ভারত না অস্ট্রেলিয়া?-331831 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


ভারত না অস্ট্রেলিয়া?

সাইদুজ্জামান

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভারত না অস্ট্রেলিয়া?

খেলাটা টোয়েন্টি টোয়েন্টি, তাই ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো করে ‘জাতীয়তাবোধ’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে না। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দারুণ কিছু করবে, জোর গলায় তেমন দাবি না করলেও মনের কোণে সামান্য আশা তো ছিলই। কিন্তু আর কদিন পর ভারতে শুরু হতে যাওয়া ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে (প্রকারান্তরে যা এ ফরম্যাটের বিশ্বকাপ) বাংলাদেশকে ঘিরে বড় কোনো আশা নেই। দূরগ্রামের মায়ের মতো, বিদেশগামী ছেলে জীবনে বড় হোক যতটা চান, তার চেয়ে বেশি প্রার্থনা করেন ছেলে যেন বখে-টখে না যায়! নেদারল্যান্ডস আর ওমানকে টপকে মূল পর্বে উঠে মাশরাফি বিন মর্তুজারা যদি বড়দের ধাক্কা-টাক্কা দিতে পারে, তাহলেই দেশবাসী খুশি।

কাপ কে জিতবে—তার চেয়ে মাশরাফিদের ঘিরে এ দেশের মানুষের প্রত্যাশার আগাম বার্তা দেওয়া সহজতর। খেলাটা টি-টোয়েন্টি হওয়ায় সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন আগাম বলে দেওয়া মুস্তাফিজুর রহমানের পরের বলটা কাটার নাকি বাউন্সার হবে—ধারণা করার চেয়েও কঠিন। পরিসংখ্যান, ফর্ম, খ্যাতি সবই এত ঠুনকো যে আরব আমিরাতও কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেয় এ ফরম্যাটের সফলতম দল পাকিস্তানকে। বাঘা বাঘা টি-টোয়েন্টির বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও এখনো কাপ জিততে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। উল্টো অধিনায়কত্ব ক্যারিয়ারের শুরুতেই ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ের আজন্ম ক্ষুধা মিটিয়েছিল ২০১০ ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি। ২০১২ সালে কাপ জিতে পুনরুজ্জীবনে আশা জাগিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের। সাবেক চ্যাম্পিয়নের পরিচয় নিয়ে এবারের আসরে যাচ্ছে পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কাও। সব মিলিয়ে একবারের বেশি শিরোপা জেতা হয়নি কোনো দলেরই।

তাহলে কি এবারও নতুন চ্যাম্পিয়ন উঠবে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির বিজয়মঞ্চে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের আগে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নাম উঠে আসতে বাধ্য। ভাবা যায়, সবচেয়ে বেশি চারবারের আসল বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা টি-টোয়েন্টির কাপ জেতেনি একবারও, ফাইনালেই খেলেছে মাত্র একবার! এ আসরে নিউজিল্যান্ডের অবস্থা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো, ফাইনালে ওঠা হয়নি এখনো। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে ষষ্ঠ ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি জেতার সামর্থ্য রয়েছে এ তিনটি দলেরও।

কিন্তু টি-টোয়েন্টির মতি-গতি কি আর বোঝা যায়। আপাতত একটা ট্রেন্ডই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে, ঘরের মাঠে শিরোপা জেতার রেকর্ড নেই এ আসরে। সেই সূত্র ধরে এবারের হিসাব থেকে ভারতকে বাদ দিতে পারবেন কেবল তীব্র ভারতবিদ্বেষীরাই। আইসিসির র্যাংকিংয়ে অনেকেরই খুব জোরালো বিশ্বাস নেই। কিন্তু স্বীকৃত এ র্যাংকিং উপেক্ষা করলেও অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কাকে সিরিজ হারানোর পর চলমান এশিয়া কাপে ভারতের ফর্ম বিবেচনা না করে উপায় নেই। চেনা কন্ডিশন আর ঢালাও সমর্থন মিলিয়ে এবারের হট ফেভারিট স্বাগতিক ভারতই। আগে কেউ ঘরের মাঠে জেতেনি বলে ভারতও পারবে না বলে ধরে নিলে ভুল করার সম্ভাবনাই বেশি।

