kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মাংস খাওয়ার আগে ও পরে

মাংস কতটুকু খাবেন, কী করে রাঁধবেন আর ছোটখাটো অসুবিধা হলে কী করবেন—জানালেন পুষ্টিবিদ আশফি মোহাম্মদ

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মাংস খাওয়ার আগে ও পরে

রেড মিট বা লাল মাংস মানেই ক্ষতিকর নয়। এর আছে অনেক উপকারী দিকও।

মাংসের ক্ষতিকর অংশ মূলত চর্বি। খাওয়ার পর এ চর্বি বাসা বাঁধে রক্তে, বেড়ে যায় কোলেস্টেরল। পরিপূর্ণ সুফল পেতে চাইলে মাংস থেকে চর্বি বাদ দিতে হবে। একই সঙ্গে রান্নার সঠিক পদ্ধতিও জানতে হবে, যাতে রান্নার পরও মাংসের পুষ্টিমান বজায় থাকে। আসলে রেড মিট সম্পর্কে সতর্কবাণীর প্রায় পুরোটাই বয়স্কদের জন্য। যাদের বয়স ৩০-এর নিচে, রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রা ঠিক আছে, মেদাধিক্য নেই এবং ওজনও স্বাভাবিক, তাদের জন্য লাল মাংসে অসুবিধা নেই।

 

পুষ্টিমান

প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি গরুর মাংস শরীরের অন্যতম খনিজ উৎস হিসেবে কাজ করে। এতে রয়েছে জিংক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন ‘বি’ ইত্যাদি। এ সবই দেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। চর্বিহীন মাংস খাওয়ার বেশকিছু সুফল আছে। যেমন : টাইপ-টু ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে, হাড়ে বল দেয়, ওজন ঠিক রাখে, হার্ট-অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়, বোধশক্তি বাড়ায় ইত্যাদি। অথচ চর্বির কারণে মাংসের এসব উপকার ব্যাহত হয়।

 

চর্বি বাদ যাক

মাংসের প্রধান উপাদান প্রোটিন। প্রোটিন ছাড়াও এতে আছে চর্বি ও নানা রকমের ভিটামিন ও খনিজ লবণ। বেশি তাপে রান্না করলে এই প্রোটিন সংকুচিত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। সাধারণত ৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ধীরে ধীরে মাংস রান্না করা উচিত। ঢেকে রান্না করুন। এতে মাংসের পুষ্টিমান বজায় থাকে। বেশি তাপে মাংস রান্না করা উচিত নয়। এতে মাংসে থাকা ভিটামিন ‘বি’ নষ্ট হয়। পুরোপুরি সিদ্ধ হলে তবেই তা খেতে হবে। রান্না করা মাংস বারবার গরম করলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়। তাই একবারে বেশি রান্না না করে একবেলা বা বড়জোর দুই বেলা খাওয়ার মতো মাংস রান্না করুন। এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, সপ্তাহে ৩০০ গ্রামের ওপর মাংস খাওয়া উচিত নয়। যদিও ঈদের মধ্যে এই বাছবিচার করা সম্ভব হয় না। তবে রান্নার আগে মাংসের দৃশ্যমান চর্বি ফেলে দিন। এবং রান্নায় পরিমাণে কম তেল ব্যবহার করুন। মাংস থেকে চর্বি আলাদা করার বেশকিছু পদ্ধতি রয়েছে। সুবিধামতো যেকোনো একটি ব্যবহার করুন। আগুনে ঝলসে রান্না করলে মাংসের চর্বি কিছুটা কমে যায়। আবার মাংসকে হলুদ-লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে ফ্রিজে রাখুন। ঠাণ্ডা হলে কিছু চর্বি মাংস থেকে বেরিয়ে জমাট অবস্থায় থাকবে। তখন বাড়তি চর্বিটুকু বাদ দেওয়া সহজ হবে। কিংবা কাঁচা মাংস একটা ঝঝরিতে নিয়ে ফুটন্ত পানির পাত্রের মুখ বসিয়ে চুলায় দিন। এতে মাংসের চর্বি গলে নিচের পাত্রে পড়বে। তারপর স্বাভাবিক নিয়মে মাংস রান্না করুন। তবে রান্নার সময় খেয়াল রাখুন, অন্য উৎস থেকে যেন কোলেস্টেরল কম আসে। এ ক্ষেত্রে রান্নায় ঘি বা বাটার ব্যবহার না করে সয়াবিন কিংবা পাম অয়েল ব্যবহার করুন। আর অবশ্যই মাংসের সঙ্গে প্রচুর শাক-সবজি, ফলমুল খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।

