kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সফল তাঁরা

প্রাইভেটে পড়েই সেরা

অনেকেরই ধারণা, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ না পেলে জীবনটাই বুঝি মিছে। কিন্তু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়ে অনেকেই সফল। এমন দুজনের গল্প শোনাচ্ছেন আতাউর রহমান কাবুল ও সানজিদ সাদ

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রাইভেটে পড়েই সেরা

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৯৮ সালে এমবিবিএস করেছেন। এরপর ডার্মাটোলজির ওপর নিয়েছেন এমসিপিএস, এফসিপিএস ডিগ্রি।

আমেরিকা থেকে এসথেটিক মেডিসিনে এবং গ্লাসগোর রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস থেকে ডার্মাটোলজিতে করেছেন ডিপ্লোমা। তিনি এখন নিজের ক্লিনিক ‘লেজার ট্রিটের’ চিফ কনসালট্যান্ট। সার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসথেটিক ডার্মাটোলজির ভাইস প্রেসিডেন্ট, লেজার ও কসমেটিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম জানাচ্ছেন তাঁর সাফল্যের কাহিনী

 

আমাদের সময়ে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের বাইরে প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে কেউ পড়বে—এটি মেনে নেওয়াই কঠিন ছিল। উচ্চ মাধ্যমিকের পর অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ভর্তি হইনি। মায়ের ইচ্ছা পূরণে ডাক্তার হতে ভর্তি হলাম চট্টগ্রামের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড হেলথ সায়েন্সে (এখন ইউএসটিসির একটা ফ্যাকাল্টি)। এর প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম স্যার। এটি ছিল চট্টগ্রামের একমাত্র বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ। আমরা ছিলাম এমবিবিএস থার্ড ব্যাচের ছাত্র। বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যালের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। তবে শুরুটা ছিল অনেক চ্যালেঞ্জের। আমাদের কোন হসপিটাল ঠিক ছিল না। আমাদেরকে যেতে হতো চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজসহ অন্যান্য হাসপাতালে। হসপিটাল স্থাপন, ভালো শিক্ষক দেয়া, বিএমডিসি ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি আদায়সহ নানা দাবিতে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। কলেজ বন্ধ রেখেছি কয়েক মাস। ১৯৯৩ সালে গঠিত হলো সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। বহুবার কারাবরণ করেছি, বহিষ্কৃতও হয়েছি। ফার্স্ট প্রফেশনাল পরীক্ষার আগে জানতে পারলাম, আমাদের স্বীকৃতিই নেই। তাই আমরা পরীক্ষা দিতে পারব না। বিরাট চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম। আবারো আন্দোলন শুরু করলাম। পরীক্ষার আগের দিন হাইকোর্টের রায় পেলাম যে পরীক্ষা দিতে পারব। এরপর পরীক্ষা দিলাম।

সুযোগ-সুবিধা কম পেলেও বেসরকারি মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা এখন কিন্তু ভালো রেজাল্ট করছে। একসময় ব্যাপারটা এ রকম ছিল, যারা সরকারি মেডিক্যালে চান্স পেত না তারাই প্রাইভেট মেডিক্যালে পড়ত। এখন কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এখন অনেকেই ঢাকার বাইরে যেতে চায় না। তারা হয়তো টার্গেটই করছে ভালোমানের কোনো এক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বের হবে। আমার মতে, রোগীর সংখ্যা যদি বেশি থাকে এবং শিক্ষক যদি পর্যাপ্ত থাকে, তবে যেকোনো বেসরকারি মেডিক্যালে পড়া যেতে পারে। তবে এটা ঠিক যে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় ও অন্য সুযোগ-সুবিধা থাকায় ক্লিনিক্যাল বিষয়গুলো শেখার জন্য সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোই সবার পছন্দের। তবে শিক্ষার্থীদের একটি বিষয় ভাবা উচিত, শুধু এমবিবিএস করেই কিন্তু পার পাওয়া যায় না। আরো পাড়ি দিতে হয় অনেক পথ।

ছোটবেলা থেকেই ক্রিয়েটিভ ছিলাম বলে সব সময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করতাম। ক্যাম্পাসেও সৃজনশীলতার চর্চার পরিবেশ ছিল। এমবিবিএস শেষ করে ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট হসপিটালে রেসিডেন্ট হিসেবে জয়েন করি। পরবর্তী সময়ে দেশের বিশিষ্ট স্কিন স্পেশালিস্ট প্রফেসর এম ইউ কবির চৌধুরী স্যারের সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছি। স্যার আমাকে কাজ শেখাতেন, বকা দিতেন—এমনকি ধরে মারতেনও। তবে কবির স্যার আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। স্যারের কাছে অনেক কিছু শিখেছি।

প্রশিক্ষণের জন্য তথা শেখার জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গিয়েছি। আমি দেখলাম, এখনকার দুনিয়াটা হচ্ছে এসথেটিক ডার্মাটোলজি বা লেজার যুগের। এরপর এসব বিষয়ে ব্যাপক খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম। ২০০৪ সালে শুরু করলাম লেজার মেডিকেল সেন্টার, লেজার চেইন। ২০১০ সালে দিলাম ‘লেজার ট্রিট’। বলা যায়, আমার মাধ্যমেই এসথেটিক ডার্মাটোলজির প্রায় সব ধরনের টেকনোলজি বাংলাদেশে এসেছে। এখন আমরা গর্ব করে বলতে পারি, এসথেটিক ডার্মাটোলজিতে বাংলাদেশ বিশ্বমানের। আমার স্ত্রী তনিমা ফেরদৌস দোলা আমার সঙ্গে সবকিছুতেই আছেন। স্ত্রী এবং এক ছেলে ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে সুখেই আছি।  

