বাণিজ্যের খোলা দরজা-331841 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭

বাণিজ্যের খোলা দরজা

ইকরামউজ্জমান

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাণিজ্যের খোলা দরজা

সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেট রাইটার বার্নি রোডস তাঁর ‘এন্টারটেইনিং ক্রিকেট’ বইয়ে লিখেছেন, ‘টি-টোয়েন্টি হলো আনন্দ বিতরণ আর আনন্দ উপভোগের ক্রিকেট। জৌলুস আর আলোকচ্ছটার ক্রিকেট। আত্মবিশ্বাসী বীরদের আক্রমণাত্মক ভয়ডরহীন মনোরঞ্জনের এই ক্রিকেট ঘিরে সন্দেহ আর উপেক্ষার দিন শেষ! টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আবেগ এবং দর্শনকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। ক্রিকেট যে এত অল্প সময়ে এতটা বিনোদনে ভরিয়ে দিতে পারে সেটা বুঝতে পেরে সবাই বেজায় খুশি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের কথা ভাবলেই হার্দি বন্দরে আনন্দের একটা স্রোতধারা অনুভূত হয়। অতএব মাথার টুপি খুলে দাও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জনকের উদ্দেশে, যিনি ক্রিকেটকে নতুন প্রাণ দিয়েছেন। খেলাকে করেছেন নান্দনিক।’

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিয়ে এখন দারুণ খুশি ক্রিকেটপ্রেমিক, খেলোয়াড়, সংগঠক, আইসিসি আর স্পন্সররা। বাণিজ্যের মোড়কে বিনোদনের ক্রিকেটের এখন জয়জয়কার। দুই হাতে অর্থ কামাচ্ছেন খেলোয়াড়রা—যা তাঁরা আগে কল্পনাও করতে পারেননি। ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর সংশয়ে ভুগছে না আইসিসি, তাদের তহবিল ক্রমেই ফুলে-ফেঁপে মোটা হচ্ছে! বহুজাতিক কারবারিরা ক্রিকেটের আবেগ আর বিনোদনকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পনামাফিক পুঁজি লগ্নি করে তাঁদের ‘ব্যালেন্স শিটের’ বটম লাইনের ‘গ্রাফ’কে ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী করে যাচ্ছেন। বহুজাতিক কম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রচার, বিক্রি, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, ‘ব্র্যান্ড পজিশনিং’, ‘করপোরেট’ ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে ‘হান্ড্রেড মিটার স্প্রিন্টের’ গতিতে সবসময় দৌড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। পুরনো রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। ১৫-২০ বছর আগের ক্রিকেট বাণিজ্যের সঙ্গে এখনকার বাণিজ্যের কোনো তুলনাই হয় না। আইসিসি ক্রিকেটে বাণিজ্যের সব দরজা হুড়মুড়িয়ে খুলে দিয়েছে। বলছে সবকিছুই করা হচ্ছে ক্রিকেটের স্বার্থে। ভবিষ্যতের চিন্তায়!

ক্রিকেটে মূল যে সমস্যা, মানুষ মাঠে আসছে না,  তাদের কে কিভাবে আনা যাবে—সেই সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট! টি-টোয়েন্টি হলো ক্রিকেটের অবধারিত ‘বক্স অফিস’। খেলাটা আকর্ষণীয় বাজারি সওদা। টেস্ট ম্যাচ, ওয়ানডে—সবই থাকবে, তবে বাজার মাত করে ফেলেছে টি-টোয়েন্টি ‘প্যাকেজ’। সাড়ে তিন ঘণ্টার খেলায় রমরমা ব্যবসা, আবেগ-উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা, হাসিকান্না, রোমাঞ্চ—কী নেই! অতএব, জয়তু টি-টোয়েন্টি।

