kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উদ্ভাবনী কীর্তিতে ‘বুনো’ ব্যাটিং

আরিফুর রহমান বাবু

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উদ্ভাবনী কীর্তিতে ‘বুনো’ ব্যাটিং

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টায়। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় বিশ্ব।

কালের চক্রে পাল্টেছে ক্রিকেটও। নামটা ঠিকই আছে। তবে গতি-প্রকৃতি ও ধরনে এসেছে ভিন্নতা।

একসময় ক্রিকেট ছিল ‘রাজার খেলা’, ‘ভদ্রলোকের খেলা’  (জেন্টলম্যান গেম)। তাই বলে ক্রিকেট যে তার চিরায়ত সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য হারিয়ে রাজার বদলে ‘প্রজার’ খেলা হয়নি। কিংবা ভদ্রলোকের বদলে ‘অভদ্রের খেলা’র তকমাও লাগেনি। তবে এটা সত্য, ক্রিকেট এখন আর শুধু খেলা নয়। উইলো-চেরির লড়াইয়ে ঢুকে গেছে বিনোদন। বিপণন। বাণিজ্যও। বলার অপেক্ষা রাখে না, এগুলো হচ্ছে ক্রিকেটের সামগ্রিক পরিবর্তন। ‘পরিবর্তন’ বা ‘বিবর্তন’ যাই বলা হোক না কেন, মাঠের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় রদবদলের জায়গা হচ্ছে ব্যাটিং।

এই পরিবর্তনের হাওয়ার উৎস হচ্ছে ‘টি-টোয়েন্টি’ ফরম্যাট। এ ছোট্ট পরিসর রাতারাতি পাল্টে দিয়েছে ব্যাটিংয়ের চিরায়ত ধারার। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের ব্যাটিং ক্রিকেটের বাটিংয়ের চিরায়ত ধারায় এনেছে বড় ধরনের ‘বিপ্লব’। ব্যাটিং এখন আর শুধু ব্যাকরণ, শিল্প ও নান্দনিকতার মিশেল নয়। তার বদলে অনেক বেশি ‘উদ্ভাবনী’ শক্তিনির্ভর। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রয়োজন মেটাতেই ব্যাকরণ মেনে নান্দনিক ও শৈল্পিকতার মিশেলে ব্যাট চালনার বদলে এখন অনেক বেশি পেশিশক্তির ব্যাটিংয়ের দেখা মিলছে। যার পরতে পরতে পাওয়ার ও পিঞ্চ হিটিং। প্রথাগত স্ট্রোক প্লের বদলে মনগড়া উদ্ভাবনী ব্যাটিং। একসময় গ্রেগ চ্যাপেল, ডেভিড গাওয়ার ও গাভাস্কারের নয়নজুড়ানো কভার ড্রাইভ, ভিভ রিচার্ডসের বেপরোয়া স্কোয়ার কাট পুল-হুক দেখে রোমাঞ্চ জাগত মনে। কারো ব্যাট থেকে কপিবুক শট দেখে পুলকিত হতেন দর্শক-অনুরাগীরা। আর বর্তমান প্রজন্ম এবি ডি ভিলিয়ার্স, ক্রিস গেইল, ওয়ার্নার ও ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের ব্যাকরণের বাইরে পাওয়ার হিটিং ও উদ্ভাবনী ব্যাটিং দেখেই বেশি মজা পায়। উত্ফুল্ল হয়। আগেই বলা হয়েছে, সময়ের দাবি ও প্রয়োজন মেটাতেই এখনকার ব্যাটসম্যানরা অমন পেশিশক্তির মনগড়া ও উদ্ভাবনী ব্যাটিংয়ে মনোযোগী হয়েছেন।

