ব্যাটসম্যানদের ভেতরের বারুদটা দেখতে-331822 | বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ২০১৬ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


ব্যাটসম্যানদের ভেতরের বারুদটা দেখতে পাচ্ছি

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাটসম্যানদের ভেতরের বারুদটা দেখতে পাচ্ছি

টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের খেলা। সবাই জানে, সবাই মানে। তা এশিয়া কাপের প্রথম দুই ম্যাচে ব্যর্থ যখন বাংলাদেশের ওই ব্যাটসম্যানরা, হতাশ রয়েছেন অনেকে। আমি কিন্তু সে দলের নই। কারণ জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানের ভেতরের বারুদটা আমি খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। সেই বারুদে বিস্ফোরণ হওয়ার অপেক্ষা কেবল।

ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ঠিকই ধ্বংসের গান গাইবে তাদের ব্যাট—এই বিশ্বাস আমার রয়েছে। প্রবলভাবেই রয়েছে।

এশিয়া কাপে যে ধরনের উইকেটে খেলা হয়েছে, তা একটু চমক জাগানিয়া। এমন ২২ গজ তো সচরাচর আমরা বাংলাদেশে দেখি না। ঘাস আছে, পেস আছে, বাউন্স আছে। যে কারণে ব্যাটসম্যানদের সমস্যা হয়েছে বেশ। তবে বিশ্বকাপের উইকেট এমন হওয়ার কথা নয়। আইসিসি নিশ্চয়ই চাইবে না, বিশ্বের সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি আসরে বোলাররা ছড়ি ঘোরাক। যে কারণে ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভালো করার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে আরো।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য যে দলটি গড়া হয়েছে, সেটি সম্ভাব্য সেরা। এ নিয়ে খুব দ্বিমত নেই কারো। এশিয়া কাপেও তো একই দল খেলছে। কেবল টুর্নামেন্টের শুরুটা মিস করেছে তামিম ইকবাল। শেষ দিকে ও ফেরায় বাংলাদেশের ব্যাটিংও ফিরেছে পূর্ণ শক্তিতে।

তবে ব্যাটিং অর্ডার যে যথাযথ ছিল, আমার তা মনে হয় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বোধ করি একটু বেশিই হয়েছে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সেরা ব্যাটসম্যানদের সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ওভার খেলার সুযোগ দিতে হয়। ওয়ানডের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য, টি-টোয়েন্টিতে তো অবশ্যই পালনীয়। অথচ সাকিব আল হাসানের মতো পরীক্ষিত পারফরমারকে আমরা ঠেলে দিচ্ছি ব্যাটিং অর্ডারের নিচের দিকে। নিজের ব্যক্তিগত মত দিতে পারি, ব্যাপারটি আমার একদম পছন্দ হয়নি। হ্যাঁ, তিনে নেমে সাব্বির রহমান ভালো করছেন। তা ও তিনে খেলুক না। সাকিবকে তো চারে নামানো যায়। এরপর মুশফিকুর রহিম, মাহমুদ উল্লাহ। ব্যাটিং অর্ডার এভাবে সাজানো হলে বাংলাদেশের বড় স্কোর করার সম্ভাবনাও বাড়বে আনুপাতিক হারে। তাতে জয়ের সম্ভাবনাও বাড়বে সমান্তরালে।

এবার সব ব্যাটসম্যানকে নিয়ে একটু আলাদা আলাদা করে বলি। শুরুতে তামিম। ওকে নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের ইনিংসের ছন্দটা ঠিক করে দিচ্ছে তামিমের ব্যাট। ইদানীং অবশ্য শুধু বিস্ফোরক ভূমিকায়ই দেখা যায় না ওকে, দলের প্রয়োজন ধরেও খেলে। আমি অবশ্য চাইব, বিশ্বকাপে তামিম ওর সহজাত বিধ্বংসী ব্যাটিং করুক। তাতে সব ম্যাচে সফল হবে না সত্যি। কিন্তু যেদিন ও সফল হবে, সেদিন বাংলাদেশ জয়ের পথে এগিয়ে যাবে অনেকটা।

 

তামিমের ওপেনিং সঙ্গী হিসেবে সৌম্য সরকার নিঃসন্দেহে প্রথম পছন্দ। তবে ওর ইদানীংকার পারফরমেন্সে আমি খানিক হতাশ। সামর্থ্য অনুযায়ী ছেলেটি ব্যাটিং করতে পারছে না। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়ানডেতে কী দারুণ সেঞ্চুরি করল! এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের শেষ দুটি ম্যাচে কী অবিশ্বাস্য ব্যাটিং! সেই সৌম্যকে ইদানীং কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়। যেন থই খুঁজে পাচ্ছে না। টিম ম্যানেজমেন্টের উচিত ওকে ফ্রি লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া। তাহলে যদি ওর কাছ থেকে সেরাটা পাওয়া যায়!