এত কিছুর পরও একটি আলোচনা ও বিতর্ক আছে। আর তা হলো যেভাবে বাণিজ্যের বোঝা ক্রিকেটের মাথায় চাপছে, ক্রিকেট প্রেমের মাদকতায় আচ্ছন্ন হওয়ার সুযোগটা যেভাবে কাজে লাগানোর জন্য বহুজাতিক কম্পানিগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে, এই ক্ষেত্রে বড় ‘রিটার্ন’ নিশ্চিত করার জন্য কি না করে—এর শেষ কোথায়? ক্রিকেটে বাণিজ্যের অত্যধিক প্রভাব কি খেলার সরলতা, আনন্দ, মাধুর্য, জীবনবোধ ও সৌজন্যকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে না? স্পন্সরশিপের ছত্রচ্ছায়ায় অর্থ উপার্জনের মহোৎসবটা কী মাঠের ক্রিকেট থেকে অনেক ক্ষেত্রে বড় হয়ে যাচ্ছে না। ক্রিকেটের পরতে পরতে এখন ব্যবসায়িক গন্ধ। সব কিছুর  পেছনে অর্থশক্তি। কী সাংঘাতিক মগজ ধোলাই। সব কিছুই ‘নিমরালাইজেশন’ ও ‘গ্লোবালাইজেশনের’ নামে। দরজা খুলেছে এখন সারা বিশ্ব আমার গ্রাম—দিবে আর নিবে, মিলাবে, মিলিবে, যাবে না ফিরে। যারা ক্রিকেটে ডলার-পাউন্ড ঢালছেন তাঁরা তো রীতিমতো ‘দেবদূত’। তাঁরা আমাদের সব দায়দায়িত্বের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিতে চলেছেন, বিনিময়ে তো তাঁরা যেভাবে পারবেন সুযোগ হাতিয়ে নেবেন! তাঁদের চিন্তা তো আজকে ঘিরে নয়। আগামীকাল, আগামী পরশু এবং তার পরের সামনের অনেক বছরের। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভাবা হয়েছে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে কী হতে পারে। কী হওয়া উচিত। এখন বহুজাতিক কম্পানিগুলো চিন্তা শুরু করেছে ২০২২ সালে বিশ্বকাপকে ঘিরে। তারা পরিকল্পনা আঁটছে। কিভাবে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে পুঁজি লগ্নি করে ব্যবসা আরো বৃদ্ধি করবে, নতুন বাজার ধরবে, আরো বেশি মুনাফা নিশ্চিত করবে। ক্রিকেট ঘিরে আইসিসির চেয়েও বেশি চিন্তা বহুজাতিক কম্পানিগুলোর। কম্পানিগুলো ক্রিকেটে তাদের দুর্জয় দুর্গ নির্মাণে সফল হয়েছে।

বিশ্ব ক্রিকেটে এখন আর খেলার ‘স্পিরিট’, খেলার উত্কর্ষ বড় জিনিস নয়। অপ্রিয় শোনালেও এটাই বাস্তবতা। অর্থোপার্জনই একমাত্র অভীষ্ট। বিশ্বকাপের বিশ্বায়নের ফলে দেশে দেশে ক্রিকেট খেলার প্রচার ও প্রসারের চেয়ে ব্যবসা প্রাধান্য লাভ করছে। যেটা লক্ষ করছি স্পনসরদের কার্যক্ষেত্রে তাতে বলতে অসুবিধা নেই, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যতটা ক্রিকেটারদের তার চেয়েও বেশি করে সম্ভবত স্পনসরদের। ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণ করতে গিয়ে প্রশাসকরাই ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ তৈরি করেছিলেন আর সেই ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ আজ খেলাকে গিলে ফেলার রাস্তায় হাঁটছে। ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাথা ঘামানোর পাশাপাশি নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপদেশ। কখনো প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা। তারকা খেলোয়াড়দের মুখ থেকে যখন শুনতে পাই, আমরা না খেললে কিসের বিশ্বকাপ—তখন বুঝি এর পেছনে কোন শক্তি কাজ করে! এসবই ক্রিকেট প্রশাসকদের জন্য চিন্তার বিষয়!

মাঝেমধ্যে অবাক হই যখন শুনতে পাই আইসিসি বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ১০ দলের সংখ্যা নির্ধারণ নিয়ে ভাবছে! যারা ক্রিকেটের মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির জন্য মরিয়া, তারা তো এই চিন্তায় বিশ্বাসী নয়! তাদের চিন্তা তো অন্য ধরনের।

কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য