• ই-পেপার

বিএনপির ফেসবুক পেজ হ্যাক করা হয়েছে

ইতিহাস কোনো নির্বাচনী স্লোগান নয়

অনলাইন ডেস্ক
ইতিহাস কোনো নির্বাচনী স্লোগান নয়

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম এখন আর শুধু ইতিহাসের বইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রতিফলন ঘটছে সংসদে, রাজনৈতিক সমাবেশে, টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ও সমাজমাধ্যমে। ১৯৭১ সালের অনেক পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছে এ লড়াই এখন আর স্বাধীনতার জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিক সত্যের জন্য। এ কারণেই শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির বিষয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক অঙ্গীকারটি নিছক একটি প্রশাসনিক উদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি সংরক্ষণের একটি প্রয়াস।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন যে স্বাধীনতার পর প্রকৃত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যাঁরা লড়াই করেছেন তাঁদের একটি যাচাইকৃত তালিকা তৈরির সরকারি অঙ্গীকার তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রতিটি জাতি তার বীরদের একটি নির্ভুল বিবরণ দিতে দায়বদ্ধ। যখন ইতিহাসকে রাজনীতিকরণ করা হয় তখন সত্যই তার প্রথম শিকার হয়। এ উদ্যোগটির কাল তাৎপর্যপূর্ণ। গত দুই বছরে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার বারবার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন যে, জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল না। বরং যে পরিস্থিতিতে এটি অর্জিত হয়েছিল তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল।

তিনি আরও বলেন, একটি অবিভক্ত পাকিস্তানের জন্য জামায়াতের অবস্থান ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানের মতোই!

অতি সম্প্রতি জামায়াত আমির উল্লেখ করেন যে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার থেকে এসেছেন। অন্যদিকে চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমির বিল্লাল হোসেন মিয়াজী ঘোষণা করেন, ‘আমাদের সন্দেহের চোখে দেখবেন না। আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা সমর্থক ছিলাম।’ ব্যক্তিদের শুধু তাদের পারিবারিক পটভূমি বা ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস দিয়ে বিচার করতে হবে। এখানেই জামায়াতের সমালোচকরা যুক্তি দেন যে ১৯৭১ সালে দলটি তার ভূমিকার বিষয়ে এখনো পুরোপুরি জবাবদিহি করেনি। ঐতিহাসিক বিবরণ সুস্পষ্ট। একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল। একটি অবিভক্ত পাকিস্তান বজায় রাখার পক্ষে ছিল। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদও, আলশামসের মতো সংগঠনের মাধ্যমে অসংখ্য নেতা ও কর্মী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা করেছিলেন। এ সহায়ক শক্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত কিছু ভয়াবহতম নৃশংসতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যার মধ্যে ছিল বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্য করে হত্যা, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা, ধর্ষণ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার জন্য জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামী, মহাসচিব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এ দণ্ডাদেশগুলো ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বিষয়টি সমাধান করলেও এগুলো ১৯৭১ সালে দলের নেতৃত্বের একাংশের ভূমিকাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বিবরণকে আরও শক্তিশালী করেছে। সংসদ সম্প্রতি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস করার মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক বোঝাপড়াকেই পুনর্নিশ্চিত করেছে; যা তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটিকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে চলেছে। জামায়াত এই বিধানের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমদসহ বিএনপি নেতারা পৃথকভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো বিবর্তিত হতে পারে। গণতন্ত্রে আদর্শগত রূপান্তর এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু প্রকৃত মীমাংসা সততার মাধ্যমেই শুরু হয়। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজই তার অতীতের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলো নতুন করে লিখে নিজেকে শক্তিশালী করে না। ঐতিহাসিক জবাবদিহিতা মানে চিরস্থায়ী শাস্তি নয়; এর অর্থ হলো নথিভুক্ত সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া। এ বিষয়টি বিশেষ করে তরুণ বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকের অধিকাংশ ভোটারই ১৯৭১ সালের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেননি। তাদের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নীতি, যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রূপকল্পের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা। তবু সচেতন গণতান্ত্রিক পছন্দের জন্য এও বোঝা প্রয়োজন যে দলগুলো তাদের নিজেদের ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করে। যে রাজনৈতিক সংগঠন সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য স্বীকার করতে সংগ্রাম কওে, তা অনিবার্যভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি তার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

সুতরাং শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রশাসনিক নির্ভুলতার চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে এবং নিশ্চিত করবে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক আখ্যানের পরিবর্তে প্রকৃত সত্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে। সুতরাং শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা কেবল প্রশাসনিক নির্ভুলতার চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি থেকে রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বয়ানের পরিবর্তে প্রকৃত সত্য পায়, তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। যে প্রজন্ম স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল, তারা ধীরে ধীরে মশাল হস্তান্তর করছে। ১৯৭১ সালের সত্য রক্ষা করার দায়িত্ব এখন ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের ওপরই বর্তাচ্ছে, যারা সেই সময়ের সাক্ষী ছিল না। বাংলাদেশিরা ক্ষমা, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক নবায়নে বিশ্বাস রাখতে পারে। কিন্তু সেই মূল্যবোধগুলো ঐতিহাসিক সত্যের বিনিময়ে আসতে পারে না। যতক্ষণ না জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করছে এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই ইতিহাসের মুখোমুখি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বহু বাংলাদেশি এ প্রশ্ন তুলতেই থাকবে যে দলটি তাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে কি না?

