ক্রিকেটের কত রংবদল!-331840 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭

ক্রিকেটের কত রংবদল!

মুহাম্মদ কামরুজ্জামান

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্রিকেটের কত রংবদল!

ক্রিকেটের সঙ্গেই আমার বড় হওয়া। ছিলাম সেই টেস্ট যুগের মানুষ, বড় হতে হতে পেয়েছি ক্রিকেটের বিচিত্র স্বাদ। সময় যেমন ক্রিকেটকে বদলেছে, আমিও চেষ্টা করেছি চলতি হাওয়ার পন্থী হতে। আমার মতো টেস্ট অনুরাগীও মনোজগত্টা পাল্টে নিয়ে হালের মচমচে টি-টোয়েন্টি দিব্যি উপভোগ করছি।

অথচ ছেলেবেলায় কখনো কল্পনায়ও হানা দেয়নি আজকের এই ধুন্ধুমার ক্রিকেট। ১৯৫৫ সালে ঢাকা মাঠে বসে প্রথম টেস্ট ম্যাচ দেখি, তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। স্কুলের বেতনের বই দেখাতে হয়েছিল, বেতন পুরোপুরি পরিশোধ করা ছাত্ররা দেড় টাকায় টিকিট কিনে খেলা দেখে। ভারতীয় ব্যাটসম্যান ভিনু মানকড়, পলি উমিগড়, বিজয় মাঞ্জেরকারের খেলা দেখেছি। আফসোস বিজয় হাহারের ব্যাটিং দেখা হয়নি, ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দেওয়ার পরও তাঁকে দলে নেয়নি। ম্যানেজার হয়ে এসেছিলেন লালা অমরনাথ। এখনকার মতোই ভারতের যেমন ব্যাটিং ছিল তেমনি পাকিস্তানের আগুনঝরা বোলিং। আগের বছর ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে তাদের মাটিতে। পেসার ফজল মাহমুদ, খান মোহাম্মদ ও মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে স্পিনার জুলফিকার ও সুজা উদ্দিন। এই বোলিংয়ের তোপে ভারতের প্রথম ইনিংস ১৫৪ রানে শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তানেরও একই দশা, ১০০-র কিছু বেশি রান করেছিল। দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন সুভাষ গুপ্তে, সম্ভবত ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। তাঁর লেগ স্পিনে এত মায়াজাল, ব্যাটসম্যারা হাঁসফাঁস করতেন। যত দেখেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি, গুপ্তেকে আমি শেন ওয়ার্নের চেয়েও ওপরে রাখি। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের মান ভালো হলে তাঁর উইকেট সংগ্রহ অনেক বেশি হতো।

এই ঢাকা মাঠে নিউজিল্যান্ডকে দেখেছি। গ্যারি সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দেখেছি। ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাটসম্যান নিয়ে এত কথা হয়, সেখানে রোহন কানহাই কোথায় থাকবে জানি না। তবে আমার কাছে তিনি অনন্য-অসাধারণ। ঢাকা মাঠে দেখেছি নীল হার্ভের ৯৬ রানের ইনিংস। এ জীবনে অনেক সেঞ্চুরি দেখেছি কিন্তু এই অস্ট্রেলিয়ানের ইনিংসটির কথা আমি ভুলতে পারি না। এত নিখুঁত ব্যাটিং ও অভিজাত সব শট যেন ক্রিকেট ব্যাকরণের বইটা পকেটে নিয়েই তিনি ব্যাটিংয়ে নেমেছেন। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম মাত্র চার রানের জন্য তার সেঞ্চুরি মিস হওয়ায়। নতুন বল নেয় পাকিস্তান, ফজল মাহমুদের প্রথম বলটি একটু বেশি সুইং করে আর হার্ভে ড্রাইভ খেলতে গিয়ে লাইন মিস করেন। পরে অস্ট্রেলিয়ান উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান ওয়ালি গ্রাউডের ৬৬ রানের বেধড়ক পিটুনির ইনিংসটাই অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ জিতিয়ে দেয় অবিশ্বাস্যভাবে। এটাই ১৯৬০ সালে রিচি বেনোর অস্ট্রেলিয়ার বড় কৃতিত্ব। তারা ছাড়া অন্য কোনো দল ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে এসে সিরিজ জিতে ফিরতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ঢাকায় হওয়া সাতটি টেস্ট ম্যাচ আমি মাঠে বসেই দেখেছি। তা ছাড়া কলকাতায় গিয়ে টেস্ট দেখেছি এবং বাংলাদেশ আমলে তো অনেক আছেই। মানে আমাদের ক্রিকেট দেখার চোখটা তৈরি হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট দিয়েই। এখনকার ছেলেপুলের হয়তো বিশ্বাস হবে না, ক্লাব ক্রিকেটেও আমরা পাঁচ দিনের ম্যাচের সিরিজ খেলতাম। আমি খেলতাম ন্যাশনাল স্পোর্টিং ক্লাবে, সিরিজ হতো বকশীবাজার  ক্লাব ও কেরানীগঞ্জ ক্রিকেট ক্লাবের সঙ্গে।

