kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নারী ক্রিকেট মানে তো সালমাই

মাসুদ পারভেজ

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নারী ক্রিকেট মানে তো সালমাই

কেরানীগঞ্জ থেকে নদী পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে ক্রিকেট খেলতে আসার ঝক্কি থেকে তবু একসময় মুক্তি মিলেছিল মোহাম্মদ রফিকের। কারণ বুড়িগঙ্গা সেতু!

কিন্তু খুলনার ভৈরব নদীর ওপর তো আর সেতু নেই।

অদূর ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যায় না। তাই সেই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ক্রিকেটের রাজপথে উঠে আসা এক ক্রিকেটারকে আজও বাড়ি ফিরতে হয় ট্রলারে চেপে। নদীর ঘাটে নেমে ভ্যানে করে আরো কিছুটা দূরে গেলে তবেই না মিল্কি দুয়ারা গ্রাম। সেই দূর গ্রামেও তাঁর ঠিকানা খুঁজে পেতে সমস্যা হয় না কারোরই। নদীর ঘাটে নেমে শুধু বললেই হয় যে, ‘সালমার বাড়ি যাব’।

সেই ২০০৭ সালে প্রথমবার জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অনুশীলন শিবিরে যোগ দেওয়ার পর থেকে গত প্রায় এক দশকে সালমা খাতুন এমন এক চেনা চরিত্র হয়ে উঠেছেন যে শুধু নিজের এলাকায় নন, দেশ ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর পরিচিতি। এমনই যে বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে তাঁর নামটিও তো উচ্চারিত হতে শোনা গেছে। যাঁকে ‘মেয়েদের সাকিব’ বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না কিছুই। সাকিবের মতোই অলরাউন্ডার, ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি কার্যকর অফস্পিনেও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে জানেন। দুই ভূমিকাতেই সাফল্য সাকিবের মতো তাঁকেও তুলে নিয়েছিল র্যাঙ্কিংয়ের চূড়ায়। র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হওয়া প্রথম বাংলাদেশি যেমন সাকিব, তেমনি সালমাও তো। তবে টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের সেরা অলরাউন্ডারই শুধু নন, হয়েছিলেন সেরা বোলারও। কিছুদিন আগে র্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে নেমে যাওয়াটা যে তাঁকে খুব পোড়াচ্ছে, সেটি দিব্যি অনুমান করে নেওয়া যাচ্ছে এই কথায়, ‘টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে নেমে গেছি। এর মূল কারণই হলো গত কিছুদিন ধরে কোনো খেলাই নেই আমাদের। ’

সামনেই অবশ্য খেলা আছে। পুরুষ দলের পাশাপাশি ভারতে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলও। সেখানেও যে ভালো কিছুর জন্য অলরাউন্ডার সালমার দিকে চেয়ে থাকবে দল, তা না বললেও চলছে। ব্যাটে-বলে দলের সাফল্যে অবদান রেখে সালমারও র্যাঙ্কিং শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পাওয়ার বিশ্বাসে কোনো কমতি নেই, ‘খেলা নেই বলেই নেমে গেছি। আশা করছি খেলা হলে আবার র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর জায়গাটা ফেরত পাব। ’ এখন আর টি-টোয়েন্টি অধিনায়কও নন বলে নিজের খেলায় মনোযোগও আগের চেয়ে বেশি দিতে পারার কথা। বেশ কিছুদিন আগেই তাঁকে সরিয়ে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে নারী দলের অধিনায়ক করা হয়েছে জাহানারা আলমকে। সদলবলে পারফর্ম করে নতুন অধিনায়ককেও প্রাপ্তিতে ভরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা বললেন সালমা, ‘আমার নেতৃত্বে গতবারের ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে (২০১৪ সালে যেটি হয়েছিল বাংলাদেশেই) দুটি ম্যাচ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার নতুন অধিনায়ককে আমরা এর চেয়েও ভালো কিছু দেওয়ার চেষ্টা করব। ’ এখনো ওয়ানডে অধিনায়ক সালমার কাছ থেকেও বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট কম কিছু পায়নি। সাকিব যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কয়েক ধাপ ওপরে নিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি সালমাও।

২০০৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে প্রথম সিরিজেই হংকংকে উড়িয়ে দেওয়া বাংলাদেশ সালমা অধিনায়ক থাকাকালেই পায় ওয়ানডে স্ট্যাটাস। ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় দিয়েই তাঁর নেতৃত্বে ওয়ানডে ক্রিকেটে পথ চলার শুরু বাংলাদেশের। পরপর দুটি এশিয়ান গেমসেও রুপাজয়ী দলের অধিনায়ক সালমাই খেলেছেন বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস দুটো (৭৫* ও ৪৯)। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটের ‘মুখ’ই যেন হয়ে উঠেছেন সালমা। এ দেশে নারীর শিক্ষায়নে যেমন বেগম রোকেয়া, তেমনি সালমাও নারীর ক্রিকেটায়নের পেছনে। ‘ক্রিকেট খেলার কারণে আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছি’—এমন সরল স্বীকারোক্তি দেওয়া সালমা বিস্ময়ে বিমূঢ় হওয়ার মতো কিছু ঘটনা দেখেছেন নিজ চোখেও, “ক্রিকেট বোর্ড একবার নতুন মেয়ে ক্রিকেটার খুঁজে বের করার জন্য একটি ট্রায়ালের ব্যবস্থা করেছিল। স্লোগানটিও এ রকম ছিল যে ‘কে হতে চাও সালমা?’ ওই ট্রায়াল দিতে যে এত মেয়ে চলে আসবে আমি কল্পনাও করিনি। হাজারখানেকের বেশি মেয়ে ট্রায়াল দিতে ও আমাকে দেখতে এসেছিল মিরপুরের একাডেমি মাঠে। ”

এরপর নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না যে দূর গ্রাম থেকে উঠে আসা সালমা নারীদের ক্রিকেটে কতটা অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে উঠেছেন।


মন্তব্য