বিস্ফোরক পাঁচ ব্যাটসম্যান-331827 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


বিস্ফোরক পাঁচ ব্যাটসম্যান

নোমান মোহাম্মদ

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিস্ফোরক পাঁচ ব্যাটসম্যান

ক্রিস গেইল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

বিনোদনের ফেরিওয়ালা তিনি। টি-টোয়েন্টির পোস্টার যেন। এই ক্যারিবিয়ানের ক্যারিয়ার শুরুর কত পরে ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণের যাত্রা শুরু! অথচ টি-টোয়েন্টির সমার্থকই বনে গেছেন ক্রিস গেইল। দরজায় কড়া নাড়া বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কতটা কী করতে পারে, তার অনেকখানি তাই নির্ভর করছে বিস্ফোরক এই ওপেনারের ওপর।

টেস্টে তাঁর ১৫টি সেঞ্চুরি। যার মধ্যে একটি ডাবল, দুটি ট্রিপল। ওয়ানডেতেও ২২ বার জাদুকরী তিন অঙ্কের স্কোরের লুটোপুটি এই জ্যামাইকানের ব্যাটে। তবু যেন গেইল শুধুই টি-টোয়েন্টির। বিশ্বের যেখানে যত ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, সবখানে চাহিদার শীর্ষে তিনি। হবেন না কেন? টি-টোয়েন্টিতে গেইল মানেই যে সাফল্যের গ্যারান্টি। তাঁর ব্যাটের ধ্বংসলীলায় প্রতিপক্ষের বোলাররা দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি।

টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি আসে গেইলের ব্যাট থেকে। সেটি ২০০৭ সালের প্রথম বিশ্বকাপে। ৩৬ বছরের এই ডাকাবুনো জ্যামাইকান হয়তো ভারতে খেলছেন শেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সেখানে ক্যালিপসো সুরে তাঁর ব্যাটের বুনো উদ্দামতা দেখার প্রত্যাশা শুধু ক্যারিবিয়ানদের নয়, চঞ্চল-প্রতীক্ষা সারা বিশ্বের সব ক্রিকেটপ্রেমীরই।

শেষ বেলায় কি আরেকটিবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চ রাঙিয়ে দিতে পারবেন না গেইল!

এবি ডি ভিলিয়ার্স (দক্ষিণ আফ্রিকা)

তিনি হতে পারতের রাগবি খেলোয়াড়। কিংবা নাম লেখাতে পারতেন হকিতে। ওই দুই খেলাতেও হয়তো থাকতে পারতেন সেরাদের সেরার কাতারে। এ ছাড়া স্কুলে গলফ, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, টেনিস—কোন খেলায় রাখেননি প্রতিভার ছাপ! চাইলে সে সব খেলার হয়ে যেতে পারতেন এবি ডি ভিলিয়ার্স।

ক্রিকেটের সৌভাগ্য, তিনি ক্রিকেটে এসেছেন। আর প্রতিপক্ষ বোলারদের দুর্ভাগ্য, তিনি ক্রিকেটাই শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন।

প্রথাগত শটে পারদর্শী, উদ্ভাবনী শটেও অতুলনীয়। তাঁর খেলা দেখলে ব্যাটিংটা কত সহজই না মনে হয়! আর সেই ব্যাটিংয়ে গড়াগড়ি খায় রান-রেকর্ড। ওয়ানডেতে দ্রুততম পঞ্চাশ, একশ, দেড়শ রানের রেকর্ড এই প্রোটিয়ার। আবার টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরিরও। সেই সঙ্গে অনুমিতভাবে টি-টোয়েন্টিতে দেশের জার্সিতে দ্রুততম ফিফটির।

বিস্ময় ছড়াতে পারে কেবল ডি ভিলিয়ার্সের একটি পরিসংখ্যান। ৬৫টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলে এখনো সেঞ্চুরির দেখা পাননি তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাটিং রকস্টার কি সেটি তবে জমিয়ে রেখেছেন আসন্ন বিশ্বকাপের জন্যই!

গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (অস্ট্রেলিয়া)

২৭ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে একটি মাত্র পঞ্চাশ পেরোনো স্কোর। কী বিবর্ণই না মনে হয়! কিন্তু পরিসংখ্যানের ভিন্ন এক পাতা উলটে দেখুন—স্ট্রাইকরেট ১৫৭.০২। গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সৌন্দর্য কিভাবেই না বিচ্ছুরিত তাতে!

