kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হুজুগের হাওয়া আর যুগের চাওয়া

মোস্তফা মামুন

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হুজুগের হাওয়া আর যুগের চাওয়া

সেবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটা খুব সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়নি। উত্তেজনা-উন্মাদনার চেয়ে কৌতূহলটাই বরং বেশি।

ক্রিকেট নামে ঠিক কী ব্যাপার ঘটে? শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের নামে সার্কাস হয়ে উঠবে না তো!

তা সার্কাসীয় ব্যাপার-স্যাপার ছিল যথেষ্ট। বোল আউট নামের আইডিয়াটা তো ছিল চূড়ান্ত ক্লাউনীয় কারবার। স্কোর সমান হয়ে গেলে খোলা স্টাম্পে পাঁচটা পাঁচটা বল করে সই করার চেষ্টা করতে হবে, যেটা গ্রামের মার্বেল খেলারই একটা ধরন। মনে আছে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দেখে এক উত্তেজিত ক্রিকেটভক্ত ফোনে বলছিলেন, ‘এটা কোনো কথা হলো। ক্রিকেটকে এভাবে ওরা ধর্ষণ করবে? ফাজলামির একটা সীমা থাকা দরকার। ’ সেই তিনি সময়ের প্রবাহে এখন টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হলে চেয়ার ছেড়ে উঠতে চান না। বলেন, ‘সময়! সময়ের চাহিদার কাছে আমরা সবাই অসহায়। ’

সময়-টময় এসব হয়তো একটা ব্যাপার। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার ২০০৭ সালে ভারতের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। যেকোনো ক্রিকেটেই ভারত জিতলে হল্লা একটু বেশি হয়। বাজার-মিডিয়া মিলে হুলুস্থুল। তা সে যে ধরনের ক্রিকেটেই হোক না কেন, ১৯৮৩-র পর ভারতের প্রথম বিশ্বজয়। শুরু হলো ঢোল বাজানো। সেই ঢোলের সুর থেকে তৈরি হয়ে গেল আইসিএল। ভারতীয় বোর্ডের প্রবল বিরোধিতায় আইসিএল টিকতে পারল না। শেষ হয়ে গেল শুরু না হতেই। তার শারীরিক মৃত্যু ঘটল; কিন্তু আত্মাটা রয়ে গেল। সেই আত্মাই শরীরে ধারণ করে আজকের প্রবল প্রতাপান্বিত আইপিএল। এর ধ্বজা ধরেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট তরতর করে এমন চূড়ায় উঠছে যে ওয়ানডে আর টেস্টকে ভবিষ্যতে মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা লাগতে পারে।

ভারত তাই টি-টোয়েন্টির লালনভূমি। আর সেখানেই এর বিশ্ব আসর। লিখতে গিয়ে একটু অদ্ভুতই লাগছে। টি-টোয়েন্টির জন্মদাতা হয়তো তারা নয়; কিন্তু প্রতিপালনের কাজটা পরের সময়ে এত সযত্নে করেছে যে সেখানে বিশ্ব আসর আসতে এত বছর লাগাই বিস্ময়কর। ৯ বছর আর পাঁচটি প্রতিযোগিতা শেষে তার লালনক্ষেত্রে ফিরছে। এবারের টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসর এখানেই আলাদা যে আগের পাঁচটি আসর হয়েছে কোনো একটা দেশে, এবার হচ্ছে তার স্বর্গে। আগেরগুলো ছিল ভেন্যুমাত্র, এবারেরটা পূজার মন্দির।

টি-টোয়েন্টি আর ভারত একে অন্যের, সেটা আমরা জানি। দুটো যে কত একাকার, সেটা দেখারই সময় বোধ হয় আগামী এক মাস।

 

২.

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ পাতানোর ব্যাপারটা প্রথম সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল দিল্লি পুলিশের কাছে হানসি ক্রনিয়ের কথোপকথনের টেপ ধরার মধ্য দিয়ে। দিনটা খুব মনে আছে। তখন ঢাকায় বিশ্ব একাদশ বনাম এশিয়া একাদশ—এ রকম কোনো একটা ম্যাচ চলছিল, সেই উপলক্ষে তখনকার শেরাটন হোটেলে তারার মেলা। কে নেই! এদিক দিয়ে টেন্ডুলকার হেঁটে যাচ্ছেন তো ওখানে দাঁড়িয়ে মাইকেল বেভান কফি খাচ্ছেন। জয়াসুরিয়া-সৌরভরা আবার হয়তো ব্যস্ত ছবি ওঠানোর আবদার মেটাতে। এর মধ্যেই এলো খবরটা। বিশ্বাসভঙ্গের বেদনায় আমরা উপস্থিত সাংবাদিকরা এমন মুষড়ে পড়েছিলাম যে এতক্ষণের তারাভরা উজ্জ্বল আকাশটা যেন এক নিমেষে ভেঙে পড়ল। আর সেই আকাশ থেকে খসে পড়া তারকারা সব মহিমা হারিয়ে সন্দেহভাজন ঘুষখোর। এতক্ষণ রিপোর্ট সমৃদ্ধ করার স্বার্থে এর-ওর পেছন ছুটছিলাম। এখন ছোটা বাদ দিয়ে এক কোনায় স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম, পাশে সতীর্থ সাংবাদিকরা সব। কারো মুখে কথা নেই, শোকসভার মতো ছবি। এর মধ্যেই একজন স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, ‘ভাবা যায় দেশের সঙ্গে, পতাকার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে!’ প্রায় সবাই চুপ। মিনিটখানেক পর একজন মিনমিন করে বললেন, ‘আমার কাছে মনে হয় খেলোয়াড়রা আসলে ভবিষ্যতের কথা ভেবে এসব করে। ’

