kalerkantho


বরিশাল

নীরব বিপ্লবের আশায় ভরাডুবি বিএনপির

তৌফিক মারুফ, বরিশাল থেকে    

১ আগস্ট, ২০১৮ ১০:১৮



নীরব বিপ্লবের আশায় ভরাডুবি বিএনপির

‘নীরব ভোট বিপ্লব’ হওয়ার আশায় ছিল বরিশাল বিএনপি। এবার সিটি নির্বাচন ঘিরে এটাই ছিল বরিশালে বিএনপির সবচেয়ে বড় ‘গোপন কৌশল’। সেই কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় আক্ষেপ আর হতাশায় বিপর্যস্ত বরিশালে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের কর্মী-সমর্থকরা। কেন তাদের দীর্ঘকালের ‘দুর্গ’ এবার চূর্ণ হয়ে গেল আর কেনই বা কর্মীদের মাঠে রাখা হলো না—সেই প্রশ্নের জবাব মেলাতে পারছে না নিজেরাই। কেউ কেউ বলছেন, ধানের শীষের মাঠের কর্মীরা আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের আচরণ কী হবে, তা ধরে নিয়েই ভোটের মাঠে থাকার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তারা কোনো নির্দেশনা পায়নি। কোনো কেন্দ্রেই নিজেদের ভোট রক্ষায় বা নৌকার কর্মীদের ‘সিল মারায়’ সামান্য বাধা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। কর্মীরা দূরে দাঁড়িয়েছিল নীরব দর্শকের মতো। এমনকি অনেক নেতাকর্মী ভোট দিতেও কেন্দ্রে যায়নি।

আরেকটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ভোটের সময় ধানের শীষের ব্যাজ না রাখা নিয়েও। একে স্থানীয় বিএনপির রাজনৈতিক পলায়ন বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আবার দলের প্রার্থী হয়েও সরোয়ার নিজেই এবার সব কৌশল ঠিক করায় অনেকের মধ্যে আছে অসন্তোষ। জেলা যুবদলের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখন আর বিএনপির রাজনীতির এখানে কিছুই থাকল না। শুধুই আমাদের বলা হয়েছে নীরব ভোট বিপ্লবের অপেক্ষায় থাকতে। আমরা নিজেরাই যদি পালিয়ে যাই মানুষ কেন আমাদের ভোট দেওয়ার মতো ঝুঁকি নেবে? তাইলে তো এখানে আমাদের নির্বাচন করাই এবার উচিত হয়নি। খুলনা আর গাজীপুর থেকে তো আমাদের শিক্ষা নিয়ে সে অনুসারে এখানে মাঠে থাকার কৌশল ঠিক করা উচিত ছিল। সেটা না পারা তো আমাদের ব্যর্থতা।’

ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, ‘দলের কাউন্সিলর প্রার্থীরা দলের জন্য বিন্দুমাত্র কাজ করলেন না। কাউন্সিলর প্রার্থীদের এজেন্টরা তো ঠিকই কেন্দ্রে ছিলেন, তাঁরা কোথাও তো কোনো ভূমিকাও রাখলেন না।’

বরিশাল মহানগর যুবদলের সভাপতি আক্তারুজ্জামান শামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব কাউন্সিলর প্রার্থীর মনে রাখা উচিত ছিল তাঁরা কিন্তু দলের কারণেই আজকের জায়গায় আসতে পেরেছেন। তাঁদের এভাবে দলের সঙ্গে বেইমানি করা ঠিক হয়নি। আর এ জন্য ঠিকই এক সময় তাঁদের খেসারত দিতে হবে।’ ওই যুবদল নেতা অবশ্য বলেন, ‘আমরা মাঠে ছিলাম না বা সংঘবদ্ধ ছিলাম না, তা বলা ঠিক না, বরং বলতে পারি আমরা আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের আক্রমণাত্মক আচরণের কাছে পর্যুদস্তু হয়েছি। আর এটা আমাদের বরিশালের রাজনীতির জন্য নতুন একটি অভিজ্ঞতা, যেটা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।’

জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোটের নামে যা হয়েছে তাতে হতাশা থাকতেই পারে। তবে বাস্তবতার কারণে আমরা মাঠে থাকতে পারিনি। প্রশাসন থেকে আমাদের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা তারা রক্ষা করেনি। আর আমরা সহিংসতার দিকেও যেতে চাইনি।’ ব্যাজ ব্যবহার না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কর্মী ও পুলিশের হাত থেকে রক্ষার জন্য আমরা এ কৌশল নিয়েছি। তবে আমরা যে একেবারে মাঠে ছিলাম না, তা নয়।’ ভোট রক্ষা বা কেন্দ্র রক্ষায় কর্মীদের কোনো নির্দেশনা না দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে চান বলেন, ‘এবার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার নিজেই। তাঁর নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ খুব একটা ছিল না। তিনি যা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আমরা সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেস্টা করে গেছি। এর বেশি কিছু আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।’ যদিও কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থীদের ভূমিকা নিয়ে তিনি নিজেও অনেকটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘তাঁরা নিজেদের ভোট নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলেন যে দলের জন্য হয়তো কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ পাননি। যেটা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর বিএনপির আরেক নেতা বলেন, ‘এই প্রথম আমরা নিজেরাই সংগঠিত হতে পারিনি। কেউ কোনো ঝুঁকি নিইনি। কোনো সেন্টারে যদি বাধা দিতে গিয়ে কোনো সংঘাত হতো সেটাও দলের মর্যাদা বাড়াত। বাসদের মেয়র প্রার্থী অনিয়মে বাধা দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন, মানুষ তাঁর প্রশংসা করছে তাঁর সাহসের জন্য। আমরা সেই সামান্য সাহসটুকু দেখাতে পারলাম না।’ ওই নেতা আরো বলেন, ‘রাজনীতি করতে এসে দলের ভোটের সময় যদি পালিয়ে থাকি তবে আর রাজনীতির কী থাকল! আর প্রার্থী নিজেই বা কেন ১১টার মধ্যে মাঠ ছেড়ে গেলেন, তাও বুঝি না। তিনি যদি ডাক দিতেন তবে তো আমাদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও নেমে আসত। জেলে যেতে হলে যেতাম।’

তবে এসব বিষয়ে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসন আর নির্বাচন কমিশন এমন ন্যক্কারজনকভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করবে, এটা চিন্তাও করতে পারিনি। জীবনে এত বাজে ভোট দেখিনি। এটা তো ভোটও বলা যায় না। ভোটের কোনো পরিবেশই ছিল না। তবু আমি করছিলাম হয়তো মানুষ কেন্দ্রে যেতে পারলে নীরব একটা বিপ্লব হতে পারে। কিন্তু মানুষকে সেই ভোটের সুযোগটাও দেওয়া হলো না। এই দেশে এখন আর ভোটের কোনো পরিবেশ রইল না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কৌশল ছিল সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে সব এজেন্ট কেন্দ্রে আসবে, কিন্তু এর আগেই আওয়ামী লীগের কর্মীরা সব কেন্দ্র দখলে নিয়ে নেয়। ফলে আমাদের কর্মীরা প্রতিরোধের যেমন সাহস পায়নি, অনেক কেন্দ্রে আমাদের এজেন্টরাও ঢুকতে পারেনি। পুলিশও আমাদের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়নি।’ দলকে সংঘবদ্ধ রাখার চেষ্টা বা দলের সবার সহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে কাজে পাইনি। তাঁরা আগেই হয়তো সরকারি দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নিয়েছিলেন। বাকিরা সবাই সঙ্গেই ছিল।’ 



মন্তব্য