বাঘবন্দি খেলায় বোলাররা-331856 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


বাঘবন্দি খেলায় বোলাররা

সাইদুর রহমান শামীম

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাঘবন্দি খেলায় বোলাররা

স্বপ্ন-বিলাসী ক্রিকেটভক্তের স্বপ্নের অলিন্দে ঘোরাফেরা করে সুদূর অতীতের সঙ্গে নিকট অতীত কিংবা বর্তমানকে একই ফ্রেমে বন্দি করার আকাঙ্ক্ষা। অসম্ভব জেনেও সময়ের রথে চড়ে ‘ব্যাটিং ঈশ্বর’ স্যার ডনের সঙ্গে স্যার ভিভ রিচার্ডস, শচীন অথবা ব্রায়ান লারার ‘বাইশ-গজি’ যুগলবন্দির কল্পিত দৃশ্য শিহরণ জাগায় লক্ষ-কোটি জনতার। ‘ডাব্লিউ-কোয়ার্টেড’ ওয়াসিম, ওয়াকার, ওয়ালশ—ওয়ার্ন কিংবা গার্নার, অ্যামব্রোস, কাদির, ম্যাকগ্রার মতো কালজয়ী বোলারদের টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা, এমনই একটি রঙিন কল্পনা। ক্রিকেটের সর্বাধুনিক ফরম্যাটে খেলা হয়নি এই লিজেন্ডদের। টেস্ট ওডিআই মিলিয়ে ৯১৬ উইকেট পাওয়া ওয়াসিম আকরাম, ৯৪৪ উইকেট শিকারি গ্লেন ম্যাকগ্রা কিংবা ৭৩৬ উইকেটের কোর্টনি ওয়ালশের টি-টোয়েন্টির পারফরম্যান্স কেমন হতো, এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা চলছে অবিরাম। নিঃসন্দেহে কঠিন হতো গার্নার, ওয়াসিম, ওয়াকারদের টি-টোয়েন্টি অভিযান। কেন কঠিন, তার উত্তর আছে পরিসংখ্যানে। টেস্ট এবং ওডিআই মিলিয়ে দুই ফরম্যাটে হাজার উইকেট শিকারি শেন ওয়ার্ন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলেননি, তবে আইপিএলের ৫৫ ম্যাচে ৫৭ উইকেট বলে দেয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বোলার ওয়ার্নকে দুহাত ভরে সাফল্য দেয়নি। দুই ফরম্যাটে শ্রীলঙ্কার হয়ে ১৩৩৪ উইকেট পাওয়া মুত্তিয়া মুরালিধরনের পারফরম্যান্স আরো ফ্যাকাশে, দেশের হয়ে ১২ ম্যাচে মাত্র ১৩ উইকেট! বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি চিরাচরিত ফর্মুলায় টি-টোয়েন্টিতে বোলারদের সাফল্য অতটা সহজলভ্য নয়। চটজলদির এই ক্রিকেটে স্পেশালিস্ট বোলারদের চেয়ে কখনো সখনো অকেশনালরাই বাজি মেরে দেন। কে ভেবেছিল ২০০৭-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম আসরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফাইনালে মিডিয়াম পেসার যোগিন্দার শর্মার শেষ ওভারের বোলিং ভারতকে জেতাবে বিশ্বসেরার খেতাব! অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে খোদ আইসিসি ফিবছর নানান আইনের মারপ্যাঁচে সীমিত ওভারের ম্যাচকে ব্যাটসম্যানদের খেলা বানিয়ে ছেড়েছে। ওয়াইড, নো-বল, বাউন্সারের কড়াকড়ি, পাওয়ার-প্লে, ফিল্ডিং রেসট্রিকশন, ফ্রি হিটের সৌজন্যে ওডিআই কিংবা টি-টোয়েন্টি এখন নিছকই চার-ছক্কার বেসাতি, ব্যাটসম্যানদের বীরগাথা। একপেশে প্রদর্শনীতে বোলাররা নিছকই দুয়োরানির ছেলে। বাণিজ্যের শেকলে বন্দি ওডিআই কিংবা টি-টোয়েন্টির আসরে তাই বোল্ড কিংবা দুর্দান্ত ক্যাচের চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয় চার-ছক্কার ফুলঝুরি।

