kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ইন্টার্ন ডাক্তার

হাতে-কলমের জীবন

ইন্টার্নিতে গিয়েই তাঁরা হাতে-কলমে চিকিৎসা শুরু করেন। বইয়ের ভুবন ছেড়ে বাস্তবের রোগীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। সেই জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো জানাচ্ছেন হাবিবুর রহমান

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হাতে-কলমের জীবন

রোগী পরীক্ষা করছেন পপুলার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্ন ডাক্তাররা ছবি : লেখক

‘পাঁচ বছর এমবিবিএস পড়া শেষে এক বছর ইন্টার্নি করতে হয়। এত দিন লেখাপড়ার পর এখানেই হাতে-কলমের জীবন শুরু হয় এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায়ই বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

’ বলছিলেন ডা. কাউসার আহমেদ খান। তিনি এখন গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ইন্টার্নি করছেন। কাউসার এই জীবনের কথা এভাবে বললেন, ‘ইন্টার্নিতে আমাদের রোগী ও তাঁর আত্মীয়দের মানসিক অবস্থা বুঝতে হয়, তাঁর রোগের আরোগ্য কিভাবে সম্ভব, ওষুধপত্র কিভাবে খেতে হবে, তাঁর যত্ন কিভাবে নিতে হবে—এগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হয়। ’ তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল—‘ইন্টার্নি ডাক্তাররা চর্ম, যৌন, সার্জারি, চোখসহ মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে সাত থেকে ১৫ দিন প্র্যাকটিস করেন। ’ এটি তাঁদের রুটিন। কাউসার বললেন, ‘সকাল থেকে দুপুর টানা ডিউটি, মাঝে খাবার ও বিশ্রামের বিরতি দিয়ে আবার রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ডিউটি দিতে হয়। কখনো রোগীর অবস্থাভেদে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশিক্ষণও হাসপাতালে থাকতে হয়। ফলে আমাদের মধ্যে মানবিকতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। ’ তবে শুরুর দিকে কখন কী হয়ে যায়, এই ভেবে কমবেশি সবারই ভয় হয়। সে কথাই বললেন নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যালের ইন্টার্নি ডাক্তার খালিদ বিন ইসমাইল। তিনি আছেন প্রায় ১০ মাস ধরে। খালিদ বললেন, ‘প্রথম দিকে স্যাররা যা বলছেন সেসব ঠিকভাবে লিখতে পারছি কি না, প্রেসক্রিপশন লিখতে গিয়ে ভুল হচ্ছে কি না, ওষুধ বা চিকিৎসা দিতে গিয়ে রোগীর কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না—ভেবে খুব ভয় লাগত। ফলে বারবার স্যারদের জিজ্ঞাসা করে নিতাম। এখন অবশ্য সব সয়ে গেছে। ’ তিনি বললেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন না থাকলে সিনিয়ররা থাকেন না বলে রাতে ইন্টার্নি ডাক্তারদেরই বেশির ভাগ সময় ডিউটি দিতে হয়। তখন আমরা এক ধরনের আতঙ্কে থাকি। ’ রাতের সময়টুকু কেমন কাটে এ বিষয়ে বললেন, পপুলার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের আসিফ ফয়েজী, ‘কোনো রাতে একজন, কখনো দুজন ইন্টার্নি ডাক্তারকে থাকতে হয়। স্বীকার করছি—প্রথম এক মাস খুব খারাপ লেগেছে। আর কখন কী ধরনের রোগী আসে এ জন্য আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। ’ রাতের কর্তব্যের কথা বলতে গিয়ে নর্দানের ইন্টার্নি ডাক্তার মিতু বললেন, ‘রাতের ডিউটিতে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। তাঁকে নিয়ে খুব চিন্তা হয়। অনেক সময় সিনিয়ররা কল ধরেন না, তখন ভয় আরো বাড়ে। ’ এসব নবীন চিকিৎসককে নানা সময়ে অপারেশনেও সাহায্য করতে হয়। সে কথা বলতে গিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ডা. হাসিবুল ইসলাম বললেন, ‘প্রথম প্রথম তো ইনজেকশন দিতে গিয়েই ভয় লাগত। মনে হতো, ইনজেকশন ঠিকভাবে দিতে পারলাম তো? তবে এখন আর সমস্যা হচ্ছে না। ’ তিনি তাঁর একটি অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন, ‘আমার ইন্টার্ন শুরুর দিকে একজন আশঙ্কাজনক রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর পরিবার, চিকিৎসক—সবারই ধারণা ছিল, তিনি বাঁচবেন না। তিনি আমার হাতেই মৃত্যুবরণ করলেন। সেদিন সারাটি দিনই খুব খারাপ লেগেছে। কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। তাঁর মুখটাই চোখে ভেসেছে। এখন অনেকটা সয়ে গেছে। তার পরও আমার মনে হয়, রোগী মারা গেলে তাঁর আত্মীয়-পরিজনের পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও খুব খারাপ লাগে। ’

তবে মৃত্যুর সঙ্গে যেমন তাঁরা পরিচিত হন, তেমনি মানুষকে বাঁচানোর আনন্দেও ভাসেন। তেমনই একটি গল্প শোনালেন পপুলার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্নি ডাক্তার আবদুল্লাহ আল-মামুন—‘আমাদের কাছে সাতক্ষীরা থেকে এক বয়স্ক রোগী এসেছিলেন। তিনি ১৭ বছর ধরে গোপন এক রোগে ভুগছেন। কোনো হাসপাতালই তাঁর অপারেশন করতে রাজি না। ফলে এখানে এলেন। তাঁর অবস্থা দেখে ডিউটি আওয়ারেরও বেশি সময় তাঁকে দেখাশোনা করতে হয়েছে। পরে তাঁর অপারেশন হলো। ১৫ দিন পর ব্যান্ডেজ খোলা হলো। সমস্যাটি আর নেই দেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর সে কী কান্না! এটিই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এখনো তিনি কয়েক সপ্তাহ পর পর ফোন করে আমার খোঁজখবর নেন। ’


মন্তব্য