নড়ে। এ ধরনের বই শিশুরা অনেক পছন্দ করে। বই পছন্দের ক্ষেত্রে শিশুকেও সঙ্গে নিন এবং তাকে পছন্দ করার সুযোগ দিন।

শিক্ষণীয় বার্তা

প্রতিটি গল্পের মধ্যে একটি শিক্ষণীয় বার্তা থাকে। অনেকে গল্প বলার সময়ে এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষণীয় বার্তাটি বারবার বলতে থাকেন যে শিশুটির কাছে মনে হয় মা বা বাবা তাকে গল্পটি বলতে চাননি, আসলে শুধু বার্তাটি দিতে চেয়েছেন। বার্তাটি তার কাছে অত্যাচারের মতো মনে হয়। ফলে শিশুটি বার্তাটি গ্রহণ তো করেই না বরং গল্পও শুনতে চায় না। তাই বার্তাটি গল্পের মধ্যেই এমনভাবে বলুন যেন শিশু তা গল্পের অংশই মনে করে।

সুর, ছড়া, ছন্দ ও দ্বিরুক্ত ব্যবহার করুন

শিশুরা সুর, ছন্দ ও ছড়া পছন্দ করে। তাই গল্পটির মধ্যে এগুলো নিয়ে আসুন। গল্পটি সুর ও ছন্দ দিয়ে মজার করে উপস্থাপন করুন। তারা বিভিন্ন জিনিসের দ্বিরুক্ত পছন্দ করে। তাই গল্প বলার সময় দ্বিরুক্ত ব্যবহার করুন। যেমন-'চাঁদ বুড়ি চাঁদ বুড়ি আমার বোনকে খুঁজে দাও না, দাও না,' অথবা সুর করে বলুন 'আয়রে আয় তু তু রঙা বঙা ভুতু' ইত্যাদি।

বই ধরা

আপনি যেভাবে বই ধরবেন বড় হয়ে সেও সেভাবেই বই ধরতে চাইবে। তাই কিভাবে বই ধরতে হয় তা শেখানোর জন্য আপনিও সুন্দর করে বই ধরুন।

গল্প পড়ায় অংশী করুন

গল্প পড়ে শোনানোর সময়ে মাঝেমধ্যে ছবি দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করুন। তবে জিজ্ঞাসাটা মোটেও শিক্ষকসুলভ নয়, বন্ধুসুলভ হতে হবে। যেমন 'চলো তো দেখি ছবিতে কী হচ্ছে! এটি কী? ওটা কী করছে?' এ ছাড়া বাক্য শেষ না করে এমনভাবে একটু বিরতি দিন, যাতে সে বাক্যটি শেষ করতে উৎসাহী হয়।

চরিত্র অনুযায়ী শব্দ করুন

গল্পের চরিত্র অনুযায়ী শব্দ করুন। কোনো পশুপাখির চরিত্র থাকলে তাদের মতো করে শব্দগুলো উচ্চারণ করুন। যেমন-'ছাগল বাঘকে বলছে ম্যা ম্যা, বাঘ মামা বাঘ মামা আমাকে খেয়ো না।' এতে শিশু খুবই আনন্দ পাবে এবং গল্পটি মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকবে।

একই গল্প কতবার

শিশুরা একই গল্প বারবার শুনতে পছন্দ করে। মজার ব্যাপার হলো প্রতিবারই একই রকম আগ্রহ নিয়ে তারা শুনতে পারে। এ কারণে একই গল্প শুনতে চাইতে পারে। বিরক্ত না হয়ে গল্পটি প্রথমবারের মতোই মজা করে বলুন।

 

 

মন্তব্য