 

বাড়তি ক্যালরি সামলাতে

ঈদে খাওয়া হয় বেশিই। বাড়তি ওজনের ঝামেলা এড়াতে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। শুধু হাঁটাহাঁটিও অনেক কাজে দেয়। দ্রুত হেঁটে ১৩ মিনিটে বা এর কম সময়ে এক মাইল দূরত্ব পার করলে মাইলপ্রতি ক্যালরি পোড়ানো হয় বেশি। কিন্তু যাঁরা ওজন কমানোর জন্য বা ক্যালরি পোড়াতে হাঁটা শুরু করতে চাইছেন, তাঁরা প্রথমদিকে গতি বাড়ানোর বদলে দূরত্বের দিকেই খেয়াল রেখে হাঁটুন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হলো ১৮০ পাউন্ড (৮০ কেজি) ওজনের একজন ব্যক্তি প্রতি মাইল হেঁটে ১০০ ক্যালরি পোড়াবেন।

 

সমাধান হাতের নাগালে

ঈদের মেন্যু বলে কথা। কাবাব, ভুনা-মাসালা কোরমা-কালিয়া কত যে পদ মাংসের। সঙ্গে পোলাও-কোরমা তো থাকছেই। ফলাফল গ্যাস, বদহজম, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা সমস্যা। সারা বছর না হলেও এ ঈদে অনেকেরই এসব সমস্যা হতে পারে। প্রয়োজনের বেশি শর্করা ও প্রোটিন গ্রহণ করা এবং সে অনুপাতে শাকসবজি না খাওয়াই এর প্রধান কারণ। সমস্যা এড়াতে সচেতন হোন আগেই। মাংস অবশ্যই খাবেন, সেই সঙ্গে সালাদ ও শাক-সবজির মেন্যু রাখুন। তার পরও সমস্যা হলে জেনে নিন কিছু সমাধান। এ ধরনের শারীরিক সমস্যার সমাধান ওষুধ নয়। ঘয়োয়া সমাধানই নিরাপদ।

 

পেট ফাঁপা বা গ্যাসট্রিক

♦          পেটে গ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ ঘরোয়া সমাধান হলো আদা খাওয়া। প্রতিবেলা মাংস খাওয়ার পর এক টুকরা আদা মুখে নিয়ে চিবিয়ে খান। পেটে গ্যাস জমবে না।

♦          কাঁচা আদা চিবিয়ে খেতে না পারলে আদার চা পান করুন। বড় এক টুকরা আদা ছেঁচে পানিতে ফুটিয়ে নিন। বেশকিছুক্ষণ জ্বাল হলে নামিয়ে নিন। কুসুম গরম থাকতে পান করুন। দিনে দুই বেলা পান করলে উপকার পাবেন।

♦         গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা হলেই ওষুধ খাবেন না। সহনীয় গরম পানিতে আধা কাপ লেবুর রস মিশিয়ে খান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যথা কমে যাবে।

♦          খাবারের ফাঁকে ফাঁকে পানি পানের অভ্যাস বাদ দিন। এতে খাবার ভালো হজম হয় না। আর গ্যাসে পেট ফেঁপে যায়। অস্থির লাগে। খাবারের আধা ঘণ্টা পরে পানি পান করুন। খুব প্রয়োজন হলে খাবারের মাঝে একঢোক পানি খেতে পারেন।