ঘুষ খাওয়া ভবিষ্যৎ ভাবনা দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা! ক্রুদ্ধ দেখায় সমাবেশের বাকিদের।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘খেলোয়াড়দের আয়-রোজগারের উৎসই হচ্ছে এ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। একটা ইনজুরিতে পড়লে, একটু অফ ফর্মে গেলেই ক্যারিয়ার প্রায় শেষ। জাতীয় দলের বাইরে যাওয়া মানে তো সেই অর্থে আর আয় নেই। তাই বোধ হয় এরা এভাবেও টাকা জমানোর চেষ্টা করে। পাঁচ ম্যাচের একটা সিরিজ, তিনটা ম্যাচ জিতে গেলে বাকি দুই ম্যাচ অর্থহীন হয়ে যায়। এমনিতেও হারতে পারে, মাঝখান দিয়ে কিছু টাকা নিয়ে নিলে মন্দ কী। ’

দেশপ্রেম, স্পোর্টিং স্পিরিট, শুদ্ধতা ইত্যাদি মিলিয়ে এমন প্রতিবাদ উঠল যে তাঁর কথাটা তলিয়ে গেল। তখন খুব ভাবিনি, পরে ঠাণ্ডা মাথায় মনে হয়েছে কথার মধ্যে এক ধরনের যুক্তি তো আছে। সত্যিই তো, আমরা যতই দেশ-দেশ বলে লাফাই, খেলোয়াড়দের কাছে তো এটা জীবন চালানোর জীবিকাও। সেই জীবিকার জায়গাটা নিশ্চিত করার মরিয়া চেষ্টায় কারো কারো পথচ্যুতি তো ঘটতেই পারে। ফুটবল বা বাস্কেটবল এ জাতীয় অন্য খেলাগুলোতে ক্লাব আর লিগ থেকেই হয় মূল উপার্জন। কাউন্টি বা কিছু দেশের লিগ ক্রিকেট থাকলেও সেগুলো এত অনুল্লেখযোগ্য আর আয় এত কম যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই সব। টাকাও ওখানে, মর্যাদাও ওখানে। ক্রিকেটারদেরও যদি দেশে দেশে এ রকম টাকা রোজগারের ব্যবস্থা থাকত তাহলে ম্যাচ পাতানোর হাত থেকে রক্ষা মিলত হয়তো। বাস্তবে ঘটনা ঘটেছে উল্টো। আইপিএল বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হওয়ার পর সেগুলোতে কাদা এত বেশি যে কোনো একটা ম্যাচকে বিশ্বাস করাই মুশকিল। বাজারি আয়োজনগুলো ক্রিকেটকে গিলে খেয়ে কলঙ্কের পোশাকই পরাচ্ছে বেশি। খুব সম্ভব, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আসতে আসতে জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ পাতানোতে অংশ নিয়ে অনেক ক্রিকেটারই নৈতিকতা প্রায় বিসর্জন দিয়ে বসেছেন। দেশের হয়েই যখন ম্যাচ ছেড়ে দেওয়া যায়, তখন এসব তুচ্ছ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ম্যাচ ছাড়লেই বা কী! আর এখানেই টি-টোয়েন্টির সমস্যাটা। টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা আর বিস্তার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের গাড়িতে চড়ে হয়েছে বলে ওই ক্রিকেটের যাবতীয় সমস্যার সঙ্গে টি-টোয়েন্টিকে গুলিয়ে ফেলা হয়। টি-টোয়েন্টি মানে আইপিএল-বিপিএল, আইপিএল-বিপিএল মানে ম্যাচ পাতানো, কাজেই টি-টোয়েন্টি মানেই পাতানো। আর ঠিক এখানেই সীমানা দড়ি হয়ে ক্রিকেটকে রক্ষায় ত্রাতা এই বিশ্ব টি-টোয়েন্টি। এর মাধ্যমেই প্রবলভাবে ঘোষিত হয় টি-টোয়েন্টি মানে শুধুই আইপিএল-বিপিএল আর ম্যাচ পাতানোর মচ্ছব নয়, টি-টোয়েন্টি মানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও। বৈশ্বিক মর্যাদার প্রশ্নও আছে এখানে।

ক্রিকেট আর দশটা খেলার চেয়ে এখানেই আলাদা যে এর প্রতিদ্বন্দ্বিতার চরিত্রটা আন্তর্জাতিক ম্যাচনির্ভর। আর কোনো খেলা এতটা আন্তর্জাতিকতামুখী নয়, যতটা ক্রিকেট। আর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের হাওয়ায় ভাসতে থাকা টি-টোয়েন্টিকে ক্রিকেটের আসল এবং আদি যে আন্তর্জাতিকতামুখী চরিত্র তাতে ফিরিয়ে আনে এই বিশ্ব টি-টোয়েন্টি। টুর্নামেন্টটার জমজমাট হওয়া তাহলে ক্রিকেট আর তার মূল চরিত্রের স্বার্থেই দরকার।

৩.

