kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির স্বপ্নপূরণ

সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ হয় না সবার। বেশির ভাগই থেকে যায় তালিকার বাইরে। এদের জন্য অনেক সুযোগ আছে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে। বেসরকারি মেডিক্যাল শিক্ষার ক্ষেত্র ও সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন তৌফিক মারুফ

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির স্বপ্নপূরণ

ছবি : আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে

বড় হলে কী হবে? জবাব—‘ডাক্তার হব। ’ দেশের শিক্ষিত বা শিক্ষায় আগ্রহী পরিবারের সন্তানদের একাংশের শৈশবকালে এমন কথা শুনতে পাওয়া যায় এখনো।

যদিও এখন শিশুদের এমন প্রশ্ন করাটাও ঠিক নয় বলে মনে করেন মুক্তচিন্তার মানুষরা। তবে বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, ডাক্তার হওয়ার শখ বা ইচ্ছা আছে অনেকেরই। পেশাটি আগে শুধু মানবসেবার ব্রতের মধ্যে থাকলেও এখন কি শুধুই সেবার গণ্ডিতে আছে? নেই। ভালো হোক মন্দ হোক, ডালপালা ছড়িয়েছে সামাজিক পরিচিতি, মর্যাদা এবং সর্বোপরি স্বাবলম্বী হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। অন্য পেশায় যেমন পাস করেও চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে সংশয়ে থাকতে হয়, ডাক্তারি পাস করার পর সেই চিন্তা থাকে না বললেই চলে। শুধু প্রয়োজন মানুষকে উপযুক্ত মানদণ্ডে চিকিৎসা দেওয়ার মেধাগত যোগ্যতাটুকু।

সরকারি চাকরি পাওয়া গেল না, তাতে কিছু আসে-যায় না, বেসরকারি সেক্টরে চাকরি তো ডাক্তারদের জন্য সব সময় হাত বাড়িয়ে আছে। সরকারি কিংবা বেসরকারি, কোথাও চাকরি হচ্ছে না কিংবা চাকরি করবেন না—তাতেই বা কি। যোগ্যতা আর বিধিবিধান মেনে নিজেই প্র্যাকটিস শুরু করার পথ তো খোলা আছেই এ পেশায়। তাই স্বপ্নের কমতি নেই ডাক্তারিতে। কিন্তু এই স্বপ্নপূরণে পার করতে হয় অনেক ধাপ, যার শুরুটা করতে হচ্ছে এমবিবিএস কোর্সের প্রথম বর্ষে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

সুযোগ মানে মেধার লড়াই, কোটার লড়াই, টাকার লড়াই আর আসনসংখ্যার লড়াই। অবশ্য সরকারি কলেজে ভর্তির জন্য এ লড়াই শুধু জাতীয় মেধাভিত্তিক একটি ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যেই সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু যারা সরকারিতে সুযোগ পায় না তাদের জন্য এ লড়াইয়ের পথটা হয়ে ওঠে আরো দীর্ঘ। সেই সঙ্গে নিয়মনীতির অনেক এপাশ-ওপাশ তো আছেই।

বলা যায়, অনেক দিন পর এবার ‘প্রশ্নহীন’ একটি ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ পেল এমবিবিএস কোর্সে ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীরা! মানে এবারের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অন্তত কোনো প্রশ্ন ওঠেনি কোনো মহলে; প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। বরং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক সুশৃঙ্খল ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। আর এমন একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীরাই এবার ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে দেশের ৩০টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের তিন হাজার ২১২টি এবং ৬৭টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছয় হাজার ২০৫টি আসনে। এই আসনগুলোতে ভর্তির সুযোগ পেতে গেল ৭ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদনকারী ছিল ৯০ হাজার ৪২৬ জন। ঢাকাসহ সারা দেশের ১৮টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ কেন্দ্রের ৩৭টি ভেন্যুতে এই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের ভর্তি পরীক্ষায় আরেকটি নতুন দিক হচ্ছে, আগে প্রতিবার মেডিক্যাল ও ডেন্টাল পরীক্ষা একই সঙ্গে হলেও এবার ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে এ প্রক্রিয়া হচ্ছে আলাদা। এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা ৭ অক্টোবর হয়ে গেছে, ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে ১০ অক্টোবর। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ২৯ হাজার ১৮৩ জন।