তাদের পরিষ্কার উপলব্ধি, খেলাটা মাত্র ১২০ বলের; এখানে ব্যাকরণ মেনে বলের মেধা ও গুণ বিচার করে খেললে রানের গতি বাড়ানো কঠিন। এ সত্য উপলব্ধি করেই বোলার ও ফিল্ডারের নাগালের বাইরে বলকে সীমানার ওপারে পাঠাতে ডি ভিলিয়ার্স, ওয়ার্নার, ম্যাক্সওয়েল ও ম্যাককালামরা ক্রিকেট ব্যাকরণের ড্রাইভ, কাট, ফ্লিক, গ্ল্যান্স, পুল ও হুকের পাশাপাশি স্কুপ, রিভার্স সুইপ, রিভার্স ফ্লিক ও স্লগ সুইপ হাঁকাচ্ছেন । তাতে সাফল্যও মিলছে। বোলাররা ঠিক কোন লাইন ও লেন্থে বল ফেলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। খেই হারিয়ে ফেলছেন। আসল সত্য হলো, মানুষ যখনই কোনো কিছুর অভাব অনুভব করেছে, তখনই তাদের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের অনুভব ও উপলব্ধি এসেছে। ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রচলনের পর থেকে ধীরে ধীরে টেস্টের চিরায়ত গাণিতিক ব্যাটিংয়েও আসে নতুনত্ব। পাশাপাশি হাত খুলে খেলার প্রবণতা বাড়ে। মিনিট-ঘণ্টা ও সেশন হিসাব করে ব্যাট চালানোর চেয়ে বল গুনে রান তোলাই বড় হয়ে দেখা দেয়। বোধ জাগে, বলের মেধা-গুণ বিচার করে গাণিতিক ও নয়নজুড়ানো শটস খেলাই শেষ কথা নয়। ৫০ ওভারের খেলায় বোলারের ওপর ছড়ি ঘোরাতে দরকার অন্তত বলপিছু রান তোলা। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট চালুর পর সে ভাবনায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। এখনকার বোধ ও উপলব্ধি ভিন্ন। তাই বলপিছু রান করার চেয়ে ১৩০-১৪০ কিংবা তারও বেশি স্ট্রাইক রেটে রান তোলার চেষ্টা চলছে।    ১২০ বলের খেলা। এখানে বলপিছু রান করলেই চলবে না। তাহলে গড়পড়তা স্কোর দাঁড়াবে ১২০ থেকে ১৩০। তাই এমন কিছু করতে হবে, যাতে ২০ ওভার শেষে স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ১৬০ থেকে ১৮০। কখনো ২০০তে। তাই ব্যাকরণ মেনে আর বলের মেধা ও গুণ বিচার করে খেলার বদলে অবিষ্কার হয়েছে নানারকম উদ্ভাবনী শট। এখন অফসাইডে পাঁচ থেকে ছয়জন ফিল্ডার নিয়ে অফস্ট্যাম্পের আশপাশে বল ফেলেও স্বস্তিতে নেই বোলাররা। ব্যাটসম্যানরা অফসাইডে সরে অনসাইডে স্কুপ করছেন। ফাইন লেগের আশপাশ দিয়ে বল চলে যাচ্ছে সীমানার ওপারে। গুড লেন্থে বল ফেলে এখন আর সমীহ জাগানো যাচ্ছে না। স্লগ সুইপে বল গিয়ে আছড়ে পড়ছে মিড উইকেট ও ওয়াইড লং অনের মাঝখান দিয়ে সীমানার ওপারে। আবার অনসাইডে বেশি ফিল্ডার রেখে লেগ মিডলে বল ফেলেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ব্যাটসম্যানরা অনসাইডে সরে কভার-একেস্ট্রা কভারের ওপর দিয়ে তুলে মারছেন প্রতিনিয়ত। এখানেই শেষ নয়। রিভার্স সুইপে পয়েন্ট ও তার আশপাশে গলানোর চেষ্টাও চলছে অবিরাম। এখন তাই ভালো ও সমীহ জাগানো ডেলিভারি বলে কিছু নেই। বোলারদের বেশির ভাগ ‘জারিজুরি’ ফাঁস হয়ে যাচ্ছে ব্যাটসম্যানের ‘ হাতুড়ি পেটায়’। ডি ভিলিয়ার্স, ডি কক, ম্যাক্সওয়েল, ওয়ার্নার ও ম্যাককালামরা অনায়াসে সেগুলোকে ‘উদ্ভাবনী’ শটস খেলে অবলীলায় চার-ছক্কা হাঁকাচ্ছেন। মনগড়া ও উদ্ভাবনী শটের প্রদর্শনী বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেটও  ১৫০.০০, ২০০.০০ এমনকি ২৫০.০০-এ গিয়ে ঠেকছে। তাই তো টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ৪৫ বলে সেঞ্চুরি আর ১২ বলে হাফ সেঞ্চুরির দেখা মিলছে। কাজেই এখন বাটিংয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের ছোঁয়া।

