kalerkantho


দিনাজপুর ও ঝালকাঠিতে আ. লীগে কোন্দল

এমপিদের চ্যালেঞ্জ অন্য পক্ষের

দিনাজপুর, ঝালকাঠি ও রাজাপুর প্রতিনিধি    

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:৩৩



এমপিদের চ্যালেঞ্জ অন্য পক্ষের

দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য এবং বীরগঞ্জের দুই আওয়ামী লীগ নেতাকে কেন্দ্র থেকে শোকজ করার পরও পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ঘোষণা করেছে দুই পক্ষ। এদিকে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের সভা বর্জন করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ। এতে নির্বাচনের এই সময়ে কোন্দলে না জড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে।

বীরগঞ্জে পাল্টাপাল্টি সমাবেশ

দেশের প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদপত্রে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশিত হওয়ায় দিনাজপুরের রাজনীতি যেমন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, তেমনি প্রতিযোগিতা চলছে কে কাকে কতটা ছোট করতে পারে, কে কার কত বদনাম করতে পারে। আজ ১৬ সেপ্টেম্বর বীরগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুটি অংশের পাল্টা সমাবেশ আহ্বানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজন দুই দিকে অবস্থান নিয়েছেন।

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলায় সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন ও সাফল্য তুলে ধরার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ আজ বিকেল ৩টায় বীরগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাবেশ ডেকেছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন পরিষদের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক কালিপদ রায়। একই সময় একই বিষয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ আহ্বান করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা, উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি আবু হুসাইন বিপু।

উভয় পক্ষই সমাবেশ সফল করতে সভা-সমাবেশ করেছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হচ্ছে। অনেকে মনে করছে, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত-শিবির আরো তৎপর হয়ে উঠতে পারে। কারণ আওয়ামী লীগের

কোন্দলের কারণে এরই মধ্যে এ এলাকায় জামায়াত-শিবিরের সক্রিয়তা দেখা গেছে। জেলার আর কোথাও তাদের পোস্টার চোখে না পড়লেও বীরগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী মাওলানা হানিফের ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে লাগানো পোস্টার চোখে পড়ছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য নুর ইসলাম নুর কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন ও সাফল্য তুলে ধরার জন্য সমাবেশ আহ্বান করেছে। তারা দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালকে প্রধান অতিথি করেছে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দিনাজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইমাম চৌধুরী, সহসভাপতি বজলুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুকুজ্জামান চৌধুরী মাইকেল প্রমুখ। প্রশাসন সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সংসদ সদস্যের বিরোধী হিসেবে পরিচিত জাকারিয়া জাকা, আমিনুল ইসলাম, আবু হুসাইন বিপু একই সময় পাশাপাশি স্থান আওয়ামী লীগ অফিসের ভেতরে সমাবেশ ডেকেছেন। প্রশাসন তাঁদের সমাবেশ করার জন্য কোনো অনুমতি দেয়নি। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ আগে সমাবেশ ডেকেছে। সমাবেশ সফল করার জন্য আমরা যেখানেই প্রচারণায় যাচ্ছি তারা খবর পেয়ে সেখানেই গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক কালিপদ রায় বলেন, এই ঘটনা আওয়ামী লীগের আদর্শের পরিপন্থী।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে কেন্দ্র থেকে পাওয়া শোকজ নোটিশের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘১৬ তারিখের সমাবেশ আওয়ামী লীগের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি, যা দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে অনুষ্ঠিত হবে। দলীয় কার্যালয়ে সরকারের সফলতা তুলে ধরতে কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।’ তিনি বলেন, এটা সংসদ সদস্যবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড নয়। সরকারের সফলতা প্রচারের মাধ্যমে একটি নির্বাচনী সমাবেশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, এ জাতীয় ঘটনার সঙ্গে অনেক আগে থেকেই তাঁরা পরিচিত। জাতীয় নির্বাচন এলেই মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বরাবরই এ কাজ করে থাকেন। এর আগে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মরহুম আব্দুর রউফ চৌধুরীকে একই অবস্থায় ফেলা হয়েছিল, যে কারণে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেছিলেন। এবারও কোন্দলের কারণে জামায়াত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

জানতে চাইলে বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিলা পারভীন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ তাদের সমাবেশ সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসনসহ থানায় লিখিতভাবে জানিয়েছে। পরে অন্য পক্ষের কর্মসূচির খবর জানতে পেরে যারা একই সময় সমাবেশ আহ্বান করেছে তাদের ডাকা হয়েছিল। তারা বলেছে, সমাবেশ করলে জানাবে। প্রশাসন এ ব্যাপারে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, সংসদ সদস্যবিরোধী সমাবেশ করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য জাকারিয়া জাকা ও জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক হামিদুল ইসলামকে শোকজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি, আনুগত্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যথাযথ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছেন কি না তা সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। তাঁদেরকে ১৫ দিনের মধ্যে উত্তর দিতে বলা হয়েছে।

ঝালকাঠিতে এমপির সভা বর্জন একাংশের

ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বজলুল হক হারুনের সভা বর্জন করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ। গতকাল শনিবার সকালে উপজেলার বাইপাস মোড়ের দলীয় প্রধান কার্যালয় চত্বরে উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্বনির্ধারিত যৌথ সভা ছিল, দলের একাংশ তা বর্জন করে উপজেলা যুবলীগ কার্যালয়ে পাল্টা সভা করে।

জানা যায়, নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা ও বিভেদ দূর করতে যৌথ সভার আয়োজন করা হয়। সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে সভায় যোগ দেননি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বেশ কিছু নেতা। তাঁরা সকাল ১১টার দিকে উপজেলা যুবলীগ কার্যালয়ে মতবিনিময়সভার আয়োজন করে। উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মেজবাউদ্দিন মাসুদ সিকদারের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন, রিয়াজ উদ্দিন মাতুব্বর, দপ্তর সম্পাদক জালাল আহম্মেদ, উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ সিকদার, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন মৃধা, উপজেলা যুবলীগ সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ।

সভায় বক্তারা বলেন, এমপি বজলুল হক হারুন স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তিকে আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিলে তা মেনে নেওয়া হবে না। বক্তারা আরো বলেন, প্রথমে বিএনপি ও পরে জাতীয় পার্টি থেকে আসা জামায়াতঘেঁষা হারুনকে কী কারণে বারবার আওয়ামী লীগের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন।  

সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন তাঁর সভায় বলেন, বিএনপি আমলে রাজাপুর একটি সন্ত্রাসের জনপদ ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এখানে শান্তি বিরাজ করছে। এই শান্তি ও উন্নয়ন ধরে রাখতে আবারও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে হবে। সে জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। নিজেকে নায়ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিনেমায় যেমন শেষ পর্যন্ত ভিলেনের পরাজয় হয় তেমনি রাজাপুরেও ভিলেনের পরাজয় হবে এবং আমিই জয়ী হব।’

সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক খাইরুল আলম সরফরাজ, সহসভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মনিরউজ্জামান মনির, ভাইস চেয়ারম্যান আফরোজা আক্তার লাইজু, মঠবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সিকদারসহ ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। 



মন্তব্য