kalerkantho

নাফাখুমে ক্যাম্পিং

আবদুল মোমেন রহিত   

৪ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নাফাখুমে ক্যাম্পিং

ছবি : সাইফ

ক্যাম্পিং করার ইচ্ছা অনেক দিনের। বান্দরবানের নাফাখুম ঝরনা দেখার সঙ্গে যদি ক্যাম্পিংটাও জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে কেমন হয়? কিন্তু আমাদের দেশে মোটরবাইকারদের জন্য ক্যাম্পিংয়ের ধারণাটা সম্পূর্ণ নতুন এক বিষয়। তাই বলে কি হবে না? শুরু করলাম অভিজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা।

সাগর ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া গেল তাঁবু খাটানো থেকে শুরু করে রান্না করার দিকনির্দেশনা। মন থেকে ১০ টনের বোঝাটা যেন নেমে গেল এক নিমেষেই। সাহস পেলাম। নাশতার জন্য স্যুপ-নুডলস থেকে শুরু করে রাতের খাবারের জন্য রেডিমেড খিচুড়ি, টর্চ, মগ, জরুরি ওষুধ, খাবার স্যালাইন, বেডশিটের মতো খুঁটিনাটি কোনো কিছুই বাদ গেল না আমাদের চেকলিস্ট থেকে।

এরপর এলো গাইড ইস্যু। নিজাম ভাইয়ের বদৌলতে পাওয়া গেল গাইড আবুলের নম্বর। সব কিছু ঠিকঠাক। এখন শুধু যাওয়ার দিন গুনছি। দিন যেন আর কাটতেই চায় না। ঠিক চার-পাঁচ দিন আগে কে যেন, সম্ভবত অপু বায়না ধরল ক্যাম্পিংয়ে বারবিকিউ পর্বটিও যোগ করার জন্য। এই না হলে বাঙালি! কিন্তু টেনশন কিসের! সাইফ ভাই আছেন না? সাইফ ভাই শুধু আমাদের সঙ্গে যাবেন বলে ওনার থাইল্যান্ডের ট্যুর পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছেন। উনি আবার খাবারদাবারের ব্যাপারে বেশ রসিক। রীতিমতো গবেষক টাইপের। বারবিকিউর কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই উনি দায়িত্ব নিয়ে নিলেন সানন্দে। এই সস, সেই সস, মসলা, স্টিক মুহূর্তেই জোগাড় করে ফেললেন।

দেখতে দেখতে আমরা ১৪ জনের একটা দল হয়ে গেলাম, তিনজন পিলিওন (যারা বাইকের পেছনে বসে) আর ১১ জন রাইডার।

২৫ মার্চ, বুধবার

সবার সুবিধামতো দল ভাগ করে নেওয়া হলো। যারা সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে রওনা করতে পারবে তারা হলো 'টিম ফ্যালকন'। আর যারা দুপুরে রওনা করতে পারবে তারা 'টিম র‌্যাভেন'। পূর্বপরিকল্পনা মতো সকাল ৮টায় টিম ফ্যালকন ঢাকা ছেড়ে সাড়ে ১০ মিনিটে কুমিল্লার নিমসার এসে আমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আমি যোগ দিই ১১টায়। চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার থেকে ফ্যালকনে যোগ দেন মঞ্জুর রনি। এদিকে দুপুরের রোদে হাইওয়েতে সবারই গলা-বুক শুকিয়ে একেবারে কাহিল অবস্থা। হালকা নাশতা ও স্যালাইন পানি খেয়ে ১টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। প্রায় কোনো রকম বিরতি ছাড়াই বিকেল সাড়ে ৩টায় আমরা চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের 'হাণ্ডি'তে লাঞ্চ ব্রেক দিই। এখানকার হায়দরাবাদি বিরিয়ানিটা খুব টানে। খাওয়া শেষ করে বিকেল সাড়ে ৪টায় বান্দরবানের রাস্তা ধরলাম। দূরত্ব মাত্র ৭২ কিলোমিটার, তাই এবার শাহ আমানত ব্রিজে ছোট্ট একটা ফটোশুটের বিরতি নিলাম। এই ফাঁকে খোঁজ নেওয়া হলো টিম র‌্যাভেনের। ওরা ততক্ষণে কুমিল্লা ক্রস করে ফেলেছে। এরই মধ্যে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। ৮টায় শহরে ঢুকে প্রথমেই সারলাম মোটরবাইকের টুকটাক কাজ-নাট-বোল্ট টাইট, মবিল পরিবর্তন-এসব আর কি। এরপর ডিনারের জন্য সোজা তাজিংডং হোটেলে। রাতযাপনের জন্য ১০টার মধ্যেই চেকইন করলাম রিভারভিউ হোটেলে। এখন শুধু অপেক্ষা টিম র‌্যাভেনের জন্য।

