‘টাপ্পা মারা’ মুস্তাফিজ-331829 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


‘টাপ্পা মারা’ মুস্তাফিজ

মাসুদ পারভেজ

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘টাপ্পা মারা’ মুস্তাফিজ

ক্রিকেট অভিধানে নেই যদিও তবু ‘লোপ্পা’ শব্দটি বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে স্থায়ী দখল নিয়েই যেন আছে। ম্যাচে কারো সহজ কোনো ক্যাচ ফেলার ঘটনা এখানে অতি বড় শুদ্ধচারীর মুখ থেকেও তো বের করে আনে ওই শব্দটিই। অভিধানে না থাকা এমন আরেকটি শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়াও বোধহয় এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

বাংলায় কোনো ক্রিকেট অভিধান হলে যে শব্দটির জায়গা করে নেওয়াও ইতিমধ্যে নিশ্চিত করে ফেলেছেন মুস্তাফিজুর রহমান। যে তরুণ বাঁহাতি পেসারে এখন মোহিত গোটা ক্রিকেট-বিশ্বই। সাতক্ষীরার দূরগ্রাম তেঁতুলিয়া থেকে উঠে আসা মুস্তাফিজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন জগতেও দিব্যি পায়ের নিচে মাটি পেয়ে গেছেন। তাঁর ‘কাটার’ নামের ডেলিভারি এমন ব্যাটসম্যানঘাতী মারণাস্ত্র হয়ে উঠেছে যে সেটির রহস্যভেদে ব্যস্ততার অন্ত নেই প্রতিপক্ষেরও।

সারা বিশ্বের কাছে এটি গোলকধাঁধা হলেও কারো কারো কাছে তা ব্যাটসম্যান ঘায়েল করার খুব চেনা এক অস্ত্রই। স্থানীয় ক্রিকেটে কান পাতলে এমন অনেককেই পাওয়া যায়, যাঁরা নিজেদের এই ডেলিভারির ‘মাস্টার’ বলেই দাবি করে থাকেন। তাই বলে কেউ আবার নিজেকে মুস্তাফিজের সমকক্ষ হয়ে যাওয়ার দাবিও করেন না। কারণ কেউ তো আর টেপ  পেঁচানো টেনিস বলের খেলায় খুবই কার্যকরী চাতুরীটা মুস্তাফিজের মতো ক্রিকেট বলেও করছেন না। তবে মুস্তাফিজকে সেটি দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মাত করতে দেখে অস্ফুটেই উচ্চারণ করছেন, ‘আরে, এটা তো আমিও পারতাম।’

যা পারতেন, সেটিকে তাঁরা কদাচিৎই ‘কাটার’ বলে থাকেন। যা বলে থাকেন, তা শোনার জন্য শাহাদাত হোসেন নামের এক সাবেক ক্রিকেটারের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে বলতে ঢাকার প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে একসময় ওয়ারীর হয়ে খেলেছেন তিনি। তবে টেপ টেনিসের ‘খেপ’ খেলার জন্যই বেশি খ্যাত ছিলেন বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নিরাপত্তা কমিটির এ সদস্য। তাঁর ভাষায়, ‘‘মুস্তাফিজ যে অফকাটার মারে, সেটিকে আমরা বলি ‘টাপ্পা’। টেপ টেনিসের খেলায় তো বল নিয়ে কারিকুরি করার তেমন কিছু নেই। তবু ভীষণ কার্যকরী কিছু ডেলিভারি ঠিকই বেরিয়ে গিয়েছিল। এরই একটি ছিল ওই ‘টাপ্পা’। যা আমি নিজেও খুব ভালো মারতাম।’’

তাই বিদেশি ভাষায় ‘কাটার’ মুস্তাফিজ হলে স্থানীয় ভাষায় তিনি নিশ্চিতভাবেই ‘টাপ্পা মারা’ মুস্তাফিজ। রাজধানীতে এসে ক্রিকেটের মূল স্রোতে ঢুকে পড়ার আগে মুস্তাফিজও টেপ টেনিসের নিষ্ঠাবান ক্রিকেটার ছিলেন। ‘খেপ’ খেলতে এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম, এই ইউনিয়ন থেকে সেই ইউনিয়নে ছুটে বেড়ানো মুস্তাফিজকেও কার্যকরী হতে নিত্যনতুন চাতুরী শিখতে হয়েছে। সেই শিক্ষাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাজে লাগিয়ে এখন তিনি মহাতারকাই হওয়ার পথে। খ্যাতির আলোঝলমলে এ দুনিয়াতে এসেও তিনি ‘খেপ’ জীবনের শেকড় আঁকড়ে থেকে সফল। শাহাদাত বিশেষ সেই ডেলিভারির আদ্যোপান্ত জানাচ্ছিলেন এভাবে, ‘‘অফ স্পিনারের গ্রিপে একটু জোরের ওপর যে ডেলিভারিটা করা হয়, সেটিই ‘টাপ্পা’ বা অফকাটার। এই ডেলিভারিতে মুস্তাফিজ আরো দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে কারণ ব্যাটসম্যানরা ওর গ্রিপটা ধরতে পারে না। ধরবে কিভাবে? হাত ঘুরিয়ে বল রিলিজ করার ঠিক আগ মুহূর্তে গ্রিপ বদলালে ব্যাটসম্যানের পক্ষে তা ধরা কঠিনও।’’

অবশ্য এখানেই শুধু নয়, মুস্তাফিজের আরো বিশেষত্বের জায়গাও খুঁজে পেয়েছেন আমিনুল ইসলাম। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান সেদিন বলছিলেন সেসব নিয়েই, ‘সব দিক বিবেচনা করলে মুস্তাফিজকে একদমই অন্য রকম বোলার বলে মানতে হয়। ইনসুইং করাতে ও অফকাটার দিতে পারে। মাঝেমধ্যে সুন্দর আউটসুইংও করায়। আর হাত ঘুরিয়ে আনার পথে বল একটু আগেভাগেই রিলিজ করে দেয়। বল একটু আগে ছেড়ে দেয় বলে বাউন্সও বেশি পায়। বল রিলিজ করার সময় একই অ্যাকশনে কোনোটি একটু আগে বা একটু পরে ছাড়ছে। ফলে বলে অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্যও থাকছে। এ ধরনের বোলারদের খেলা সত্যিই কঠিন।’

যদিও ব্যাটসম্যানদের কাছে দুর্বোধ্য বলে মনে হওয়া মুস্তাফিজের সামনেও এখন কঠিন চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করে আছে। এবার যে চেনা আঙিনা ছেড়ে অচেনা জগতেও যেতে হচ্ছে তাঁকে। পরিচিত জল-হাওয়ায় ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের ভুগিয়ে আসা এ তরুণ এবার যাচ্ছেন ভিনদেশেও। আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকে দেশের বাইরে খেলতে যাননি কোথাও। ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দিয়েই জাতীয় দলের সঙ্গে শুরু হচ্ছে তাঁর বিদেশ অভিযান। সুবাদে এই প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক আসরেও উপস্থাপিত হতে চলেছেন ‘টাপ্পা মারা’ মুস্তাফিজ!

মন্তব্য