ক্যারি প্যাকারের ক্রিকেট বিপ্লবে হঠাৎ খেলাটির রং বদলে যায়। রঙিন বল ও রঙিন কাপড়ে ক্রিকেটের সঙ্গে অর্থযোগের হাতছানি উপেক্ষা করতে পারেননি ক্রিকেটাররা। শুরু হয়ে গেল ওয়ানডে অধ্যায়। হুট করে এই পরিবর্তন ধারণ করা কঠিন। ধারণা ছিল, ওয়ানডে টিকবে না। কিন্তু টিকে গেল। মন্থর ক্রিকেট মানুষের আর পছন্দ হচ্ছিল না। সময়ও একটা ব্যাপার বটে, আর পাঁচ দিন খেলার পরও জয়ের গ্যারান্টি নেই। এ কারণে বোধ হয় ক্রিকেটের বিবর্তনকে মানুষ আলিঙ্গন করেছে এবং এক দিনের ক্রিকেটে জয়-পরাজয়ের মজাটা অনেক বেশি উপভোগ করছে। শুরুর দিকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও পরে আমার কাছেও বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে এক দিনের ক্রিকেট। ক্ল্যাসিকাল ব্যাপারটা কমে গেলেও ব্যাটসম্যান-বোলাররা তৈরি হয়েছেন নতুনভাবে। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে দ্রুত রান তোলার ব্যাপারটা। টেস্টে খুব ভালো বল ডিফেন্স করেও হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু ওয়ানডেতে সেই বলেও অন্তত এক রান চাই। এ জন্য ওয়ানডেতেও এখন ৩৫০-৪০০ রান অনায়াস ব্যাপার হয়ে গেছে।

ক্রিকেটের আরো ছোট সংস্করণ টি-টোয়েন্টি এসে অন্য মাত্রা দিয়েছে রান তোলার চ্যালেঞ্জটাকে। বোলারকে ভাবতে হচ্ছে নতুনভাবে। এটা ক্রিকেট নান্দনিকতায় কুঠারঘাত হয়েছে ঠিক, তবে এ কথাও মানতে হবে, ক্রিকেট মানসিকতায় বিস্তর রদবদল হয়েছে। শুনে বিস্মিত হই, কলকাতা ইডেন গার্ডেন টেস্টেও নাকি এখন আগের মতো দর্শক হয় না। তাই টেস্ট ক্রিকেটের সনাতন সৌন্দর্যকে লঘু করে খেলাটিকে জনতার মনোগ্রাহী করে তোলা চলছে। হয়তো বা খেলাটির বিস্তৃতির কথা ভেবেই করা হচ্ছে। এখানে সময়ও একটা বড় নিয়ামক। অন্যান্য খেলা মিনিট-ঘণ্টার হিসাবে চলছে, সেখানে এক দিনের ক্রিকেটও অনেক বেশি সময় নিয়ে নেয়। তাই সাড়ে তিন-চার ঘণ্টার টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খারাপ নয়। টি-টোয়েন্টিকে গালমন্দ করে টেস্ট দর্শকের আভিজাত্যের ঝাণ্যা ওড়ানোর পক্ষে নই আমি। ভালো ক্রিকেটার সব সময় সব ধরনের ক্রিকেটে একটা নির্দিষ্ট মানে থাকেন। কারণ ভালো ব্যাটসম্যান কিংবা বোলারের বেসিক টেকনিকগুলো জানা থাকে। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই একজন ব্যাটসম্যান ইম্প্রোভাইজ করেন। নতুন শট আবিষ্কার করেন। এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের ম্যাচে অমন আগুনে বোলিংয়ের বিপক্ষে বিরাট কোহলি কি অসাধারণ খেলেছেন! আবার ওয়ানডে-টেস্টেও ভারতের বড় আশ্রয় কোহলি, অর্থাৎ তিন ধরনের ক্রিকেটেই তিনি দুর্দান্ত। শুধু কোহলি কেন, প্রতিটি দলেই এ রকম অনেক ক্রিকেটার আছেন। তাহলে ভাবুন, একজন ক্রিকেটারকে এখন তিন ধরনের ক্রিকেটে সফল হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করতে হয়। এটা অনেক কঠিন কাজ।

ধন্যবাদ ক্রিকেটারদের। এক জীবনে খেলাটিকে কতভাবে উপভোগের সুযোগ করে দিয়েছেন তাঁরা।

প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

মন্তব্য