kalerkantho


জিয়া পরিবারের কেউ থাকছেন না এবারের ভোটে

শফিক সাফি   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০২:২৫



জিয়া পরিবারের কেউ থাকছেন না এবারের ভোটে

আইনি জটিলতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁর ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন। তিনি দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় নির্বাচন করতে পারছেন না। এর ফলে ভোট বর্জন বাদ দিলে ১৯৯১ সালের পর এবারই জিয়া পরিবারের কেউ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।
 
প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থায়। এরপর স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে দুবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। ফলে জিয়া পরিবারের কেউ নির্বাচন করেননি। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো বগুড়া-৭ আসনসহ দেশের পাঁচটি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করে সবগুলোতেই বিজয়ী হন। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসন থেকে নির্বাচন করেন এবং বিজয়ী হন। তবে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি।
 
বর্তমানে খালেদা জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারান্তরীণ রয়েছেন। এ অবস্থায় তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না? এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই। যদিও অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
 
এ অবস্থায় জিয়া পরিবারের আসন হিসাবে পরিচিত বগুড়া-৬ ও ৭ এবং ফেনী-১ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গতকাল রবিবার যাচাই-বাছাইকালে তিনটি আসনেই প্রাথমিক পর্যায়েই খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা। তবে দুটিতে বিএনপির বিকল্প প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
 
বগুড়া-৬ আসনে বেগম জিয়ার পাশাপাশি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বগুড়া পৌরসভার মেয়র এ কে এম মাহাবুবুর রহমান ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা। এখানে মাহাবুবুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
 
বগুড়া-৭ আসনে খালেদা জিয়ার পাশাপাশি বিএনপির বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোর্শেদ মিল্টন। এ ছাড়া দলীয় মনোনয়ন না পেলেও মনোনয়নপত্র দাখিল করেন শাজাহানপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সরকার বাদল। এই আসনে খালেদা জিয়া ও মোর্শেদ মিল্টনের মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেছে। এতে করে এখানে ধানের শীষের প্রার্থী থাকছেন না। যদিও আপিলের জন্য তিন দিন সময় পাবেন তাঁরা। সে ক্ষেত্রে মোর্শেদ মিল্টনের মনোনয়ন বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।
 
ফেনী-১ আসনে খালেদা জিয়ার বিকল্প হিসেবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মজনু। তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং অফিসার।
 
পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনে খালেদা জিয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। নির্বাচনে খালেদা জিয়া কখনোই পরাজিত হননি। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রতিবারই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন এবং সবগুলো আসনে তিনি জয়লাভ করেন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও খালেদা জিয়া প্রার্থী ছিলেন।
১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১, চট্টগ্রাম-৮ আসনে নির্বাচন করেন। ১৯৯৬ সালে বগুড়া-৬ ও ৭, ফেনী-১, লক্ষ্মীপুর- ২, চট্টগ্রাম-১ আসনে নির্বাচন করেন।
 
২০০১ সালে তিনি বগুড়া-৬ ও ৭, ফেনী-১, লক্ষ্মীপুর-২, খুলনা-২ আসনে নির্বাচন করেন।
 
এরপর ২০০৮ সালে আরপিও সংশোধন করার পর একজন প্রার্থী তিনটির বেশি আসনে প্রার্থী হতে পারবেন না বলে আইন করা হয়। সেই সময় খালেদা জিয়া বগুড়া-৬ ও ৭, ফেনী-১ এই তিনটি আসনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই জয়ী হন।
 
এদিকে খালেদা জিয়ার বড় বোন বেগম খুরশিদ জাহান চকলেট। তিনি মারা যান ২০০৬ সালে। দিনাজপুর-৩ (সদর) আসন থেকে দুইবার (১৯৯৬ ও ২০০১ সালে) নির্বাচিত হন তিনি। এই আসনে বেগম খুরশিদ জাহান হকের (চকলেট) বড় ছেলে শাহরিয়ার আকতার হক ডন নির্বাচন করার কথা থাকলেও এবার তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি বলে জানা গেছে। খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দার ফেনী-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৮ সালে বেগম জিয়ার ছেড়ে দেওয়া উপনির্বাচনে তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তাঁর আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বেগম জিয়ার ভাগ্নে সাহারিন ইসলাম তুহিন ২০০৮ সালে নীলফামারী-৩ থেকে নির্বাচন করে জিততে পারেননি।
 
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুরভিসন্ধিমূলক। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার যে বিপুল জনপ্রিয়তা, সে কারণেই তাঁকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে যে মাস্টারপ্ল্যান সরকার করেছে, খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল সেই নীলনকশার অংশ বলে আমরা মনে করি।’ তিনি আরো বলেন, ‘জিয়া পরিবার জনগণের সেবায় নিয়োজিত। জিয়ার পরিবারকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে ষড়যন্ত্র সরকার করছে তা সফল হবে না।’
 
খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সাবেক সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, ‘এই ষড়যন্ত্রে মানুষের মনে জিয়া পরিবারের প্রতি আরো আবেগ দৃঢ় হবে।’


মন্তব্য