সবাই মিলে যখন পরের দিনের প্ল্যান নিয়ে কথা বলছি ঠিক তখনই এলো দুঃসংবাদটা। ঝড়বৃষ্টির জন্য দেরি হওয়ায় ওরা চট্টগ্রামেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার

সকাল ৬টায় উঠে ট্যুরের সবচেয়ে কঠিন দিনটা শুরু করলাম। সকাল ৭টা পর্যন্ত থানচি বাসস্ট্যান্ডে টিটু ভাইয়ের জন্য যখন অপেক্ষা করছিলাম, তখন বাকি ১০টা মোটরবাইকের চাকার প্রেশার অ্যাডজাস্ট করা হলেও খামখেয়ালিবশত নিজেরটাই চেক করলাম না। জেলের কারণে চাকার নজল জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। নজলটা পরিবর্তন করে নিলেই হতো। নীলগিরিতে মাসুম ভাইয়ের সৌজন্যে সবার জন্য স্পেশাল জুম চালের খিচুড়ি আর ডিম ভুনার ব্যবস্থা করা ছিল। 'পিক ৬৯'-এ একটা মাত্র ফটোশুটের বিরতি দিয়ে সোয়া ৯টায় নীলগিরিতে চলে এলাম। জীবনে তৃতীয়বারের মতো ওখানকার অমৃত খিচুড়ির স্বাদ আবার নিলাম। সত্যিই অসাধারণ সেই স্বাদ। দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে দলকে এগোতে বললাম। কারণ ওখানে গিয়ে বাইকগুলো পার্কিং করা, বারবিকিউর জন্য মুরগি কেনাসহ অনেক কাজ ছিল। শুধু ওবায়দুল ভাই রয়ে গেলেন আমার জন্য।

বিলের ঝামেলা চুকিয়ে যখন আবার বাইক স্টার্ট করলাম, দেখলাম পুরে ৪৫ মিনিট পিছিয়ে আছি আমরা। এদিকে নীলগিরির পর থেকেই রাস্তা বেশ বিপৎসংকুল। কোথাও হঠাৎ করে রাস্তা মোচড়াতে মোচড়াতে নিচে নেমে গেছে তো আবার কোথাও প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে ওপরে উঠে গেছে। মানে একটুও সোজা রাস্তা নেই। এর ওপর আবার রাস্তার প্রতিটি বাঁকে নুড়ি-পাথর তো আছেই। থানচি যখন ঠিক ১০-১২ কিলোমিটার দূরে হঠাৎ একটা বাঁকে অবিশ্বাস্যভাবে স্কিড করলাম প্রায় ৩০-৪০ ফুট। আসলে দুজনের কেউই বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী হয়েছে। উঠে গিয়ে দেখলাম খুব সামান্য কিছু নুড়ি-পাথর, যা খালি চোখে দেখাই যায় না, চিকন লাইনের মতো রাস্তার মাঝ বরাবর বিছিয়ে আছে। এদিকে আমার বাইকের চাকার প্রেশারও ছিল বেশি। আল্লাহর রহমতে কিভাবে বাঁচলাম নিজেও বলতে পারি না। শরীরের কোথাও কোনো আঁচড় লাগেনি, বাইকেও কোনো আঁচড় লাগেনি, শুধু বাঁ হাতের কবজিটা একটু মচকে বিশ্রী রকম ফুলে যায়। ব্যথার তীব্রতা আর রোদের উত্তাপ মিলিয়ে মাথা চক্কর দিচ্ছিল। প্রতিটি মুহূর্ত তখন অমূল্য। কথা যখন দিয়েছি নাফাখুম যাব, তো যাবই। মাথায় খানিকটা পানি দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বাইকে উঠে বসলাম। কিন্তু ক্লাচই ঠিকভাবে ধরতে পারছিলাম না। এভাবেই কিছু কষ্টকর মুহূর্ত পার করে একসময় থানচি ঢুকলাম।