প্রাইভেট মেডিক্যাল থেকে পাস করলেও বক্তা হিসেবে বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছি। উত্তরায় ঢাকা ডার্মাটোলজি ইনস্টিটিউট নামে একটি স্বতন্ত্র হাসপাতাল করতে যাচ্ছি, যা চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শুরু হওয়ার কথা। এটি হবে চর্মরোগের ওপর দেশের সবচেয়ে বড় সেন্টার। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার হিসেবে এখানে গবেষণাও হবে।

জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম স্যার শুধু চিন্তা করেই বসে থাকতেন না। তিনি মনে করতেন, কোনো কিছু শুরু করে দিলেই শেষ হবে, পথে নামলেই পথের সন্ধান পাওয়া যাবে। আমিও এটা বিশ্বাস করে স্যারের কাছে সেই দীক্ষাটা পেয়েছি। তবে আমার সব কিছুতেই বড় প্রেরণার জায়গা ছিল আমার মা-বাবার উৎসাহ। তাছাড়া অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করেই আজ এ পর্যায়ে এসেছি।

 

 

জন্ম ১৯৮১ সালের ৩১ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ জেলার রামপাল ইউনিয়নের পশ্চিম কাজী কসবা গ্রামে। পড়াশোনা করেছেন পুরান ঢাকার বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) তিনি। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন সুমনা হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল পরিচালক হিসেবে। বেসরকারিতে পড়েও কিভাবে এত ভালো করছেন ডা. মো.নাজমুল হাসান? সাফল্যের কাহিনী শোনা যাক তাঁর মুখ থেকেই

 

বাবা ছিলেন পুরান ঢাকার স্বনামধন্য সুমনা হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ছেলে হবে নামকরা ডাক্তার। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম হাজি আমজাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে। বাবার স্বপ্নপূরণে এরপর চলে আসি ঢাকায়। ভর্তি হই ঢাকা গভর্মেন্ট মুসলিম হাই স্কুলে। ১৯৯৬ সালে সেখান থেকেই এসএসসি। ১৯৯৮ সালে এইচএসসি পাস করি পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে। ইচ্ছা ছিল সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়ার। কিন্তু চান্স না পাওয়ায় ভর্তি হতে হয় ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। বেসরকারি হলেও মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চান্স পাওয়া বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই বলত, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অনেক রোগী, অনেক শিক্ষক, শেখার জায়গাটা অনেক বড়। বেতনও দিতে হয় না। ওদের সঙ্গে দেখা হলে তখন নিজেকে ছোট মনে হতো। তখনই ঠিক করেছিলাম, আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে নিজের জায়গা করে নেব। ভাবনায় ছিল, ওদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে অনেক পরিশ্রম করতে হবে।

আমার কাছে যেটা মনে হয়, মেডিক্যালে পড়াশোনার জন্য তুখোড় মেধাবী হওয়ার প্রয়োজন নেই। দরকার নিয়মিত পড়াশোনা, নিয়মশৃঙ্খলা, পরিশ্রম, টিমওয়ার্ক খুব বেশি জরুরি। নিয়মিত পড়াশোনা করেছি। ২০১৪ সালে বিসিএস পাস করি। চারপাশে দেখেছি, সরকারি মেডিক্যালের স্টুডেন্টরা বড় বড় ডিগ্রি নেয়। আমারও ইচ্ছা ছিল তাদের মতো বড় ডিগ্রি নেব। তারই ফলে এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এমডি (নিউরোলজি) থিসিস পার্ট কোর্স করছি, এমআরসিপি শেষ পর্ব এবং এফসিপিএস পার্ট-২ (মেডিক্যাল) পরীক্ষা দেব।

সরকারি মেডিক্যালে সুযোগ না পেলে জীবনটা মিছে—এমন আমার কখনো মনে হয়নি। কেউ যদি ঠিকমতো পড়াশোনা করে এবং ইন্টার্নি পিরিয়ডে যত্নসহকারে রোগী দেখে, ট্রেনিং ঠিকমতো করে, তাহলে সে একজন ভালো ডাক্তার হতে পারে। এখন আমি ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) ও সুমনা হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ইচ্ছা আছে ডিগ্রিগুলো নিয়ে অধ্যাপক ও মানসম্মত চিকিৎসক হওয়ার। গরিব রোগীদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা আছে। বাবাও স্বপ্ন দেখতেন আমাদের গ্রামে একটা হাসপাতাল হবে, যাতে বিনা খরচে বা নামমাত্র খরচে গরিব রোগীরা সেবা পাবে। বাংলাদেশে প্রতি দুই হাজার মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক। শুধু সরকারি মেডিক্যাল দিয়ে সবার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ সরকারি মেডিক্যালের পাশাপাশি ডাক্তার তৈরিতে অবদান রাখছে। তবে কিছু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধে

অভিযোগ আছে, তাদের প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক, যন্ত্রপাতি, বই, লাইব্রেরি নেই। তাই ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বলব, কলেজ সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখবর নিয়েই তবে ভর্তি হবে। মনে রাখবে, তোমরা সেবামূলক ও চ্যালেঞ্জিং একটি পেশায় আসতে যাচ্ছো। মানষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা রোমাঞ্চকর আর কি হতে পারে!


মন্তব্য