বলা হতো টেস্ট ক্রিকেটে জয়ের নায়ক বোলার, ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যান। ক্রিকেটের নতুন সংস্করণ আবিষ্কারের পর গেইল, ম্যাককালাম, ডি ভিলিয়ার্স কিংবা পোলার্ডের মতো ‘উইলো-মনস্টার’রা টি-টোয়েন্টির নায়ক। মেলবোর্ন, ডারবান, ইডেন গার্ডেন্স কিংবা ঢাকার মিরপুর, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ভিন্ন এই ভেন্যুগুলোর উইকেটের চরিত্র অভিন্ন, বোলারদের বধ্যভূমি, ব্যাটিংয়ের স্বর্গ। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে বোলারদের রক্ষাকবচ, প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়া, গতির হেরফের কিংবা বৈচিত্র্যে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করা। এমন সব্যসাচী বোলার চাই যিনি একই সঙ্গে দুরন্ত গতি কিংবা স্লোয়ার ডেলিভারি দিতে পারেন। আবার ইয়র্কার আর টো-ক্র্যাশারে ব্যাটম্যানের স্টাম্প কিংবা গোড়ালি উপড়ে ফেলতেও পারদর্শী। কখনো কখনো স্লোয়ার ফুলটস দিয়ে ব্যাটসম্যানদের বোকা বানানোর দক্ষতাও প্রশংসিত ‘ইন্সস্ট্যান্ট-নুডলস’ মার্কা এই ক্রিকেট রঙ্গে! এ যুগের ক্রিকেটের জন্য সুখবর টি-টোয়েন্টিতে বোলারদের সাফল্যের জন্য চলছে নিত্যনতুন গবেষণা। সেই উদ্ভাবনী কর্মে জড়িয়ে ওয়াসিম আকরাম, ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রা, কুম্বলের মতো লিজেন্ডরা। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ওভারের প্রথম আর শেষ ডেলিভারিতেই বোলারদের ওপর চড়াও হয় ব্যাটসম্যান। সেই প্রবণতা সামাল দিতে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা। ওয়াসিম আকরামের আফসোস, এই ফরম্যাটে রিভার্স সুইং হতে পারত মোক্ষম জবাব। কিন্তু রিভার্স সুইংয়ের অন্যতম শর্ত আইনসিদ্ধভাবে বলের আউটার সারফেস তৈরিতে ফিল্ডাররা অতটা মনোযোগী নয় এখনো। ২০০৭-এর ওয়ানডে বিশ্বকাপে সাউথ আফ্রিকান পেসার শন পোলকের উদ্ভাবিত স্লোয়ার বাউন্সারের পরিমার্জিত রূপ ইদানীং দেখা যাচ্ছে টি-টোয়েন্টির মাঠে। ঢাকায় ২০১৪-র বিশ্বকাপে ভারত-শ্রীলঙ্কার ফাইনালে শ্রীলঙ্কার মালিঙ্গা, কুলাসেকারা, ম্যাথুজ ডেথ ওভারে অফস্টাম্পের বাইরে ক্রমাগত ইয়র্কার ডেলিভারি দিয়ে সামলেছেন ভারতের বিশ্বখ্যাত ব্যাটিং ডিপার্টমেন্টের আগ্রাসী থাবা। ৬ উইকেট হাতে রেখে ভারত ইনিংসের শেষ পাঁচ ওভারে যোগ করেছিল মাত্র ৩৫, লঙ্কানদের সেই স্ট্র্যাটেজি সাফল্য পায় দুই ওভার হাতে রেখে ৬ উইকেটের সহজ জয়ে। পাঁচজনের বেশি ফিল্ডার লেগ সাইডে নয়, ইনিংসের প্রথম ৬ ওভারের পাওয়ার-প্লেতে ৩০ গজি সার্কেলের বাইরে সর্বাধিক দুই ফিল্ডার কিংবা ৭৫ মিনিট সময়সীমার মধ্যে ২০তম ওভার শুরু করার বাধ্যবাধকতা বলে দেয় নির্দিষ্ট সময়ে ইনিংস শেষ না করলে জরিমানা হিসেবে প্রতিপক্ষের অ্যাকাউন্টে রান যোগ হওয়ার দায়ও নিতে হয় বোলারকে। সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিখুঁত, নিয়ন্ত্রিত, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বোলিংই সাফল্যের শেষ কথা। টি-টোয়েন্টির বোলার মানেই বাংলা সাহিত্যের পরিচিত চরিত্র ‘হরফুন মাওলা’। এখানেই নয় শেষ। ফিল্ডিং সাইডকে তিন রকম পরিবর্তনশীল কৌশল নিয়ে নামতে হয় মাঠে। প্রথম ৬ ওভারের পাওয়ার-প্লেতে প্রতিপক্ষের একটি-দুটি উইকেট শিকার, পরের ১০ ওভারে রান নিয়ন্ত্রণ আর শেষ পাঁচের ‘ডেথ ওভারে’ আক্রমণ ও রান নিয়ন্ত্রণের সেরা পসরা নিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং ডিপার্টমেন্টকে বশ করার দুরূহ দায়িত্ব শুধুই বোলারদের। তার পরও লাসিথ মালিঙ্গার টো-ক্র্যাশিং ইয়র্কার, নারিন, সাঈদ আজমলের দুসরা, ক্যারম বল, শহীদ আফ্রিদির দুরন্ত গতির স্ট্রেইটার টি-টোয়েন্টি বোলিংয়ের সেরা বিজ্ঞাপন। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বোলিংয়ে যা কিছু সাফল্য তার সামনের সারির নায়ক লাসিথ মালিঙ্গা, উমর গুল, মিচেল স্টার্ক, সুনীল নারিন, শহীদ আফ্রিদি কিংবা সাইদ আজমল, যাঁদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং, বৈচিত্র্যময় ডেলিভারির পাশাপাশি আছে প্রথাবিরোধী অ্যাকশন। অনেক সময় বোলিং অ্যাকশন আইসিসির আইনের সীমারেখা লঙ্ঘন করে বলে সুনীল নারিন, সাঈদ আজমলরা নিষিদ্ধ হন ক্রিকেট আঙিনায়। পাকিস্তানি কাপ্তান শহীদ আফ্রিদি লেগস্পিনার। তবে তাঁর বোলিংয়ের মূল অস্ত্র স্পিন নয়, গতির হেরফেরে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা। এই ফর্মুলার প্রয়োগেই তিনি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বাধিক উইকেট শিকারি। টি-টোয়েন্টির রঙ্গমঞ্চে বোলাররা উপমহাদেশে লুপ্তপ্রায় লোকজ ক্রীড়া বাঘবন্দি খেলার সেই শিকারি বাঘ, যাদের পেটের প্রয়োজনে শিকার করতে হয়। কিন্তু খেলার আকর্ষণ বাড়াতে আয়োজকরা আইনের মারপ্যাঁচে শিকারি বাঘকে প্রায় খাঁচাবন্দি করে ছেড়ে দেন শিকারে। কঠিন নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থেকেই বাঘকে জীবনের প্রয়োজন মেটাতে হয়।

চ্যানেল আইয়ের স্পোর্টস ইনচার্জ ও ক্রিকেট বিশ্লেষক

মন্তব্য