হাতের অবস্থা দেখে তো সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। সবাই বলল, ফ্র্যাকচার। সেসব কথায় কান না দিয়ে বাইক পার্কিং করেই বোটে চড়ে বসলাম। তখন বেলা ১টা। প্রকৃতির রূপ কি আর পুরনো হয়? অবাক বিস্ময়ে সাঙ্গু নদীর দুই পাড়ে শুধু তাকাচ্ছিলাম। পানি কম থাকায় অবশ্য অনেক জায়গায় নেমে হাঁটতে হয়েছিল। এভাবে বিকেল ৩টায় চলে এলাম 'রাজা পাথর' নামের এক জায়গায়। বিশাল বিশাল পাথর নদীজুড়ে বিছিয়ে আছে। এরই ফাঁক দিয়ে আমাদের নৌকা এগিয়ে যাচ্ছিল। কোথাও কোথাও তো নৌকা প্রায় আটকেই যাচ্ছিল। কিন্তু এখানকার মাঝিরা অত্যন্ত দক্ষ ও চৌকস। ঠিক পাহাড়ি গাড়ির চালকদের মতো। বোটের মধ্যেই কখনো বাঁ থেকে ডানে অথবা ডান থেকে বাঁয়ে ছিটকে পড়ছিলাম।

রেমাক্রি যখন আরো ৩০-৪০ মিনিটের পথ, গাইড আবুল কী যেন হিসাবনিকাশ করলেন। তারপর বাঁ পাশে এক পাহাড়ের ঢালে সবাইকে নামতে বললেন এবং ওখান থেকেই নাকি পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হবে। তাঁর মতে, যেহেতু সময় কম, এই পথে গেলে অন্তত ৩০-৪০ মিনিট আগেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারব। কিন্তু শরীর তো সায় দিচ্ছে না। বাইকার আমরা, এলাকার দোকানে কিছু কিনতে হলেও বাইক নিয়ে যাই! স্বভাবতই আমরা একটু অলস প্রকৃতির। জায়গায় জায়গায় থেমে থেমে দম নিতে হচ্ছিল। এভাবে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। একসময় পাহাড় ডিঙিয়ে ঝিরিপথ ধরলাম। এই জায়গাটা আরো অদ্ভুত! আরো সুন্দর। দুই পাশে পাহাড় রেখে সাঙ্গু এখানে কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলেছে। ডান পাশে পাহাড়ের গায়ে আবার লম্বা লম্বা গাছের সারি। যেকোনো সময় সন্ধ্যা নামবে নামবে করছে। সব মিলিয়ে প্রকৃতি একদম নীরব-নিস্তব্ধ। প্রকৃতিতে এতই বুঁদ হয়ে ছিলাম যে কবজির ব্যথা ভুলেই গেলাম।

অন্ধকার নামল। টর্চ ছাড়াই কিছুক্ষণ আধো জ্যোৎস্নার আলোতে হাঁটলাম। সোয়া ৭টায় প্রবল স্রোতের আওয়াজ কানে এসে বাজল। বুঝলাম চলে এসেছি। অ্যাক্সিডেন্টের ব্যথা, সারা দিনের ধকল, ট্র্যাকিংয়ের কষ্ট, দুপুরের খাবার না খাওয়ার কষ্ট-সব এক নিমেষেই ভুলে গেলাম নাফাখুমে এসে। এরপর তাঁবু টাঙিয়ে সবাই লেগে গেল রাতের খাবারের আয়োজনে। ভেবেছিলাম কিনাকি খাব! আয়োজনে দেখি এলাহি কাণ্ড! একদিকে চলল খিচুড়ি রান্না, অন্যদিকে স্যুপ-নুডলস। এর মধ্যে সাইফ ভাইও লেগে গেলেন বারবিকিউর আয়োজনে। কিসের জঙ্গল, মনে হলো কোনো ফাইভ স্টার হোটেলে চলে এসেছি! ভরপেট খেয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো তাঁবুতে ঘুমাতে গেলাম। কানে বাজতে লাগল নাফাখুমের ঘুমপাড়ানি গান!

 

 

মন্তব্য