কিশোর-তরুণদের হত্যার পর শেখ হাসিনার ক্ষমা নেই : রিজভী

অনলাইন ডেস্ক
কিশোর-তরুণদের হত্যার পর শেখ হাসিনার ক্ষমা নেই : রিজভী

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, শিশু, কিশোর ও তরুণ হত্যার পর শেখ হাসিনার ক্ষমা নেই। যে রক্তপাত হয়েছে, তার পর শেখ হাসিনার আবার দেশে ফিরে রাজনীতি করার সুযোগ থাকতে পারে না। 

আজ শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ‘১৭ জুলাই যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় নানা চাপ ও হুমকি থাকা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া দেশ ছাড়েননি। অথচ ওই সময় শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলেও তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তবে কোনো অন্যায় চাপের কাছে তিনি মাথানত করেননি।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি ফিরে এসে রাজনীতি করতে চান, তাহলে ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের যে উত্তরাসূরি রাজনীতি তাদের তো আনতে হবে। টিক্কা খান ও ইয়াহিয়া খানকে মানুষ রক্তপিপাসু বলে জানত, শেখ হাসিনা তাদের চেয়ে কম কী করেছেন? শেখ হাসিনা যে কি নিষ্ঠুর হতে পারে, তা কারাগারে নেতাদের ওপর হাত তোলা না দেখলে বোঝা যাবে না।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, হাসিনা এদেশের মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে। তার বাবাও একই কাজ করেছে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন হবে কিভাবে? ফ্যাসিস্ট দলকে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাদের রক্তের মধ্যে ফ্যাসিবাদ ও ভয়ংকর রক্তপিপাসুতা। তাহলে রাজনীতিতে কিভাবে ফিরে আসা সম্ভব? হিটলারের দল ফিরে আসতে পারেনি।

রিজভী বলেন, ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে মানুষের প্রতিরোধের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রতিরোধ এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার প্রতিরোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনেও মানুষ অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে পুলিশ তল্লাশি চালানোর খবর পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং ছাত্রদের কর্মসূচিতে বিএনপির সমর্থনের কথা জানান।

রিজভী বলেন, ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, রায়েরবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় গুলিতে বহু মানুষ নিহত হন। 

মাদক নির্মূল করতে প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান চরমোনাই পীরের

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
মাদক নির্মূল করতে প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান চরমোনাই পীরের
শুক্রবার বিকালে চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে মাদকবিরোধী আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দিচ্ছেন চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেছেন, ‘মাদক সরবরাহের সঙ্গে দেশের অনেক রথি-মহারথিদের সংযোগ থাকে। শর্ষের মধ্যে ভূত থাকে। তাই মাদকের সরবরাহ লাইন নির্মূল করতে সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে একক দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

আজ শুক্রবার বিকালে চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে মাদকবিরোধী আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। চরমোনাই ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ ব্যানারে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

তিনি আরো বলেন, দেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে জনশক্তি রপ্তানি ও দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করা যেত। অতীতের কোনো সরকারই এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি, বরং উদ্বৃত্ত জনশক্তিকে নষ্ট করতে মাদককে প্রশ্রয় দিয়েছে। ফলে আমাদের জনসম্পদ নিষ্ক্রিয় হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধ্বংস হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক ক্ষতির বিবেচনায় দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা মাদক। জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, মাদক প্রতিরোধ করা। চাহিদা ও জোগান উভয় দিক নির্মূল করতে হবে।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসিবে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলনের জেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, সহকারী মহাসচিব মাওলানা সৈয়দ এসহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের, বরিশাল মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মুহাম্মাদ বেলাল হুসাইন ও কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম।

‘পরীক্ষিত বন্ধু’, রক্তাক্ত ইতিহাস ও সুবিধাবাদের রাজনীতি

বিশেষ প্রতিনিধি
‘পরীক্ষিত বন্ধু’, রক্তাক্ত ইতিহাস ও সুবিধাবাদের রাজনীতি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের ‌‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এতে করে পুরোনো একটি বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।

কূটনৈতিক সৌজন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব উদযাপনেও অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে ১৯৭১ সালের সেই চূড়ান্ত সময়ের কথা উল্লেখ না করে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি তৈরি করে।

মন্তব্যটি এসেছে এমন একটি দলের নেতার কাছ থেকে, যাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এখনও দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

জামায়াতে ইসলামী যখন স্থায়ী বন্ধুত্বের ভাষা ব্যবহার করে, অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেদের এবং ওয়াশিংটনের ভূমিকা-উভয় বিষয়েই নীরব থাকে, তখন তা ইতিহাসের প্রতি ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

তবে এই অনুষ্ঠানটি নিয়েই বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবী মহল সমালোচনা করেন। তাদের মতে, দেশের সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে এমন একটি আয়োজন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়কে উপেক্ষা করেছে। তারা এ ঘটনাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব’ নিয়েও বৃহত্তর উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করেন।

