kalerkantho


আরো কাছাকাছি বিএনপি যুক্তফ্রন্ট ঐক্যপ্রক্রিয়া

► নমনীয় বিকল্পধারা ► অভিন্ন লক্ষ্য ও দাবির খসড়া চূড়ান্ত ► আজ বৈঠক ড. কামালের বাসায়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:৪৮



আরো কাছাকাছি বিএনপি যুক্তফ্রন্ট ঐক্যপ্রক্রিয়া

নিরপেক্ষ সরকারসহ সাত দফা দাবি ও ১১ দফা অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য করার ক্ষেত্রে আরো কাছাকাছি চলে এসেছে বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্যপ্রক্রিয়া। গতকাল শুক্রবার দলগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে মতানৈক্য আগের চেয়ে কমে এসেছে বলে জানা গেছে। আজ শনিবারের বৈঠকে বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ, জোটের নামসহ সব বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিকেল ৩টায় ড. কামাল হোসেনের বাসায় এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে সব পক্ষ সম্মত হলে আগামীকাল রবিবার বৃহত্তর ঐক্যের রূপরেখা ঘোষণা করা হতে পারে।

জানা গেছে, যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক বিকল্পধারার পক্ষ থেকে গতকাল সাত দফার ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। কেবল ১১ দফা লক্ষ্যের সঙ্গে দুটি ইস্যু যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। এর একটি হলো স্বাধীনতাবিরোধী দলের সঙ্গে ঐক্য করা যাবে না। অন্যটি হলো সংসদের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় দলটির প্রস্তাবের বিষয়টি। তবে উপস্থিত বিএনপিসহ অন্য তিনটি দলের নেতাদের যুক্তির মুখে শেষ পর্যন্ত বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ’ভাবে শব্দ দুটি বাদ দিতে সম্মত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে লক্ষ্যের জায়গায় এখন যুক্ত হবে, ‘স্বাধীনতাবিরোধী দলের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য হবে না’। অর্থাৎ এ বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যে আর কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু ‘প্রত্যক্ষ’ ও ‘পরোক্ষভাবে’ শব্দ দুটি যুক্ত থাকলে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করার অর্থ জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য বোঝানো হয় বলে এর আগে বিকল্পধারার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, বৈঠকে মাহী বি চৌধুরী এ প্রশ্ন তুলে বলেছেন যে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত আছে; ফলে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করা মানে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করা বোঝায়। কিন্তু উপস্থিত অন্য নেতাদের যুক্তি ও আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত মাহী বি চৌধুরী ও বিকল্পধারার সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ফারুক নমনীয় হন বলে জানান বৈঠকে উপস্থিত যুক্তফ্রন্টের শরিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন ও গণফোরামের নেতৃত্বাধীন ঐক্যপ্রক্রিয়ার সদস্যসচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন।

এই দুই নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, আগের মতোই ওই দুই ইস্যুতে বিকল্পধারা কথা তুললেও আগের চেয়ে তারা নমনীয় থেকেছে। তাঁরা বলেন, এখন থেকে শুধু বলব ‘স্বাধীনতাবিরোধী’। তাঁরা এও জানান, সংসদে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বিকল্পধারা তুলেছে। কিন্তু তাঁরা বলেছেন যে ভারসাম্যের কথা তো লক্ষ্যের মধ্যে আছেই।

এ বিষয়ে অবশ্য মাহী বি চৌধুরী কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টি শীর্ষ দুই নেতা যুক্তফ্রন্টের সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সম্মত হলে আমার আপত্তির কিছু নেই।’

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, “বৈঠক খুব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আমরা ঐক্যের খুব কাছাকাছি। আশা করি দ্রুতই ‘শেইপ’ নেবে।” তিনি আরো বলেন, ‘আগের তুলনায় বিকল্পধারা অনেক দায়িত্বশীলভাবে কথা বলেছে। এখন আর কোনো সমস্যা দেখছি না।’ 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকালের বৈঠকে তুমুল তর্ক-বিতর্ক বা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি; যা গত ৮ অক্টোবরের বৈঠকে হয়েছিল। বৈঠকে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া বা উপায় খুঁজে বের করার জন্য একটি ছোট কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এদিকে, বৈঠকে জানানো হয়েছে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য করণীয়সহ আগামী দিনে সরকার পরিচালনা তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক ঐক্যের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব রয়েছে। যুক্তফ্রন্টের শরিক এই দলটির আহ্বায়ক মান্না জানান, আগামীতে এ প্রস্তাব যথাসময়ে উপস্থাপন করা হবে।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উত্তরায় জেএসডির প্রধান আ স ম আবদুর রবের বাসায় কয়েক ঘণ্টার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, চলমান বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার দাবি ও লক্ষ্যের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। অচিরেই আন্দোলনের অভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হবে। আজ শনিবার বৈঠকে এসব বিষয় পুরোপুরি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামীকাল চূড়ান্তভাবে বলা যাবে।’

মির্জা ফখরুল ছাড়াও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদ। আরো ছিলেন ঐক্য প্রক্রিয়ার শরিক গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, যুক্তফ্রন্টের শরিক বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় নেতা ওমর ফারুক, শহীদুল্লাহ কায়সার ও ডা. জাহেদ উর রহমান।

সাত দফায় যা বলা হয়েছে
১. সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা; ২. যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা; ৩. নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত; ৪. শিক্ষার্থী-সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব কালো আইন বাতিল; ৫. নির্বাচনের ১০ দিন আগে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন; ৬. দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; ৭. তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো মামলা না দেওয়া।

১১ লক্ষ্য
১. মুক্তি সংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান করে সুশাসন; ২. ৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের যুগোপযোগী সংশোধন; ৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত; ৪. দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা; ৫. দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি; ৬. সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চয়তার বিধান; ৭. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও দলীয়করণের কালো থাবা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন; ৮. রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জনগণের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা নিশ্চিত, জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, নিম্ন আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবনমান নিশ্চিত করা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বেতন-মজুরি কাঠামো নির্ধারণ; ৯. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া; ১০. ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়’—এই নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ; ১১. বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত ও পুনর্বাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।

রবের বাসার বাইরে মিছিল
জেএসডি সভাপতি আ স ম রবের বাসায় যখন বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠক চলছিল, তখন সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বাসার সামনের সড়কে মিছিল হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘একাত্তরের দালালেরা বাড়াবাড়ি করিস না, বাড়াবাড়ি করিস না-পিঠের চামড়া থাকবে না’, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ ইত্যাদি স্লোগান দেয় মিছিলকারীরা।



মন্তব্য