এশিয়া কাপ যে এবার টি-টোয়েন্টি হচ্ছে সেটা হাস্যকর একটা সিদ্ধান্ত। একটা মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা হঠাৎ করে এর ধরন আমূল বদলে ফেলবে সেটা মেনে নেওয়ার নয়। বাংলাদেশের ঘোর ক্রিকেট জাতীয়তাবাদী কেউ কেউ এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের আভাসও পান—বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে অতটা ভালো নয় বলে বাংলাদেশকে বেকায়দায় ফেলতেই...। একটা টিভি চ্যানেলে আলোচনায় গিয়ে এর টি-টোয়েন্টিতে রূপান্তরের সমালোচনা করছিলাম, দেখলাম উপস্থিত অন্যরা একে ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ হিসেবে ধরে নিয়ে আলোচনাটা অন্য খাতে নিয়ে গেলেন। বিষয়টাকে অত সরল করে ‘ভারতীয় তত্ত্বের’ দিকে নিয়ে যাওয়া মোটেও উচিত নয়, ভারত ওয়ানডেতেও দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু এই যে আমরা ধরে নিচ্ছি আমরা টি-টোয়েন্টি কম পারি এবং সে জন্য এটাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে যত বেশি সম্ভব ওয়ানডে খেলা উচিত, এ অঙ্কের মধ্যেও একটা ভ্রান্তি আছে। চিন্তার এ ভ্রান্তিটা আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় বড় একটা হুমকিও।

আমরা চাই এবং বিশ্বাস করি, ক্রিকেটের আগামী দশকটা হবে বাংলাদেশের। অনির্বচনীয় আবেগ, অফুরন্ত বিশ্বাস, অনিঃশেষ প্রতিভাবানদের আগমনী ধ্বনি মিলিয়ে ক্রিকেটের উর্বরভূমি হিসেবে এখন দুনিয়াতে বাংলাদেশই ১ নম্বর। আর সেসব ঠিকঠাকমতো চললে ৮-১০ বছরে বাংলাদেশের পৌঁছে যাওয়ার কথা শীর্ষ সিংহাসনে। মনে করা যাক, সব ঠিকমতো চলল তাহলেও কিন্তু আমরা শীর্ষে পৌঁছতে পারব না, যদি না টি-টোয়েন্টিতে আমাদের সক্ষমতা না বাড়ে।

ক্রিকেট যেভাবে চলছে আর এগোচ্ছে তাতে এটা মোটামুটি নিশ্চিত, দিন যত যাবে টি-টোয়েন্টির বৃত্ত তত বড় হবে। বাড়বে এর গুরুত্ব আর গৌরবের সীমানা। এখন ধরা যাক, ওয়ানডেতে আমরা উন্নতি করতেই থাকলাম, র্যাংকিংয়ে ওপরে উঠে এক-দুইয়ে পৌঁছে গেলাম; কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে রয়ে গেলাম এখনকার তিমিরেই তাহলে! কেন যেন মনে হয় ১০ বছর পরের বাস্তবতায় ওয়ানডের গুরুত্ব এখনকার মতো থাকবে না। ওয়ানডের মুকুট হয়ে যাবে ইতিহাসের সেই জমিদারের মুকুটের মতো রাজা-বাদশার আমলের পটভূমিতে তৈরি নাটকের সাজপোশাকে লাগে কিংবা ঢুকে পড়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গুদামঘরে। ছড়ি ঘোরাবে টি-টোয়েন্টি, শ্রেষ্ঠত্বের পাল্লা তৈরি হবে তারই হাতে।

লালনভূমি কিংবা প্রার্থনার মন্দিরে এবার আসর। হই-হুলুস্থুল হবে চরম। খুব ধামাকা একটা থিম সংও নিশ্চয়ই হবে। তার উঁচু লয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে দৃঢ়স্বরে একটা শপথবাক্য পাঠ করি—‘টি-টোয়েন্টিতেও সামর্থ্য বাড়াতেই হবে। ’ এটা যে এখন আর হুজুগের হাওয়া নয়, যুগের চাওয়া।

হুজুগের হাওয়া এড়িয়ে যুগের চাওয়ার সঙ্গে আসুন তাল মেলাই। নইলে জায়গা ইতিহাসভিত্তিক নাটকের সাজপোশাকে কিংবা প্রত্নতত্ত্বের গুদামঘরে।


মন্তব্য