kalerkantho


ভোটবৈচিত্র্যে সংঘাতও সিলেট

সংঘাতময় হয়ে উঠছে ‘শান্তির নগর’

হায়দার আলী ও ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট থেকে   

২২ জুলাই, ২০১৮ ১১:০০



সংঘাতময় হয়ে উঠছে ‘শান্তির নগর’

সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় গতকাল একটি মসজিদে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে যায় জামায়াত-শিবির। এ সময় মুসল্লিরা বাধা দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে মসজিদের বাইরে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিটি নির্বাচন ঘিরে শান্তির নগর সিলেটেও উত্তাপের আঁচ লেগেছে। এত দিন উত্তেজনা পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কয়েক দিনের একাধিক সংঘাতের ঘটনায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রচারকাজের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত-শিবির হয়ে উঠছে মারমুখী। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর একাধিকবার হামলা করেছে তারা। তাদের এমন তৎপরতার বিষয়ে প্রশাসনের ‘নীরবতা’ দেখে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি হতবাক বিএনপিসহ অন্য দলগুলো। দলীয় নেতারা বলছেন, দ্রুত বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলে আরো বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠতে পারে সিলেটের নির্বাচনী পরিবেশ।
 
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, গত শুক্রবার জামায়াতের সশস্ত্র হামলার মুখে পড়েন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীর বোনজামাই ও তাজ ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী হাসান আব্দুল গণি। ওই দিন নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুবিদবাজার জামে মসজিদের ভেতর মেয়র প্রার্থী জামায়াতের মহানগর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নির্বাচনী লিফলেট বিতরণ করছিল দলটির কয়েকজন নেতাকর্মী। এ সময় হাসান আব্দুল গণি তাদের মসজিদের বাইরে গিয়ে লিফলেট বিলি করতে বলেন। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তারা। এ ঘটনার কিছু সময়ের মধ্যে শিবির ক্যাডাররা মুখোশ পরে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কয়েকটি মোটরসাইকেলে এসে তাঁর ওপর চড়াও হয়। এ সময় তিনি প্রাণ বাঁচাতে পাশের মহানগর যুবলীগ নেতার মালিকানাধীন মৌরশী রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নেন। তাঁকে না পেয়ে দুর্বৃত্তরা রেস্টুরেন্টে ভাঙচুর চালায়। প্রকাশ্যে এ ধরনের হামলায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে আশপাশের ব্যবসায়ীরাসহ সাধারণ মানুষ। স্থানীয় লোকজন বলছে, যেসব যুবক হামলা করেছে তাদের এর আগে এলাকায় দেখা যায়নি। তাদের প্রত্যেকের পিঠে থাকা ট্রাভেল ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করে এ হামলা চালানো হয়।
 
মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও হোটেল পরিচালক এম এ হান্নান বলেন, মসজিদের ভেতরে লিফলেট বিলির প্রতিবাদ করায় এ হামলা চালায় জামায়াত-শিবিরের ক্যডাররা। দ্রুত সময়ে তাদের ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হওয়া এবং হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে তাদের ভালো প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘হামলার শিকার আব্দুল গণি অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও আমার হোটেলে ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলার ভিডিও ফুটেজ থানায় সরবরাহ করা হয়েছে।’
 
এর কয়েক দিন আগে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আলম খান মুক্তির ওপরও শিবির হামলা চালায় বলে জানান আওয়ামী লীগ নেতারা। অল্পের জন্য সেদিন শিবিরের হামলা থেকে বেঁচে যান ওই যুবলীগ নেতা। জানা গেছে, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন খানের লিফলেট ওপরে রেখে জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের লিফলেট বিতরণ করছিল শিবির সদস্যরা। ওই সময় মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আলম খান মুক্তি সেই লিফলেট নিতে অস্বীকার করা নিয়ে বাগিবতণ্ডার একপর্যায়ে শিবির ক্যাডাররা মুহূর্তের মধ্যে জড়ো হয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় তিনি দৌড়ে নিজ বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান।
 
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক মহানগর নেতা বলেন, প্রশাসনের শিথিলতার সুযোগে নগরে আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। নির্বাচনের সুবিধা নিয়ে তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হতে শুরু করেছে।
 
