kalerkantho


তিন আসনই চায় আ. লীগ বিএনপির কাঁটা জামায়াত

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ    

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১০:৩৭



তিন আসনই চায় আ. লীগ বিএনপির কাঁটা জামায়াত

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরেও রাজনীতির মাঠে সরব রয়েছে জামায়াত, জাতীয় পার্টি, জাসদসহ আরো কয়েকটি দল। ২০০৯ সালের আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার তিনটি আসনই ছিল বিএনপির দখলে। পরের দুটি নির্বাচনে আসনগুলো দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। তবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে দলীয় বিরোধ ও দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে জামায়াতকে নিয়ে সমস্যায় রয়েছে বিএনপি। জামায়াত রীতিমতো বিএনপির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসবের মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে এই তিনটি আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েক ডজন নেতা। দলের নেতাকর্মীরা ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন তাঁরা। নিচ্ছেন খোঁজখবর। জানাচ্ছেন তাঁদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশী ও তাঁদের সমর্থকরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ)
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ এনামুল হক। আর দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গোলাম রাব্বানী।

এবার এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন চারজন। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানী, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার (অব.) মোহাম্মদ এনামুল হক, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. সামিল উদ্দীন আহম্মেদ শিমুল এবং আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী মাহতাব উদ্দীন।

তবে এ আসনটিতে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ  কোন্দল অনেক বেশি। অন্তত পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত দলীয় নেতাকর্মীরা। এই গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানী, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক, শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র কারিবুল হক রাজিন, আওয়ামী লীগ নেতা মাহতাব উদ্দিন ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ডা. সামিল উদ্দিন শিমুল। তাঁরা সবাই পৃথকভাবে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীরা রয়েছে বিভ্রান্তির মধ্যে। দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ শিবগঞ্জে দলের সাংগঠনিক অবস্থা নরবড়ে বলে স্বীকার করেছেন।

এসব কারণে মনোনয়ন যুদ্ধে এবার প্রবল প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানী। তাঁর বিরুদ্ধে দলে বিভেদ তৈরি, দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, চাকরি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখার অর্থ হরিলুট, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম-দূর্নীতির অভিযোগ করেছে দলের নেতাকর্মীরা। তবে রাব্বানীর সমর্থকরা বলছে, তিনি ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে এই আসন ধরে রাখা সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, কানসাট বিদ্যুৎ আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব দেওয়ায় রাব্বানীর ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক রয়েছে, যা আওয়ামী লীগের ভোটের সঙ্গে যোগ হলে তাঁর বিজয় নিশ্চিত।

এদিকে বড় ধরনের কোনো দলীয় কোন্দল না থাকায় এই আসনে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নের জন্য মাঠে রয়েছেন তিনজন। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান মিয়া, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য বেলাল-ই-বাকী ইদ্রিশী। শাহজাহান মিয়া এই আসনে একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হওয়ায় তৃণমূলে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি। অন্যদিকে নবম সংসদ নির্বাচন থেকে এই আসনে দলের মনোনয়ন চেয়ে আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য বেলাল-ই-বাকী ইদ্রিশী। দলে কোন্দল না থাকলেও এই আসনে বিএনপির মাথাব্যথা জামায়াতকে নিয়ে। এরই মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কেরামত আলীকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। ফলে সমঝোতা না হলে নির্বাচনী যুদ্ধে বিএনপিকে তুমুল প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে।

এর বাইরে জাতীয় পার্টি থেকে আলাউদ্দিন টিপু ও জাসদ নেতা আজিজুর রহমান আজিজ দলীয় মনোনয়নের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে এই দুটি দলের সাংগঠনিক তৎপরতা নেই বললেই চলে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট)
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন দীর্ঘদিন ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালে আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের ঘরে। দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস নির্বাচিত হন।

এবার এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন ছয়জন। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি জিয়াউর রহমান, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান খুরশেদ আলম বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষিতিশ চন্দ্র আচারী এবং নাচোল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের। এই আসনে আওয়ামী লীগ তিন ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস, আরেক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউর রহমান। এর বাইরে নাচোল উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বেও আওয়ামী লীগের আরেকটি পক্ষ মাঠে সক্রিয় রয়েছে। তবে নিয়মিত উঠান বৈঠক ও জনসংযোগ করে নৌকার প্রচারণায় আওয়ামী লীগকে বেশ এগিয়ে রেখেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের কমিটিগুলোতে শীর্ষপদে স্থান দিয়েছেন তাঁর স্বজনদের। এসব কারণে দলে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে।

এই আসনে বিএনপিতেও রয়েছে ব্যাপক অন্তঃকলহ। একপক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ আমিনুল ইসলাম, আরেক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গোমস্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান বাইরুল ইসলাম। এবার এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইছেন অন্তত চারজন। তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, গোমস্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান বাইরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আসাদুল্লাহ আহমেদ। এর বাইরে সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়াও দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে এই আসনে জামায়াতের জেলা অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যাপক ইয়াহিয়া খালেদ প্রার্থী হিসেবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। এর বাইরে অন্য কোনো দলের তৎপরতা নেই বললেই চলে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর)
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ সদর আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল ওদুদ। দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আব্দুল ওদুদ। এই আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত—তিন দলেরই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে ভোটের রাজনীতিতে তিন দলেরই রয়েছে শক্ত অবস্থান।

আওয়ামী লীগ থেকে এবার মনোয়ননের জন্য একাধিক প্রার্থী তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রুহুল আমিন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য মাহফুজুর রহমান বেঞ্জু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সামিউল হক লিটন ও জেলা বিএমএ সাধারণ সম্পাদক ডা. গোলাম রাব্বানী। সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ বেশ কিছুদিন ধরেই পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলোর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে গণসংযোগ, মতবিনিময় ও সভা-সমাবেশ করছেন। অন্য প্রার্থীরাও ফেস্টুন, ব্যানার, মতবিনিময় ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জনগণের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে এই আসনে পিছিয়ে পড়েছে বিএনপি। এর পরও দলটি ঘুরে দাঁড়াতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশিদ হারুন। বেশ কিছুদিন ধরে ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ ও সমাবেশ করে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছেন তিনি। তবে এ আসনে বিএনপিতে রয়েছে বিরোধ। এ অবস্থায় এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আব্দুল ওয়াহেদ এ আসনে মনোনয়ন চাওয়ার কথা বললেও মাঠে তাঁর তৎপরতা চোখে পড়েনি।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। এবারও এই আসনে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুলকে দলের প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। প্রার্থী চূড়ান্তের পর এত দিন সংগঠনের নেতাকর্মীরা গোপনে নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও তিন মাস ধরে নিজেই মাঠে নেমেছেন জামায়াতের প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি গণসংযোগ করে ভোট চেয়েছেন। ফলে এ আসনে বিএনপিকে প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মোকাবেলা করতে হবে জামায়াতকেও।

এর বাইরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জাতীয় পার্টির তেমন সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। তবে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি নজরুল ইসলাম সোনা আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। আর জেলা জাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরকে এই আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জাসদ। 



মন্তব্য