স্বাভাবিকভাবেই সবাই সুযোগ পাচ্ছে না সরকারি কলেজগুলোতে। ফলে পাস করেই বড় একটি অংশকে আবার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে আরেক যুদ্ধজয়ের জন্য। কারণ দেশে যেমন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের চেয়ে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা দ্বিগুণ, তেমনি আসনসংখ্যাও সরকারির চেয়ে বেসরকারিতে বেশি। কিন্তু কে কোন কলেজ রেখে কোন কলেজে ভর্তি হবে, তা নিয়ে সংশয়ে ডুবে থাকছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। যারা সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না, তাদের মধ্য থেকেই সুযোগ মিলবে বেসরকারিতে ভর্তির। এ ক্ষেত্রে আছে ভর্তি ফির ব্যাপার। আছে মেধা ও কোটাভিত্তিক জটিল অনেক অঙ্ক।

অঙ্ক তো থাকবেই। টাকার অঙ্ক আর কোটার অঙ্কের পাশাপাশি মেধার অঙ্ক নিয়েই বেশি চিন্তিত থাকে সবাই। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশিকা অনুসারে চিন্তার খুব একটা কারণ নেই বেসরকারি মেডিক্যালে ভর্তির ক্ষেত্রে। শুধু টাকা আর মেধার সমন্বয়টা থাকলেই হলো। ওই নির্দেশিকায় বলা আছে, জাতীয়ভাবে গৃহীত এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় যেসব প্রার্থী বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে চায়, মেধা অনুযায়ী তাদের মধ্য থেকে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পর্যন্ত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য উপযুক্ত বলে ঘোষণা করা হবে। উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই তালিকার ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে তার কলেজে ভর্তীচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের দরখাস্ত আহ্বান করবে। প্রাপ্ত আবেদন থেকে মেধাতালিকা অনুযায়ী ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রতি দফায় ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা ও জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগে পাঠাবে। ফলে যেমন শুধু টাকা থাকলেই স্বপ্ন পূরণ হবে না, তেমনি আবার শুধু মেধা থাকলেই হবে না; টাকাও লাগবে। আগের দুই বছর সরকার বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি ফি ১৫ লাখ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এবার সাবেকটাই বহাল থাকবে, নাকি নতুন কিছু হবে তা অবশ্য এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঠিক হয়নি। আগামী ২০ অক্টোবর থেকে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি শুরু হবে, চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। সবারই জানা, সরকারি মেডিক্যালে ভর্তি শেষ হলেই বেসরকারিতে শুরু হবে। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জানার বিষয় হচ্ছে, কোন কলেজের মান ও অবস্থান কেমন। সরকারের উপযুক্ত অনুমোদন আছে কি না, শিক্ষার পরিবেশত মান, শিক্ষকদের মান, শিক্ষক কারা আছেন, হাসপাতাল আছে কি না, থাকলেও ছাত্রছাত্রীর কোটা অনুসারে হাসপাতালের আসনসংখ্যা ঠিকঠাক আছে কি না। রোগীর ভিড় বা চিকিৎসা পরিস্থিতি কেমন আছে, তা-ও জানা জরুরি। কারণ বড় কলেজ ভবন থাকলেই তো আর মেডিক্যাল শিক্ষা হবে না। সংযুক্ত হাসপাতালটিতে নির্দিষ্টসংখ্যক রোগী না থাকলে, চিকিৎসা না থাকলে আর যা-ই হোক, আপনার প্রকৃত শিক্ষা হবে না। কারণ পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবেই উপযুক্ত হারে রোগী লাগবে।

তাই ভালো ডাক্তার হতে হলে পড়তে হবে ভালো একটি মেডিক্যাল কলেজে। ভালো কলেজ মানে আকারে-আয়তনে-ভবনে বড় বা দৃষ্টিনন্দন হলেই হবে না; অবশ্যই শিক্ষায় চাই ভালো মান, চিকিৎসাবিদ্যায় ভালো, দক্ষ, মেধাবী ও দায়িত্বশীল একদল শিক্ষক। থাকবে অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয় সব সুবিধা।

 

টিপস

♦  ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই শুধু সরকারি বা বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে পারে। অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অন্য কোনো উপায়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ নেই।

♦  সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়নি কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এমন শিক্ষার্থীরাই শুধু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়।

♦  টাকা থাকলেই ডাক্তার হওয়া যায়—এমন চিন্তা করে বেসরকারি মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া ঠিক নয়।

♦  বেসরকারি মেডিক্যালে ভর্তির ক্ষেত্রে খেয়াল করতে হবে কলেজটি বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনপ্রাপ্ত কি না। এ ক্ষেত্রে বিএমডিসির ওয়েবসাইটের লিংক (bmdc.org.bd/recognized-medical-and-dental-colleges) থেকে নিশ্চিত হতে হবে।

♦  কলেজের সিনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে, কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কি না, আর এখানে ব্যবহারিক সুবিধা মানসম্মত কি না।

 


মন্তব্য