পতাকা ওড়াবে বোলাররাই-331824 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


পতাকা ওড়াবে বোলাররাই

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পতাকা ওড়াবে বোলাররাই

 

আমাদের কথা তো কেউ ভাবেন না। আমাদের, মানে বোলারদের। আইসিসির প্রায় সব নিয়ম ব্যাটসম্যানদের পক্ষে, দর্শকরাও চার-ছক্কায় আনন্দ পায় বেশি। এ নিয়ে এখন আর আক্ষেপও করি না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ যেসব জয় পেয়েছে, সেগুলো একটু বিশ্লেষণ করে দেখুন তো! তাতে ব্যাটসম্যানদের চেয়ে বোলারদের অবদান কোনো অংশে কম নয়, হয়তো বা বেশিই!

আসছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবেন বোলাররা, আমার সেই বিশ্বাসে খাঁদ নেই কোনো।

আমাদের এখনকার বোলিং লাইন দুর্দান্ত। এটি অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। কিন্তু তবু আমার মনের ভেতর বাঁ-হাতি স্পিনারদের জন্য একটু খুঁত-খুঁতানি রয়ে গেছে। আমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময়ই তো বাংলাদেশ ছিল বাঁ-হাতি স্পিনারদের দল। এখন হয়ে গেছে পেসারদের দল। এখন পেসাররা খুব ভালো করছে সত্যি। কিন্তু আমি বাঁ-হাতি স্পিনকে সব সময় আলাদা দাম দিই। বিশ্বের যেকোনো ব্যাটসম্যানকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তাঁরা বাঁ-হাতি স্পিনারদের মূল্যায়ন করেন আলাদাভাবে। আর টি-টোয়েন্টিতে তো ওরা হতে পারে তুরুপের তাস। কিন্তু সময়ের স্রোতে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের ধরনটাই এখন গেছে বদলে।

এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আক্ষেপ রয়েছে সত্যি। আবার একই সঙ্গে এটি অস্বীকারের উপায়ও নেই, গত এক-দেড় বছরে এই পেসাররা খেলেছে দারুণ। দলকে এনে দিয়েছে অনেক অনেক জয়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাই টিম ম্যানেজমেন্ট পেসারদের ওপর বাজি ধরেছে।

আমাদের পেস বোলিং ভাণ্ডারে নতুন সংযোজন মুস্তাফিজুর রহমান। ওকে আমি ওকে বলব অমূল্য রতন। একেবারেই ভিন্ন ধরনের বোলার। ওর ‘কাটার’ সামলানো বিশ্বের সেরা সব ব্যাটসম্যানের জন্যও কঠিন। ভারতের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের শুরুতে মুস্তাফিজের অমন চোখ ধাঁধানো শুরু অনেকে ভেবেছিলেন ‘ফ্লুক’। কিন্তু পরের সিরিজগুলোয় তাদের ভুল প্রমাণ করেছে ও। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও মুস্তাফিজ-চমক অব্যাহত থাকবে বলে আমার আশা। তবে এখানে আমি সবাইকে একটি অনুরোধ করতে চাই। মুস্তাফিজ কিন্তু সব সময় ভালো করবে না। খারাপ দিন আসবেই আসবে। তখন যেন টিম ম্যানেজমেন্ট, সমর্থক, মিডিয়া মিলে ওকে চাপ না দেয়। কারণ ওর মতো প্রতিভাবান বোলারকে সবার যত্ন নিয়ে আগলে রাখা উচিত।

পেসারদের মধ্যে অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাফিজ। তবে আল-আমিন হোসেনের পারফরম্যান্সও বিশ্বকাপে খুব করে চাইবে বাংলাদেশ। কারণ ও উইকেট নিতে পারে, দিতে পারে ব্রেক থ্রু। আর টি-টোয়েন্টিতে রান আটকানোর জন্য উইকেট নেওয়ার চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে! হ্যাঁ, আল-আমিনের বলে হয়তো একটি-দুটি চার-ছয় হতে পারে; কিন্তু সময়মতো উইকেট থ্রুতে সেটি পুষিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য ছেলেটির রয়েছে।

একই কথা বলা যায় তাসকিন আহমেদ সম্পর্কেও। কী চমত্কার রানআপ, কী দারুণ বোলিং অ্যাকশন! বলে গতিও আছে বেশ। এশিয়া কাপে দেখলাম, ঘণ্টায় ১৪৬-১৪৭ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করছে। তবে টি-টোয়েন্টিতে গতির পাশাপাশি বুদ্ধিটাও জরুরি। সেই বুদ্ধি দিয়ে যদি তাসকিন বোলিং করতে পারে, তাহলে অনেক উইকেট ও পাবে।

