kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সকাল সন্ধ্যার গল্প

লেখাপড়া, তুমুল ব্যস্ততার ফাঁকেও তাঁরা কবিতা লেখেন, গান করেন। কখনো দল বেঁধে ঘুরতে যান। প্রেমও হয় কারো কারো। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের কাহিনী শোনাচ্ছেন হিমেল হাসান। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সকাল সন্ধ্যার গল্প

‘যারা সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়ে, তাদের চেয়ে আমাদের চাপ আরো বেশি। কারণ মা-বাবার টাকায় পড়ছি, এত টাকা দিতে হচ্ছে—এই ভাবনা তো সব সময় কুরে কুরে খায়ই, তার ওপর আছে লেখাপড়ার প্রচণ্ড চাপ।

পাস করে ভালো জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ভাবনাটিও মাথা থেকে কোনোমতে যায় না। ’ বলছিলেন নেয়ামুল কবীর। তিনি নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। তার পরও অন্যদের মতো তাঁদেরও ছাত্রজীবনটা সুখ-দুঃখ মিলিয়ে কাটে। তাঁরাও বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধা পড়েন, প্রেম করেন, গান গান, আড্ডা জমান। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কাজে যুক্ত থাকেন তাঁদের অনেকেই। সে গল্পই বললেন আবু জাফর। তিনি পড়েন খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজে। জাফর বললেন, ‘সব সময় রোগী-অসুখ নিয়ে থাকতে হয় বলে আমরা রক্তদানের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝি। কখনো নিজেরা রক্ত দিই। কোনো কারণে সেটি না পারলে জরুরি প্রয়োজনে রক্তের ব্যবস্থা করে দিই। আমি নিজেই তো আমাদের কলেজে ইউনিটের বাঁধনের সঙ্গে যুক্ত আছি। ’

তাঁরা নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত থাকেন। গ্রিন ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজের তাসমিন নিয়মিত গান করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি গানের পোকা। নিজে গান, অবসরে গান শোনেন। কলেজের যেকোনো আয়োজনে আধুনিক গান করে মাতিয়ে দেন সবাইকে। বাংলাদেশ মেডিক্যালের আসিফ তাঁদের কলেজে নাটকের দল গড়ে তুলেছেন। প্রতিবছর বিভিন্ন জাতীয় দিবসে, কলেজের বিভিন্ন আয়োজনে তাঁরা নাটক পরিবেশন করেন। এবারের জাতীয় শোক দিবসেও তাঁরা নাটক করেছেন। সেটির নাম হলো ‘তুমি আসবে বলে’। নাটকটি লিখেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আলী আকবর। স্যাররা নাটকটি দেখে খুব খুশি হয়েছেন বলে জানালেন আকবর।

নাইটিংগেল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র মুকুলদের একটি গানের দল আছে। তাঁরা অবসরে গিটার নিয়ে বসে পড়েন। জনপ্রিয় শিল্পীদের গান করে আসর জমান। আবার এমনও দেখা যায়, কোনো ক্লাসের পর বিরতিতে গিটার নিয়ে বসে পড়েছেন তিনি, অন্যরা গলা মেলাচ্ছেন। তবে এত কিছুর মধ্যেও তাঁদের বেশির ভাগ সময় কাটে পড়ার টেবিলে। সে কথাই বললেন আনোয়ার খান মর্ডান মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মেহেদী হাসান, ‘মেডিক্যালে পড়তে এসেছি বলে আমরা জানি মানুষের অসুস্থতা নিয়ে হেলাফেলা করা যাবে না। ফলে তাদের রোগগুলো জানতে হবে, সেগুলোর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসাও শিখতে হবে। সে জন্যই এত লেখাপড়া করতে হয়। ’ তাই ক্লাসের পর লাইব্রেরিতে গ্রুপ স্টাডি করেন তাঁরা। কখনো হোস্টেলের রুমে বন্ধুরা মিলে পড়া বুঝে নেন। নিজেরাই কখনো কুইজের আয়োজন করে মেধাটাকে আরো ঝালিয়ে নেন। এ প্রসঙ্গে প্রাইম মেডিক্যালের প্রিমা মজুমদার বললেন, ‘গত সপ্তাহে বড় বোনের ছেলে হলো। পরীক্ষার এত চাপ ছিল যে ভাগ্নেকে দেখতেও যেতে পারিনি। ভাতিজির আকিকার দিনও ছিলাম না। সেদিন আমার আইটেম—মানে ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা ছিল। আইটেমে পাস না করলে তো পরের পরীক্ষা দিতে পারব না। তবে এসব দুঃখ অভ্যাস হয়ে গেছে। কখনো কখনো ঠিকই সব ম্যানেজ করে ফেলি। তখন বাড়ি চলে যাই। ’ এভাবে লেখাপড়া নিয়ে থাকতে থাকতে যখন হাঁপ ধরে যায়, তাঁরা বেরিয়ে পড়েন। কয় দিন আগেই তো সাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীরা সবাই মিলে কক্সবাজার ঘুরে এলেন। ২৫ জনের একটি বিশাল দল গিয়েছিল, সঙ্গে শিক্ষকরাও ছিলেন। ক্লাসের রাশভারি শিক্ষকরা সেখানে গিয়ে তাঁদের বন্ধু হয়েছেন। ক্লাসের এই গল্পে নিশিতার গল্পটি বলি। তিনি পড়েন শমরিতা মেডিক্যালের চতুর্থ বর্ষে। স্যারের লেকচার ভালো লাগে না বলে ব্যাগে গল্পের বই নিয়ে যান। পেছনের বেঞ্চে বসে পড়েন হুমায়ূন আহমেদের ‘মিসির আলি’ বা ‘হিমু’ সিরিজ অথবা হেলাল হাফিজের ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। ভালো আবৃত্তি করেন তিনি। গেল বইমেলায় তাঁর একটি উপন্যাস বেরিয়েছে। বড় লেখক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর। তিনি যেমন গল্প-কবিতা নিয়ে আছেন, কেউ আছেন নিজেদের নিয়ে। যেমন রংপুর কমিউনিটি মেডিক্যালের সুমাইয়া রহমান ও সাদ সাত্তার। তাঁদের পরিচয় কলেজের প্রথম দিনে। বাড়িও একই এলাকায়। ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া, ফেসবুকে কথা বলতে বলতে আরো পরিচিত হলেন। একসঙ্গে পড়া বুঝে নেন, অবসরে ঘোরাঘুরি হয়, কোথাও খেতে যান। কখনো একই বাসে বাড়ি চলে যান দুজনে। এভাবেই ঘনিষ্ঠতা। বন্ধুত্ব থেকেই প্রেম। সে গল্পই বললেন সুমাইয়া, ‘বন্ধুত্ব যে কখন ভালোবাসায় গড়ালো, কেউ টেরই পাইনি। একসঙ্গে পড়াশোনা করি, খাইদাই, ঘুরি-ফিরি। একে অন্যকে সব বিষয়ে সাহায্য করি। এখন সম্পর্কটা অন্যদিকে চলে গেছে, তবে বন্ধুত্ব আগের মতোই আছে। ’

 


মন্তব্য