♦          পেট ফাঁপা সমস্যায় কাঁচা রসুন উপকারী। রসুন মলাশয়ে জীবাণু বৃদ্ধিকে বাধা দেয়। কয়েক কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খান। পেট ফাঁপা কমে যাবে।

 

বদহজম

♦          বদহজমের জন্য ১ কাপ পানিতে ১ টেবিল চামচ সাদা ভিনেগার ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে পান করুন। উপকার পাবেন।

♦          ১ টেবিল চামচ আদার রস, ১ টেবিল চামচ লেবুর রস ও ১ চিমটি লবণ ভালো করে মিশিয়ে খান। এতে পানি মেশাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে উপকার পাবেন। আদা কুচি লবণ দিয়ে চিবিয়ে খেলেও উপশম হবে সমস্যার।

♦          ২ কাপ পানিতে এক টুকরা আদা কুচি দিয়ে জ্বাল দিয়ে ১ কাপ পরিমাণ করে এতে সামান্য মধু মিশিয়ে আদা চা তৈরি করে পান করুন। হজমের গণ্ডগোল হবে না।

♦          বদহজমে আরাম পেতে ২ কাপ পানিতে ১ টেবিল চামচ দারুচিনি গুঁড়া দিয়ে জ্বাল দিন। পানি কমে অর্ধেক হলে নামিয়ে রাখুন। মধু মিশিয়ে গরম গরম পান করুন। দিনে দুবার পান করুন।

♦          বেকিং সোডা বদহজমের সমস্যা দূর করতে খুবই কার্যকর। আধা গ্লাস পানিতে আধা চা চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে পান করুন। বদহজমের সমস্যা দূর হবে।

♦          কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে পান করলে বেশ উপকার পাবেন।

 

কোষ্ঠকাঠিন্য

♦          কোষ্ঠকাঠিন্যে আশ জাতীয় খাবারের জুড়ি নেই। মাংসের পাশাপাশি কাঁচা সালাদ ও সবজি খাবেন। প্রতি বেলায় ১ বাটি পরিমাণ সালাদ বা সবজি খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রেহাই মিলবে।

♦          বেশি পরিমাণ আমিষ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতেই পারে। রাতে ঘুমানোর আগে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে ইসবগুল খাবেন। ১ গ্লাস পানিতে ১ টেবিল চামচ ইসবগুল মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পান করুন। মনে রাখুন, ভিজিয়ে রাখলে ইসবগুলের উপকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

♦          বড় একটি সাদা এলাচ ১ কাপ গরম দুধে ভিজিয়ে রাখুন সারা রাত। সকালে এলাচটি থেঁতো করে দুধসহ খেয়ে  নিন। খুব বেশি সমস্যা হলে দিনে দুবার এভাবে খাবেন।

♦         কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় এলোভেরা জেল বেশ কার্যকর। কাঁটা চামচ দিয়ে একটা এলোভেরা পাতার শাস বের করুন। ১ গ্লাস পানির সঙ্গে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে পান করুন। উপকার পাবেন।

 

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজন

 

ক্যালরি ২০০০-৩০০০, প্রোটিন ১০-৩৫ শতাংশ, কার্বোহাইড্রেট ৪৫-৬৫ শতাংশ, ফ্যাট ২০-৩৫ শতাংশ। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচারের এক তথ্যমতে, রান্না করা প্রতি ১০০ গ্রাম গরু ও ছাগলের মাংসে ক্যালরি পাওয়া যায় যথাক্রমে ১৭৯ ও ১২২।

এতে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে—

 

উপাদান                         গরু       ছাগল

প্রোটিন (গ্রাম)                      ২৫       ২৩

চর্বি (গ্রাম)                           ৭.৯      ২.৬

সেচুরেটেড ফ্যাট (গ্রাম)          ৩.০      ০.৭৯

আয়রন (মিলি গ্রাম)               ২.৯         ৩.২

কোলেস্টেরল (মিলি গ্রাম)         ৭৩.১   ৬৩.৮


মন্তব্য