ভারতের মাটিতে স্বাগতিকদের সমর্থনে ভাগ বসানোর উপায় আর কোনো দলেরই নেই। কিন্তু কন্ডিশনটা কি আর ভারতের একার চেনা? এশিয়ার বাকি দলগুলোর বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। শিরোপা রেসে স্বাগতিকদের বাকি প্রতিদ্বন্দ্বীরা ভিন্ন গোলার্ধের হলেও কন্ডিশনটা ঠিকই চিনে গেছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) বদৌলতে ভারত এখন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের কাছে এখন ‘সেকেন্ড হোম’! অস্ট্রেলিয়ার ১৫ সদস্যের দলের মাত্র তিনজনের আইপিএলে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। সেই তিনজনকে আবার ‘এ’ দলের ব্যানারে মাস দুয়েক আগেই ভারতে লম্বা সফর করিয়ে নিয়ে গেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে ঠাঁই হয়নি এমন ক্রিকেটারও দাপিয়ে বেড়ান আইপিএলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল, ডোয়েন ব্রাভো, কাইরন পোলার্ড, সুনীল নারিন, ড্যারেন সামিরা আইপিএলের প্রোমোতেও জায়গা করে নিয়েছেন। তাই কন্ডিশনের ‘কাঁটা’র আঘাতে শত্রু বিনাশের কথা সম্ভবত ভাবছে না ভারতীয় দলও। আইপিএলে অনিয়মিত ইংলিশ আর কিউই ক্রিকেটারদের সমস্যা হবে ভাবছেন? তাহলে সামান্য হলেও আস্থা রাখুন আইসিসির ওপর। রানের জন্য উইকেট বানাবে আইসিসি, যেমনটা করা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ২০১৫ বিশ্বকাপেও।

ব্রেন্ডন ম্যাককালাম অবসর না নিলে অনায়াসে শিরোপা রেসে ঢুকে যেত নিউজিল্যান্ড। ইংল্যান্ড দলটার এইউন মরগ্যানের কাছে প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার মানে নেই। তাঁর দলে বড় আসর জেতার ঝাঁঝটাই যে নেই! ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি চারবার ফাইনাল খেলা শ্রীলঙ্কা দল এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি মাহেলা জয়াবর্ধনে এবং কুমার সাঙ্গাকারার বিদায়ের। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং মিলিয়ে রীতিমতো দুর্ধর্ষ দল দক্ষিণ আফ্রিকা। দল হিসেবে ফর্মেও আছে। কিন্তু বড় আসরে নামলেই কি যেন হয় প্রোটিয়াদের। তাই এবি ডি ভিলিয়ার্স ব্যাটিংয়ে দারুণ ‘ইনোভেটিভ’ এবং বিধ্বংসী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দলের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর পক্ষে বাজি দরায় বিস্তর ঝুঁকি রয়েছে। ক্যারিবীয়দের আছে একজন ক্রিস গেইল, যিনি একাই গড়ে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য। কিন্তু ৩৬ পেরোনো এ জ্যামাইকান কবে জ্বলে উঠবেন, সে অপেক্ষায় না টুর্নামেন্টই শেষ হয়ে যায় ক্যারিবীয়দের! পাকিস্তানের অবস্থাও সুবিধের নয়।

বাকি রইল দু’টি দল—ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের ব্যাটিং লাইন আপকে সমীহ করে না এমন দল বিশ্বে নেই। বোলিংয়ে যথেষ্টই ঘাটতি ছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি আশিস নেহরার প্রত্যাবর্তন এবং দুই তরুণ পেসার জসপ্রীত বুমরাহ ও অলরাউন্ডার হার্দিক পাণ্ডের অন্তর্ভুক্তিতে নতুন বলে উইকেট তোলা নিয়ে চুল ছিঁড়তে হচ্ছে না ধোনিকে। ইনিংসের মাঝপথে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রানের চাকা আটকে দেওয়ার জন্য তো রবিচন্দ্রন অশ্বিন রয়েছেনই। চলমান এশিয়া কাপে ভারতের হাই প্রোফাইল ব্যাটিং অর্ডারের কাজ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছেন বোলাররা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ডাক পড়লে ঝাঁপিয়ে পড়ার মনোবল এবং যুদ্ধ জয়ের সামর্থ্যও আছে বিরাট কোহলিদের।

এ অনিশ্চয়তার মেঘ ঠেলেই পূর্ব ভাবনায় অস্ট্রেলিয়ার আবির্ভাব। ডেভিড ওয়ার্নার, অ্যারন ফিঞ্চ, জেমস ফকনার, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, শেন ওয়াটসনদের অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ—ধোনির ভারতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পর্যাপ্ত শক্তি আছে অস্ট্রেলিয়ার। বড় আসর জিততে নাকি ‘চ্যাম্পিয়নস লাক’ লাগে। টি-টোয়েন্টির আগের পাঁচটি আসরে সে ভাগ্য হয়নি অস্ট্রেলিয়ার। তবে ভারতের মাটিতেই কিন্তু প্রথম ভাগ্য খুলেছিল অস্ট্রেলিয়ার, ১৯৮৭ বিশ্বকাপ জিতে।

অ্যালান বোর্ডারের ওই অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে স্টিভেন স্মিথের অস্ট্রেলিয়ার কাছে ভারতের মাটি অনেক ভালো করে চেনা-জানাও। তাহলে এবার নয় কেন?

মন্তব্য