মাশরাফির কথা আর কী বলব! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অলিগলি ওর চেনা। সব ব্যাটসম্যানের নাড়ি-নক্ষত্র মুখস্থ। নতুন কোনো ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বোলিং করলেও এক-দুই বল করে বুঝে যায় শক্তি-দুর্বলতা। এটাই অভিজ্ঞতা। মাশরাফির বলের গতি হয়তো ভীতি ছড়াবে না প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের মনে। তবে নিখুঁত লাইন-লেন্থ ঝামেলায় ফেলবে নিঃসন্দেহে। আর উইকেট নেওয়ার জন্য অফ-কাট তো রয়েছেই। আমি নিশ্চিত, শুধু অধিনায়ক মাশরাফি না, বোলার মাশরাফিও বিশ্বকাপে বড় অবদান রাখবে।

পেসারদের মধ্যে আরো রয়েছে আবু হায়দার। ওই চার পেসারকে টপকে একাদশে ওর খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ছেলেটি বিপিএলে ভালো করেছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট একেবারে ভিন্ন জগৎ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাত্র দুটি টি-টোয়েন্টি খেলেছে ও। বিশ্বকাপে দলের প্রয়োজন হলে আবু হায়দারও ভালো করতে পারে।

স্পিনারদের মধ্যে সাকিব আল হাসানের কথাই তো আসে সবার আগে। ওর কাছে আমার প্রত্যাশাও বেশি। কেন? সে ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই দিতে হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ দাবড়ে বেড়াচ্ছে। আইপিএলে নিয়মিত খেলার সূত্রে ভারতের উইকেট ওর কাছে হাতের তালুর মতো চেনা। আমি তাই বিশ্বকাপে সাকিবের কাছ থেকে দারুণ কিছুর আশা করছি।

আরেক যে বাঁ-হাতি স্পিনার আরাফাত সানি, ও-ও পরীক্ষিত। কিন্তু কম্বিনেশনের কারণে একাদশে খেলতে পারছে না। তবে অভিজ্ঞতার ঘাটতি নেই। একাদশে ঢুকে গেলে সানিও ভালোই খেলবে। বাঁ-হাতি স্পিনারদের প্রতি আমার বিশ্বাসের পক্ষপাতের কারণেও অমনটা বলছি।

এর বাইরে পার্ট-টাইম বোলারদের মধ্যে আছে নাসির হোসেন, মাহমুদ উল্লাহ। নাসিরকে অবশ্য আর পার্ট-টাইমার বলা ঠিক না। ও এখন পুরোদস্তুর বোলার। টি-টোয়েন্টিতে চার ওভার করে দিতে পারে। মাহমুদের অফ স্পিনও অধিনায়ক চাইলে কাজে লাগাতে পারবে। তবে সৌম্য ওর মিডিয়াম পেস বোলিংটা এখন আর অনুশীলন করে কি না, জানি না। চার পেসারের বাইরে ওকে যদিও হয়তো খুব একটা প্রয়োজন পড়বে না। তবু প্রস্তুত থাকলে মন্দ কী!

এখানে আমি আরেকটি কথা বলতে চাই। ভারতের উইকেটে সব ম্যাচে চার পেসার খেলানো যাবে কি না, নিশ্চিত নই। তখনই আরাফাত সানি হিসাবে চলে আসবে। পার্ট-টাইমারদের ওপর নির্ভর করতে হবে মাশরাফিকে। চাই কী সৌম্যকেও হাত ঘোরাতে হতে পারে। আর দলের পাঁচ-ছয় বোলারের মধ্যে সবাই কিন্তু সব ম্যাচে ভালো করবে না। এক-দুজন টার্গেটে পড়েই যায়। তখন অন্যদের দায়িত্ব আরো ভালো খেলার। যেন সতীর্থর বাজে দিনের মূল্য দলকে দিতে না হয়।

নিজের ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বললে, ভারতের এই বিশ্বকাপ আমার কাছে বড় আক্ষেপের। কারণ এর আগে যে চারটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলেছে, সবগুলোতেই আমি ছিলাম। নেই এই প্রথম। দল যখন ভারতে খেলবে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আসরগুলোর কথা আমার মনে পড়বে খুব।

আগের চার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অবশ্য বাংলাদেশের মনে রাখার মতো পারফরম্যান্স খুব বেশি নেই। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয়ই হয়তো শুধু আলাদা উল্লেখের দাবিদার। এবার আশা করব, মনে রাখার মতো অনেক ম্যাচ উপহার দেবে বাংলাদেশ। বাছাই পর্বের কথা আমি ভাবছিই না। নেদারল্যান্ডস-আয়ারল্যান্ড-ওমান আমাদের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না। আমি বরং দৃষ্টিটা প্রসারিত করতে চাই আরো দূরে।

যদিও ফরম্যাটটা টি-টোয়েন্টি বলে জোর দিয়ে কিছু বলার উপায় নেই। আবার এই অনিশ্চয়তার কারণেই কি বাংলাদেশের অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে না!

মন্তব্য