kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘হার্ড হিটারের’ অভাব মেটাতে হবে ‘ক্লিন হিটার’ দিয়ে

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘হার্ড হিটারের’ অভাব মেটাতে হবে ‘ক্লিন হিটার’ দিয়ে

এশিয়া কাপের খেলা দেখা নিয়ে বেশ মুশকিলেই আছি। ঢাকায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় খেলা শুরু হওয়াটা অফিস ফিরতি মানুষের পক্ষে খুব আদর্শ।

কিন্তু বিশাল সময় পার্থক্যের কারণে আমার বর্তমান আবাস মেলবোর্নে খেলা শুরু হতে হতে পেরিয়ে যায় মধ্যরাত। তবু রাত সাড়ে ১২টায় শুরু হওয়া খেলা দেখার জন্য জেগে থাকার চেষ্টা করি। যদিও সারা দিন জীবন সংগ্রামের ধকল নেওয়ার পর শরীর আর কুলিয়ে উঠতে চায় না। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসতে চায়। এই যেমন বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচের অর্ধেক দেখার পর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টেরই পাইনি। বুঝতেই পারছেন আমার জন্য পরদিনের সকালটি অন্যরকম আনন্দের বার্তা নিয়েই এসেছিল। ঘুম থেকে উঠেই পেয়েছিলাম জয়ের সুসংবাদ। এরপর ম্যাচের না দেখা অংশের নানা খুঁটিনাটি জেনে নিতেও যেমন বিলম্ব করিনি, তেমনি স্টার স্পোর্টসে আবার দেখানোর সময় মিস করিনি বাংলাদেশের বোলিংয়ের অংশটিও।

দুই ভাগে পুরো ম্যাচটি দেখে নেওয়ার পর ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি সামনে রেখে আমি বাংলাদেশ দলকে নিয়ে আরো আশাবাদী হয়ে উঠতে শুরু করেছি। বিশ্ব আসরের আগে আমার চোখে অন্তত দলটির বদলে যাওয়ার চিহ্নগুলো ধরা পড়ছে। যদিও এশিয়া কাপ শুরুর আগেও টি-টোয়েন্টির বাংলাদেশ নিয়ে কাউকে খুব একটা উচ্চকিত হতে শুনিনি। কারণ এই ফরম্যাটে মাশরাফিদের তো কখনোই খুব একটা সুবিধার দল বলে ধরা হয়নি। আমি নিজেও যে এ ক্ষেত্রে ওদের সামর্থ্য নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলাম, তাও নয়। তাই বলে এমনও নয় যে টি-টোয়েন্টির বাংলাদেশকে নিয়ে সব ধরনের প্রচারণায় আমার সায় ছিল। অনেককেই এ রকম সরল ব্যাখ্যা দিয়ে বেরিয়ে যেতে শুনেছি যে এই ফরম্যাটে বাংলাদেশ নতুন দল বলেই নাকি পারফরম্যান্স ঠিক লাগসই হয়ে উঠছে না।

এই মতের সঙ্গে আমি কিছুতেই একমত নই। বরং আমি বলব, বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টির বেশ পুরনো দলই। সেই ২০০৭ সালে হওয়া প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই খেলে আসছে। এত আগে শুরু করেও এত দিনে দল হিসেবে দাঁড়াতে না পারার হরেক রকম ব্যাখ্যাই দেওয়া যায়। আমার মতে প্রধান কারণ হলো আমাদের ছেলেরা ফরম্যাটটি বুঝতে অনেক বেশি সময় নিয়েছে। যে কারণে এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিংবা অভ্যস্ত হতেও বেশ সময় লেগেছে। আর যত যাই বলুন, শেষ পর্যন্ত সাফল্য-ব্যর্থতার পুরোটাই নির্ভরশীল খেলোয়াড়দের ওপর। ওরা ভালো না খেললে আপনার কিছুই করার নেই। এত দিন ভালো খেলেনি বলেই এই দলটির টি-টোয়েন্টি সামর্থ্য নিয়ে আপনার মনে সংশয় ছিল। এখন নিশ্চয়ই এই ছেলেদের কারণেই আপনার মনে হচ্ছে যে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে বাংলাদেশ দলটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।  

আমি অবশ্য ক্রিকেটারদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করে যাওয়ার মতো নির্বোধ নই। অন্য ত্রুটি-বিচ্যুতিও তো কম ছিল না। একটু আগেই বলছিলাম, টি-টোয়েন্টির সেই প্রথম বিশ্ব আসর থেকেই আমরা খেলে আসছি। অর্থাৎ দল তৈরি করার জন্য যথেষ্ট সময়ও আমরা হাতে পেয়েছি। আমাকে বলুন তো এত দিনে আমরা কেন এই ফরম্যাটের জন্য উপযুক্ত কোনো হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান বের করে আনতে পারলাম না? বের করে আনার উদ্যোগই বা নিলাম না কেন? হার্দিক পান্ডের মতো একজন হার্ডহিটারও তো আমাদের নেই। সৌভাগ্যের কথা হলো, এখনকার বাংলাদেশ দলে তেমন কারো অভাবও আমি অনুভূত হতে দেখছি না। হার্ডহিটার হয়তো নেই, তবে ‘ক্লিন হিটার’ অনেকেই আছে। এই ধরুন, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাব্বির রহমান যে ইনিংসটি খেলেছে, সেটি খেলতে পারত আরো অনেকেই। সৌম্য সরকার কিংবা তামিম ইকবালের পক্ষেও ওরকম বিস্ফোরক ইনিংস খেলা খুবই সম্ভব। মুশফিকুর রহিমেরও ম্যাচের গতিবিধি বদলে দেওয়া ইনিংস খেলার সক্ষমতা আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। মাহমুদ উল্লাহ যেমন ধরে খেলতে জানে, তেমনি পারে মেরে খেলতেও। সাকিব আল হাসানের কথা আলাদা করে নাই-বা বললাম। আর এমন তো নয় যে সবার এক দিনেই ঝলসে উঠতে হবে। শ্রীলঙ্কা ম্যাচে সাব্বিরের মারদাঙ্গা ব্যাটিংই ম্যাচভাগ্য বদলে দিয়েছিল। একেক ম্যাচে একেকজনের এ রকম ব্যাটিং করার নিয়মটি চালু হোক না। দেখবেন ওয়ানডের মতো টি-টোয়েন্টিতেও দৌড়াতে শুরু করবে বাংলাদেশ দল।