সত্তরের দশকের শুরুতে ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রচলনের আগের সময়টায় ব্যাটিং মানেই ছিল ব্যাকরণের যথাযথ অনুসরণ। টেস্টে আসলে অমন ব্যাকরণ না মেনে ব্যাট না করে উপায়ও ছিল না। দীর্ঘ পরিসরের খেলায় ব্যাটিং মানেই ধৈর্য, মনোযোগ-মনোসংযোগ আর গাণিতিক ব্যাট চালনার মিশ্রণ। প্রায় সারা দিন স্লিপ ও গালিতে তিন-চারজন ফিল্ডার দাঁড়ানো, কখনো কখনো নাকের ও চোখের ডগায় ফিল্ডারের ওৎ পেতে থাকা, আর বোলারের চরম আক্রমণাত্মক মেজাজ, কখনো অফস্ট্যাম্পের আশপাশে আউট সুইং, তারপর হঠাৎ ইন সুইংয়ে বল ভেতরে আনা, সঙ্গে বাউন্সার ও ইয়র্কার—পরিপাটি টেকনিক আর ধৈর্য ও মনোযোগ-মনোসংযোগ ছাড়া সামলানো কঠিন। তাই ক্রিকেট যখন টেস্টকেন্দ্রিক ছিল, তখন ব্যাটসম্যানদের বড় অংশ ব্যাকরণ মেনে ঠাণ্ডা মাথায় খেলার চেষ্টা করতেন। তাই তো গ্রেগ চ্যাপেল, সুনীল গাভাস্কার ও ডেভিড গাওয়ার ও জিয়ফ বয়কটরা গাণিতিক ব্যাট চালনায় হয়েছেন সফল।

তাঁদের ব্যাকরনসম্মত ও অধ্যবসায়ী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ভিভিয়ান রিচার্ডস ও গর্ডন গ্রিনিজের মতো সহজাত প্রতিভাবানদের অনায়াস-সাবলীল ও সাহসী ব্যাটিংও দর্শক-ভক্তদের মনোরঞ্জনের বড় খোরাক ছিল। তাই তাঁরাও দারুন জনপ্রিয় ছিলেন। সত্তরের দশকের শুরুতে এক দিনের সীমিত ওভারের ক্রিকেট চালুর পর থেকেই ব্যাটিংয়ে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ব্যাটিংয়ে শৈল্পিকতা ও নান্দনিকতার পাশাপাশি সৃষ্টি ও সৃজনশীলতাও জায়গা করে নেয়। তাই ভিভ রিচার্ডস, গ্রিনিজ, হেইন্স, লারা, রিচার্ডসন, শ্রীকান্ত, সাঈদ আনোয়ার, শচীন, সৌরভের ঝড়ো ব্যাটিং হয়ে উঠেছিল আনন্দ ও বিনোদনের খোরাক।

কিন্তু এখন  ডি ভিলিয়ার্স, গেইল, ম্যাককালাম, ওয়ার্নারদের ব্যাটে অমন সৌন্দর্য, শৈল্পিকতা ও নান্দনিকতা নেই। তার বদলে একটা ‘বুনো’ ভাব আছে। সেটাই যে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের সত্যিকার রূপ! 

হ সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রিকেট বিশ্লেষক


মন্তব্য