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আফতাব হোসেন খান বলেন, ‘বিষয়টি খুবই খারাপ, আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি সংশয় বোধ করছি, দেশের শত্রু, যুদ্ধাপরাধীদের দোসররা আমার ওয়ার্ডে যে ঘটনা ঘটিয়েছে, তা নিন্দনীয়।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে প্রচুর অপরিচিত লোক সিলেটে আসছে বলে আমাদের কাছে খবর আছে। তাদের (শিবিরের) হামলার ঘটনার পর থেকে এখানকার ভোটারদের মধ্যে সংশয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।’ কিছুদিন আগে নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় যুবলীগের জেলা সভাপতি আলম খান মুক্তির ওপর শিবিরের লোকজনের হামলার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অস্ত্র হাতে হামলা চালিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা তাদের শক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে। সুশৃঙ্খল অস্ত্রধারী বাহিনী হিসেবে তারা সিলেটের সব জায়গায় ঘোরাফেরা করছে।
 
শিবিরের এমন মারমুখী অবস্থানের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না এসব কেন হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে। এসব কারণে ক্রমেই নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সুষ্ঠু পরিবেশের নির্বাচন আমরা সবাই যে আশা করছি, তা বিঘ্নিত হবে।’ এখনই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপর হওয়া উচিত বলে মনে করছেন এই নেতা। তিনি বলেন, দাগি আসামি, পলাতক আসামি যদি থেকে থাকে, তারা যে দলেরই হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সুবিদবাজারে হামলাকারীদের সঙ্গে ট্রাভেল ব্যাগ থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাগ নিয়ে এভাবে চলাফেরা করা তো সন্দেহজনক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। এসব তো মানুষকে আস্তে আস্তে আতঙ্কগ্রস্ত করছে। এভাবে চলতে থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।
 
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘আমি আসলে এসব ঘটনার বিষয়গুলো সত্যি বলতে জানি না। আমাকে কেউ এগুলো বলেওনি। আসলে এসব ঘটনা কী নিয়ে, আমার জানা নেই।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে যাঁরাই প্রার্থী হয়েছেন তাঁদের সবার উচিত আমাদের সম্মানিত ভোটারদের ওপর শ্রদ্ধাশীল হয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সহযোগিতা করা। এমন কিছু করা সঠিক হবে না, যাতে নির্বাচনের পরিবেশ উত্তপ্ত হতে পারে, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে।’
 
এদিকে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর নেতাকর্মীকে ধরপাকড়সহ নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। প্রতিদিনই পুলিশ কোনো না কোনো বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে দক্ষিণ সুরমার ঝালপাড়া থেকে রাসেল ও সুমন নামের দুই কর্মীকে আটক করে নিয়ে গেলেও পুলিশ স্বীকার করেনি। ওই ঘটনার পর প্রার্থীসহ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বিএনপির নেতাকর্মীরা। আটক কর্মীদের সন্ধানের দাবিতে গতকাল শনিবার দুপুরে মেয়র প্রার্থী আরিফুল হকসহ শতাধিক নেতাকর্মী মহানগর পুলিশের উপকমিশনারের (দক্ষিণ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করা হলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে প্রচারণায় চলে যায়। শুধু দুই কর্মীই নয়, কয়েক দিনের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বাড়িতে অভিযানও চালায় পুলিশ। এ অবস্থায় নির্বাচনী মাঠ যেন ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বলে মনে করছে নগরবাসী।
 
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, ‘আমাদের চার-পাঁচজন নেতাকে ধরে নিয়ে এলো। তাঁদের ওপর কোনো ওয়ারেন্ট নেই, মামলা নেই। তাঁরা তো রাজনৈতিক কর্মীও না। একেবারে সাধারণ, ইলেকশন এলে কাজ করেন। তাঁদের ধরে আনার মানে আমাদের নির্বাচনী কাজে বাধা সৃষ্টির জন্য আতঙ্ক তৈরি করা।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোনো মিটিং-মিছিল করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা একটা বড় রাজনৈতিক দল হলেও নির্বাচনী কাজে বাধা দেওয়া হয়। অথচ জামায়াত নির্বিঘ্নে সব কাজ করে যাচ্ছে, তাদের পুলিশ কোনো হয়রানি করে না। এটা কিসের ইঙ্গিত? বিএনপির আরেক নেতা জামায়াতকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘কয়েকটা জায়গায় আমি নিজেই দেখেছি তাদের কর্মীরা কাজ করছে, যাদের বেশির ভাগই বাইরের লোক। কেউ বিশ্বনাথ, কেউ কানাইঘাট, কেউ অন্য অঞ্চল থেকে এসে কাজ করছে। তারা অনেক মামলার আসামি। হয়তো জামিনে আছে; কিন্তু তারা দিব্যি কাজ করে বেড়াচ্ছে। তাদের সরকার কোনো বাধা দিচ্ছে না।’
 
হামলার ঘটনা অস্বীকার করে মেয়র প্রার্থী জামায়াতের মহানগর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমার কর্মীরা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। তার পরও বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।’ 


মন্তব্য