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন বলার উপায় নেই যে বাংলাদেশ এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলছে কি না। তবে এই আসরে যতটুকুই দেখেছি, ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে মাশরাফির দলকে বহুদূর যেতে দেখার আশায়ই বুক বেঁধে আছি। এর আগে বাংলাদেশ কেন এই ফরম্যাটে ভালো করতে পারেনি, সেটিরও ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। এতে অভ্যস্ত হতে খেলোয়াড়দের অনেক বেশি সময় নিয়ে ফেলার কথা বলছিলাম। তবে প্রশাসনিক দায়ও নেহাত কম নয়। খেয়াল করে দেখুন আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি নিয়মিত নয়। নিয়মিত নয় বলেই টেস্ট আর ওয়ানডের ফাঁকে হঠাৎ হঠাৎ টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমে খেই হারিয়ে ফেলত ছেলেরা। মাঝখানে দুটি বছর আবার বিপিএলও (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ) হয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটে আগের দুই বছর টি-টোয়েন্টি না হওয়ার ধাক্কাও দল হিসেবে দাঁড়াতে দেয়নি বাংলাদেশকে।

এও বলব না যে বিপিএল থ্রির পরই রাতারাতি বদলে যাচ্ছে দলটি। নীরবে আরেকটি ব্যাপারও দলকে এগিয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে। ক্রিকেটে সফল হতে গেলে চারটি ডিপার্টমেন্টেই জুতসই হওয়া চাই। ভুল পড়ছেন না, চারটিই। ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিংয়ের বাইরে চতুর্থ ডিপার্টমেন্ট হচ্ছে ফিটনেস। আর ছেলেদের ভালো ফিটনেসের প্রভাব দলের ফিল্ডিংয়ে পড়বেই। পড়ছে বাংলাদেশ দলের ফিল্ডিংয়েও। হ্যাঁ কিছু ক্যাচ পড়েছে এশিয়া কাপে। আবার এমন দুর্দান্ত কিছু ক্যাচও তো ছেলেরা নিয়েছে, যেগুলো নেওয়ার কথা কিছুদিন আগেও আমি-আপনি কল্পনা করতে পারিনি। দলের ইনফিল্ড ও আউট ফিল্ডের ফিল্ডিংও দারুণ হচ্ছে। রানিং বিটুইন দ্য উইকেটের ক্ষেত্রেও ছেলেদের দারুণ ফিটনেসের কারণে সঞ্চারিত হওয়া ক্ষিপ্রতা লক্ষ করছি।

দেখুন ফিটনেসে উন্নতি হওয়ার ফলে দলটিকে এখন কত চনমনে এবং চাঙাও দেখাচ্ছে। সাব্বিরকে তিন নম্বরে উঠিয়ে আনার কৌশলগত পরিকল্পনাও খুব কাজে দিয়েছে। যা ওকে বেশি বল খেলারও সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে আরেকটি বিষয় ঠিক মানতে পারছি না, মুশফিক যখন একাদশে আছেই, তখন ওকে ফিল্ডিংয়ে রেখে আরেকজন বিশেষজ্ঞ উইকেটরক্ষক খেলানোর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। মুশফিককে কিপিংয়ে ফিরিয়ে একজন অলরাউন্ডার বা বাড়তি একজন ব্যাটসম্যান খেলালেই বরং দলটিকে আরো জমাট দেখাবে বলে আমার বিশ্বাস। আর এমনও তো নয় যে ব্যাটিং কার্যকারিতায় নুরুল হাসানের চেয়ে এগিয়ে থাকা কেউ স্কোয়াডে নেই! বিভিন্ন কোচিং সেমিনারে যাওয়ার সুবাদে টি-টোয়েন্টি নিয়ে গবেষণার একটি ফলও আপনাদের জানাতে চাই। সাধারণ ধারণা যে প্রথম ৬ ওভার এবং শেষ ৪ ওভারই এই ফরম্যাটের ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। শত শত ম্যাচের গবেষণায় দেখা গেছে ১৩-১৬, এই ৪ ওভারই ম্যাচের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। শ্রীলঙ্কা ম্যাচের ওই চারটি ওভার খেয়াল করুন। রান আটকে ও উইকেট ফেলে ওই সময়েই ম্যাচটি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির আগে আরেকটি ব্যাপারও খুব আশা দিচ্ছে আমাকে। লম্বা সময় ধরে স্পিন নির্ভর দল হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে আসা বাংলাদেশকে এখন পেসাররাও ম্যাচ জেতাচ্ছে। আশা করছি, ইনজুরির কারণে এশিয়া কাপ থেকে ছিটকে গেলেও পেস আক্রমণের মধ্যমণি হয়ে যাওয়া মুস্তাফিজুর রহমানকে বিশ্বকাপে ঠিক পাওয়া যাবে।

অনুলিখন : মাসুদ পারভেজ


মন্তব্য