অস্ট্রেলিয়ার বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানের খেলার ধরনটাই এমন। রানের পরোয়া করেন না, কেবল দলের চাহিদা মেটানোই লক্ষ্য। আর ম্যাক্সওয়েলের কাছে অসিদের সেই চাহিদাটা কী? যত দ্রুত সম্ভব রান করা। নিজের আগে দলের চাওয়া প্রাধান্য দেওয়া ছোট্ট একপ্রস্থ প্রমাণ রয়েছে পরিসংখ্যানে। ওয়ানডেতে এক সেঞ্চুরির বিপরীতে চার-চারবার আউট হয়েছেন নব্বইয়ের ঘরে। সেগুলো মোটেই ‘নড়বড়ে নব্বই’-এর স্নায়ুচাপে না। অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে দ্রুত রান তোলার চেষ্টায়।

বড় আসরে বরাবর জ্বলে ওঠে ম্যাক্সওয়েলের ব্যাট। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে যেমন দলকে চ্যাম্পিয়ন করানোয় বড় ভূমিকা রাখেন এক সেঞ্চুরি ও দুই ফিফটিতে ৩২৪ রান করে। ২০১৪ সালে সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৩ বলে ৭৪ রানের সেই চোখ ধাঁধানো ইনিংস। এই ফরম্যাটে যেটি এখন পর্যন্ত তাঁর একমাত্র ফিফটি।

আসছে বিশ্বকাপে ফিফটির সংখ্যা আর বাড়বে কি না, সে নিশ্চয়তা নেই। তবে মাক্সওয়েলের স্ট্রাইকরেট যে দেড়শর নিচে থাকবে না, এর পক্ষে বাজি ধরাই যায়। অতএব, বোলাররা সাবধান!

বিরাট কোহলি (ভারত)

তাঁর ব্যাটে আগুনের হলকা ছোটে না। তবু দাবানলে প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে ছারখার করতে জুড়ি নেই। উন্মত্ত আক্রোশের প্রতিফলন নেই তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে। বরং ধ্রুপদী ঘরানার প্রতিনিধি হয়ে ওড়ান বিজয় নিশান। টি-টোয়েন্টির এই মারকাটারি যুগেও বিরাট কোহলির ব্যাটিং কী স্নিগ্ধ! কী ভীষণ কার্যকরও!

ঘরের মাটিতে ভারতকে বিশ্বকাপ ট্রফি রেখে দিতে হলে তাই এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ফর্মে থাকাটা জরুরি।

টেস্ট-ওয়ানডে সাফল্য তাঁর চোখে পড়ার মতো। পিছিয়ে নেই টি-টোয়েন্টিতেও। এই ফরম্যাটেও সাফল্যের অট্টহাসি কোহলির ব্যাটে। এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের তিন খেলা শেষ হওয়ার পর পরিসংখ্যানের সাক্ষ্য, মাত্র ৩৬ ম্যাচে ১৩টি পঞ্চাশ পেরোনো স্কোর তাঁর। টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে তাঁর সামনে কেবল দুজন। তবে সে জন্য ক্রিস গেইল (৭১ ম্যাচে ১৫ বার) ও ব্রেন্ডস ম্যাককালামকে (৪৫ ম্যাচে ১৪ বার) ম্যাচ খেলতে হয়েছে ঢের বেশি।

অবশ্য ওই দুজনকে কোহলির ছাড়িয়ে যাওয়া কেবলই সময়ের ব্যাপার। হয়তো বিশ্বকাপেই!

সাব্বির রহমান (বাংলাদেশ)

তাঁর ব্যাটে প্রতিশ্রুতির পুষ্পকলি লুকিয়ে সেই কোন কাল থেকে! সমকালে এসে অবশেষে প্রস্ফুটিত হচ্ছে তা। সাব্বির রহমানের ব্যাটে বড় ভরসা করে তাই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

২০১০ এশিয়ান গেমস ফাইনালে দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে সাব্বির জানান দেন নিজের প্রতিভা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকও মন্দ না। গত দেড় বছরে বাংলাদেশের সাফল্যযাত্রার সৈনিক হয়ে আছেন তিনি। তবে অগ্রসৈনিক বলতে হবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ে সাব্বিরের ৩২ বলে অপরাজিত ৫১ রানের ইনিংসের মুখ্য ভূমিকা। সেটি শুধু বাংলাদেশ না, বিশ্ব ক্রিকেটেরই ওই বছরের অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি ইনিংস। আর এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫৪ বলে ৮০ রানের ইনিংসটি? এই ফরম্যাটে দেশসেরার ছোট্ট তালিকায়ও থাকবে নিঃসন্দেহে। পাকিস্তানের মতো লঙ্কানদের বিপক্ষেও টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের কারিগর সাব্বির।

হাতে বাহারি শট, বুকে ডাকাবুকো সাহস—টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের আদর্শ প্যাকেজ তিনি। কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে তো আর শুধু শুধু সাকিব আল হাসানের মতো মহাতারকাকে সরিয়ে তিন নম্বরে সাব্বিরকে খেলাচ্ছেন না! টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর ব্যাটের বারুদে বিস্ফোরণটা হলেই হয়!

মন্তব্য