একই প্রেক্ষাপটে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তিরও সমালোচনা করেন। তারা বলেন, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের পরিপন্থী। এসব সমালোচনার সঙ্গে কেউ একমত হোন বা না হোন, এগুলো এমন এক ঐতিহাসিক দগদগে স্মৃতিকে আবারও সামনে আনে যা জাতিগত চেতনায় গভীরভাবে গেঁথে আছে।

ইতিহাসবিদদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিক্সন প্রশাসনের নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় নৈতিক ব্যর্থতাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন। স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত দিক এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক নৃশংসতার স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়ে যেতে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থার ভেতর থেকেই এর বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা হয়েছিল, যা এই ঘটনাকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড আমেরিকার কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সাহসী কাজ করেন।

পরবর্তীকালে বহুল আলোচিত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’, যেখানে প্রায় ২০ জন মার্কিন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছিলেন, সেখানে ওয়াশিংটনের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাতে ব্যর্থতাকে ‘নৈতিক দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু এই অবস্থানের জন্য ব্লাডকে প্রশংসিত করার পরিবর্তে কার্যত একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়।

গ্যারি জে. ব্যাসের বহুল প্রশংসিত গ্রন্থ 'The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide' কূটনৈতিক বার্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন করেছে। বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কূটনীতিকেরা বাঙালি বেসামরিক মানুষ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত পরিকল্পিত নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে নথিবদ্ধ করেছিলেন। অথচ ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নৈতিক নেতৃত্ব প্রদর্শনের পরিবর্তে কৌশলগত নীরবতাকেই বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির এই বৈপরীত্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ-এর নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্স ৭৪-কে বঙ্গোপসাগরে পাঠায়।

যদিও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ এই মোতায়েনকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের প্রতি স্নায়ু যুদ্ধকালীন একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত শক্তিগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই উপলব্ধি তখন থেকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে। তথাপি, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে কেবল নিক্সন প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

হোয়াইট হাউস যখন পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল তখন বহু আমেরিকান দৃঢ়ভাবে বাঙালি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আর্চার ব্লাড ও তার সহকর্মীরা কর্মজীবনের চেয়ে বিবেককে বেছে নিয়েছিলেন। আমেরিকান লেখক, শিল্পী ও আন্দোলনকর্মীরা তাদের নিজেদের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। অ্যালেন গিন্সবার্গ কবিতায় বাঙালি শরণার্থীদের দুর্ভোগ তুলে ধরেছিলেন। জোয়ান বায়েজ আন্তর্জাতিক প্রতিবাদে তার কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন। জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করেন। যা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের প্রতি অভূতপূর্ব বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং শরণার্থীদের ত্রাণকার্যের জন্য বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেও তার নীতি পরিবর্তন করে। স্বাধীনতার পর ওয়াশিংটন দ্রুত নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তৎপর হয়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হয়ে ওঠে। কয়েক মাসের মধ্যেই তারা বিপুল পরিমাণ মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৭৩ সাল নাগাদ এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বিপাক্ষিক সাহায্যদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

নিক্সন প্রশাসন এবং আমেরিকান জনগণের মধ্যে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মার্কিন নীতির গভীর ব্যর্থতাকে সততার সঙ্গে স্বীকার করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সমসাময়িক অংশীদারিত্বকে মূল্যায়ন করতে পারে বাংলাদেশ। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেইসব কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং সাধারণ নাগরিকদেরও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত বাংলাদেশের।

ঠিক এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়টি সতর্ক বিবেচনার দাবি রাখে। সংকটের মুহূর্তেই বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয়। বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় সংকটের সময়ে নিক্সন প্রশাসন সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ। তবে, অনেক আমেরিকান অসাধারণ সাহস ও মানবিকতার সঙ্গে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

নির্বাচিত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো উপকার হয় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এই প্রজাতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি। যেকোনো রাজনৈতিক দলের, বিশেষ করে এমন দলের যাদের নিজেদের যুদ্ধকালীন ভূমিকা আজও গভীরভাবে বিতর্কিত- সেই ইতিহাসকে সংশোধনবাদের পরিবর্তে বিনয়ের সঙ্গে দেখা উচিত। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আজকের অংশীদারিত্ব উদযাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু ঐতিহাসিক বিবরণকে নতুন করে সাজানো বৈধ নয়।

শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কঠিন সত্যকে ভুলে যাওয়ার ওপর নয়, বরং সততার সঙ্গে তার মুখোমুখি হওয়ার ওপর নির্মিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি পরিণত ও গঠনমূলক অংশীদারিত্ব উপভোগ করছে। এই অংশীদারিত্ব দুর্বল না হয়ে বরং আরো শক্তিশালী হবে যখন উভয় দেশই উপলব্ধি করে যে, ওয়াশিংটন একসময় ইতিহাসের ভুল পক্ষে থাকলেও বহু আমেরিকান বিশ্বের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।

বিএনপির ফেসবুক পেজ হ্যাক করা হয়েছে | কালের কণ্ঠ