kalerkantho


আত্মবিশ্বাসী আ. লীগের সামনে বিপর্যস্ত বিএনপি

আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট    

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৬:১০



আত্মবিশ্বাসী আ. লীগের সামনে বিপর্যস্ত বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক দলগুলোর গণসংযোগ। জয়পুরহাট জেলার দুটি নির্বাচনী আসনেও মনোনয়নপ্রত্যাশীরা চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি কেন্দ্রের নির্দেশনার অপেক্ষায় বিএনপি। আর সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেদের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা দীর্ঘ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। আর বিচ্ছিন্নভাবে বিএনপির দু-একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী গণসংযোগ করলেও মূল মনোযোগ কেন্দ্রে।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জেলার দুটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটবে না, এমনটিই বিশ্বাস তাদের। আর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করে, জেলায় অতীতের চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। এই সময়ে জেলার উন্নয়ন, মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন এ জেলার মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। বর্তমানে জেলার ৩২টি ইউনিয়নের ৩০ জন চেয়ারম্যান এবং পাঁচটি পৌরসভার সব কটির মেয়র আওয়ামী লীগের। তারা মনে করছে, উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করার কারণেই জেলার সর্বত্রই আওয়ামী নেতৃত্বে সুবাতাস বইছে। মোটামুটি এই তিন দলের সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা আগামী নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের নজর কাড়ার চেষ্টা করছেন। এর বাইরে জামায়াত বা অন্য দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণা এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।   

আওয়ামী লীগ
জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় বর্তমানে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ জমজমাট। দলের সভাপতি সামছুল আলম দুদু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলীর নেতৃত্বে দলের স্থানীয় ও জাতীয় কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচিতে দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও বেশ। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে  নেতাকর্মীদের এই উপস্থিতি ক্রমে বাড়ছে। সব কিছু মিলিয়ে ক্ষমতাসীন দলটির জেলা কার্যালয় নির্বাচনী আবহে বেশ সরগরম। তার পরও জেলা আওয়ামী লীগ বর্তমানে দুটি ধারায় বিভক্ত। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত দ্বন্দ্ব-বিরোধ চলছে। দলের জেলা সভাপতি ও সম্পাদক আছেন একটি গ্রুপে। অন্য গ্রুপে আছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত জেলা কমিটির বেশির ভাগ নেতা।

জয়পুরহাট-১ (সদর ও পাঁচবিবি) আসনে এরই মধ্যে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে গণসংযোগ করছেন বর্তমান সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল আলম দুদু। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি এলাকায় সার্বক্ষণিক মানুষের পাশে থেকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। সম্প্রতি প্রায় দেড় হাজার মোটরসাইকেল ও ৩০০ ভটভটি নিয়ে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে শোডাউন করে জেলায় চমক সৃষ্টি করেছেন তিনি। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, জয়পুরহাট-১ আসনে এবারও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন। অন্যদিকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে ভোট প্রার্থনা করছেন দলের আরো প্রায় অর্ধ ডজন নবীন ও প্রবীণ নেতা। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল পিপি একজন। অন্যদিকে জহুরুল ইসলামও মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি স্থানীয় দোগাছি ইউনিয়ন পরিষদের পর পর দুইবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও জয়পুরহাট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সম্ভাব্য দলীয় মনোনয়নের আশায় দীর্ঘদিন থেকে তিনি এলাকায় গণসংযোগ করছেন। একইভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাঁচবিবি পৌরসভার মেয়র হাবিবুর রহমান হাবিব। সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে জয়পুরহাট পৌরসভার মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের নামও শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তৌফিদুল ইসলাম বুলবুলও গণসংযোগ করছেন।

জয়পুরহাট-২ (কালাই ক্ষেতলাল আক্কেলপুর) আসনে আওয়ামী লীগের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে প্রথম নির্বাচন করে বিএনপি প্রার্থীর কাছে অল্প ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। পরে দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জয়পুরহাটের ব্যাপক উন্নয়ন করেন। দলে জেলা কমিটির সভাপতি সামছুল আলম দুদু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব থাকলেও জেলা কমিটির বেশির ভাগ নেতা আছেন তাঁর সঙ্গে। এ আসনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলী। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক তাজমহল হীরক প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ নেই। এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের ৬৭ জনের চূড়ান্ত তালিকায় জয়পুরহাট-২ আসনে আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাস স্বপনই হচ্ছেন এ আসনের একক প্রার্থী।

বিএনপি
একসময় জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দল ছিল বিএনপি। তবে নেতৃত্ব কোন্দলে বর্তমানে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে জেলা কমিটির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মোজাহার আলী প্রধানের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল দেখা দেয়। তবে  নেতাকর্মীরা মনে করছে, কেন্দ্র থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মমতাজ উদ্দিন মণ্ডলের নাম ঘোষণা দেওয়ার পর সবাই এখন এক প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি পালন করছে।

জয়পুরহাট-১ আসনে কেন্দ্রের উদ্ধৃতি দিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নাম প্রকাশিত হয়েছে সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল আলীমের ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফয়সাল আলীম এবং জয়পুরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জয়পুরহাট পৌর সভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমানের। এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী প্রধান মারা যাওয়ায় তাঁর ছেলে জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ রানা প্রধান এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাফিজুর রহমান পলাশও মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

জয়পুরহাট-২ (কালাই ক্ষেতলাল আক্কেলপুর) আসনে বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা এবারও মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়ে মাঠে গণসংযোগ করছেন। কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা ১৭৩ জনের চূড়ান্ত তালিকায় জয়পুরহাট-২ আসনে ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফার নাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের খবর নেতাকর্মীদের বিশ্বাস এবারও তিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য এলডিপি নেতা আবু ইউসুফ মো. খলিলুর রহমানও এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন। ইতিমধ্যে তিনি এলডিপি থেকে বিএনপিতে যোগদানও করেছেন।

জাতীয় পার্টি
জয়পুরহাট-১ (সদর ও পাঁচবিবি) আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক ছাত্রনেতা আ স ম মোক্তাদির তিতাসকে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এরশাদের নিষেধাজ্ঞায় তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল আলম দুদু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে মহাজোটের শরিক হয়েও তাদের ভুল সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ে জাতীয় পার্টি। কিন্তু এবার আর সেই ভুলে পা না বাড়িয়ে কেন্দ্রের গ্রিন সিগন্যালে মহাজোটের শরিক হয়েই জয়পুরহাট-১ আসনে নির্বাচন করতে গণসংযোগ করছেন জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আ স ম মোক্তাদির তিতাস।

জয়পুরহাট-২ আসনে গণসংযোগ করছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কাজী আবুল কাশেম রিপন। তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্যও দেন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। 



মন্তব্য