সাব্বির রহমানেরও ওই ফ্রি লাইসেন্স থাকা উচিত। এমন ক্রিকেটারদের কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে সেরাটা পাওয়া যায় না। এমনিতে তিন নম্বর পজিশন ব্যাটিং অর্ডারে গুরুত্বপূর্ণ খুব। টি-টোয়েন্টিতে আরো বেশি করে। আর সাকিবের জায়গা নিয়েছে বলে সাব্বিরের ওপর চাপ তাই ছিলই। কিন্তু ওর ব্যাটিং দেখে সেটি কে বলবে! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এশিয়া কাপের ডাকাবুকো ইনিংসেই বোঝা যায় ওর সামর্থ্য। বিশ্বকাপে যদি এই সাব্বিরকে দেখা যায়, তাহলে অন্য ব্যাটসম্যানদের জন্য কাজটি অনেক সহজ হয়ে যাবে।

সাকিব-মুশফিকের ব্যাপারও তামিমের মতো। নতুন করে বলার কিছু নেই। এত বছর ধরে জাতীয় দলে খেলছে। অনেক পরিণত ওরা। অনেক অভিজ্ঞ। দল ওদের কাছ থেকে কী চায়, সেটি ভালোভাবে জানা। আমি শুধু বলব, ওদের মধ্যে একজন যেন সব সময় ইনিংসের শেষ পর্যন্ত থাকার চেষ্টা করে। তাহলে আগে ব্যাটিং করলে বাংলাদেশের রান অনেক বাড়বে, পরে ব্যাটিং করলে বাড়বে জয়ের সম্ভাবনা।

মাহমুদ উল্লাহর টি-টোয়েন্টি উপযোগিতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু একাদশে ওর জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টপ অর্ডার যদি ধসে যায়, তাহলে। লোয়ার অর্ডার নিয়ে লড়াইয়ের সামর্থ্য মাহমুদের রয়েছে। একাদশে আসলে প্রত্যেকের আলাদা দায়িত্ব। সেটি ভালোভাবে বুঝতে হবে। কারো কাছ থেকে টিম ম্যানেজমেন্ট চায় ২০ বলে ৪০ রান, কারো কাছ থেকে ৩০ বলে ৪০। মাহমুদ ওর নিজের ভূমিকাটা বুঝে টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদান দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

এরাই তো আমাদের মূল ব্যাটসম্যান। এর বাইরে নুরুল হাসান আসতে পারে একাদশে। এই ছেলেটি বিশেষত টি-টোয়েন্টির সাত নম্বরে খুব কার্যকর ব্যাটসম্যান হতে পারে। ওর খেলার ধরন ভিন্ন। বাংলাদেশের ব্যাটিং প্যাকেজে নুরুল বৈচিত্র্য আনবে। আরো আছে নাসির হোসেন। ইদানীং বোলিংয়ে ও বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে একটা সময় যে নাসিরের নাম ‘ফিনিশার’ হয়েছিল, সেটি তো শুধু শুধু নয়। একাদশে সুযোগ পেলে নাসির বিশ্বকাপের এক-দুই ম্যাচ জেতালে আমি অবাক হবো না। আর থাকে মোহাম্মদ মিঠুন। এমনিতে হয়তো একাদশে থাকবে না। তবে সুযোগ পেলে ভালো কিছু করার সামর্থ্য ওরও রয়েছে।

২০০৬ সালে প্রথম যে টি-টোয়েন্টি বাংলাদেশ খেলে, আমি ছিলাম সেই দলটির অধিনায়ক। এরপর ১০ বছর পেরিয়েছে প্রায়। কিন্তু এই ফরম্যাটে প্রত্যাশানুযায়ী এগোতে পারিনি আমরা। অনেকে ভেবেছিলেন, ছোট ফরম্যাট বলে বাংলাদেশের ভালো করার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু কেউ চিন্তা করেননি, এই ফরম্যাটটাই সবচেয়ে কঠিন। একবার ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়লে আবার ফেরাটা এখানে কঠিন।

আরেকটি ব্যাপার হলো, আমাদের ব্যাটিং লাইনে কখনোই ক্রিস গেইল, এবি ডি ভিলিয়ার্স বা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলরা আসেননি। এখনো নেই। এই বিশ্বকাপেও ভালো কিছু করতে হলে সবাইকে মিলে করতে হবে। আলাদা করে একটি-দুটি ভালো পারফরমেন্সে কাজের কাজ হবে বলে মনে হয় না।

আর আগে তো আরেকটি সমস্যা ছিল—এই ফরম্যাটে খুব বেশি খেলত না বাংলাদেশ। এবার বিপিএল হলো, এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ, তারপর এশিয়া কাপ। প্রস্তুতির ঘাটতির দোহাই দেওয়ার উপায় নেই।

আমি অবশ্য আশা করছি, দোহাই দেওয়ার উপলক্ষটাই থাকবে না। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত কিছুই করবে এবার বাংলাদেশ।

মন্তব্য