kalerkantho


উন্নয়নের ১০ বছরে ইসলামের প্রচার ও প্রসার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৬:২৪



উন্নয়নের ১০ বছরে ইসলামের প্রচার ও প্রসার

১০ বছর ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এই সময়ে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ছোঁয়া লেগেছে সর্বত্র। নজর কেড়েছে গোটা বিশ্বের। মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বহুমুখী কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়নে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সর্বাধিক কর্মসূচি  গ্রহণ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে খবর নিয়েছেন দৈনিক কালের কণ্ঠ’র ধর্ম বিভাগীয় সম্পাদক মুফতি কাসেম শরীফ

কওমি মাদরাসার সনদের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
কওমি মাদরাসা মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদরাসার আলোকে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা। এটি পরিচালিত হয় বিখ্যাত দরসে নিজামি অনুসরণ করে। দেওবন্দ ও দেওবন্দের পদাঙ্ক অনুসরণকারী এসব মাদরাসায় কোরআন-হাদিসের মূল ধারার শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। প্রায় দেড় শ বছরের পুরনো এই শিক্ষাধারার জাগতিক ও রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে।

কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ২০০৯ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী আলিমদের সঙ্গে যে আলোচনার সূত্রপাত করেন, সেটি ২০১০ সালে গ্রহণ করা শিক্ষানীতিতেও স্থান পায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদরাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। সে সময় কওমি শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালে কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নে আল্লামা আহমদ শফউ (দা.বা.)-এর নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে সরকার।

২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ঘোষণা করেন উলামায়ে কেরামের এক সর্বোচ্চ মজলিসে। ওই মজলিসে তিনি কওমি মাদরাসা বিষয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যে কথাগুলো তিনি বলেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কথা হলো—এক. বাংলাদেশে (তথা উপমহাদেশে) শিক্ষার সূচনা হয়েছে কওমি মাদরাসার মাধ্যমে। এটা যদি শুরু না হতো, তাহলে আমরা কেউ শিক্ষিত হতে পারতাম না। দুই. ভারতবর্ষে স্বাধীনতার সূত্রপাত উলামায়ে দেওবন্দের আন্দোলনের মাধ্যমে। তিন. বাংলাদেশে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া হয় কওমি মাদরাসাগুলোতে। কওমি মাদরাসা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও অবদানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি দিয়েছেন। একইভাবে তিনি কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বলা যায়, উপমহাদেশের সুপ্রাচীন এ শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসের পাতায় তিনি তাঁর নাম যুক্ত করে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ১৩ আগস্ট ২০১৮ (সোমবার) কওমি সনদের স্বীকৃতি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ (বুধবার) এসংক্রান্ত ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন ‘কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হয়।

গত ৮ অক্টোবর ২০১৮ (সোমবার) মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ কওমি সনদের স্বীকৃতি আইনে স্বাক্ষর করেন এবং আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
স্বাধীন বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার পুনর্গঠনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে বঙ্গবন্ধু সে সময়ে বাজেটে সর্বাধিক বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে বামপন্থীরা হরতাল ডেকেছিল; কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। সেই থেকে শুরু। বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার স্বর্ণযুগ চলছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যার হাতে এখন রাষ্ট্রক্ষমতা। তিনি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করার লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। তার অন্যতম হলো ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ২০১৩ সালে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের অধিভুক্ত প্রথম আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।

২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস করা হয় বহুল প্রতীক্ষিত অ্যাফিলিয়েটিং (স্বতন্ত্র) ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদরাসা শিক্ষাধারার ফাজিল/স্নাতক ও কামিল/স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডিগ্রি প্রদান করা হয়। মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ফাজিল/স্নাতক, কামিল/স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাক্রম/পাঠ্যপুস্তক অনুমোদন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাঙ্গনগুলোর তদারকি ও পরিবীক্ষণ, পরীক্ষা পরিচালনাসহ সার্বিক তত্ত্বাবধান করে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।

এর আগে ৬ আগস্ট ২০১২ ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১২-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা কমিটি। এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনুমোদনকারী বা অ্যাফিলিয়েটিং ক্ষমতাসম্পন্ন ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিল প্রস্তুত করা হয়।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল শুধুই স্বপ্ন। এখন তা দিবালোকের মতো সমুজ্জ্বল বাস্তব। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ২৩৫ বছর আগের মাওলানা মজদুদ্দীন ওরফে মোল্লা মদনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আলিয়া মাদরাসার গভীর যোগসূত্র। দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্র হলো, সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয় এবং মাত্র দুই বছরের মাথায় সেপ্টেম্বর মাসেই বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তার উদ্বোধন করা হয়। অন্যদিকে ১৭৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে এই ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৮০টি সরকারি মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু হয়েছে এবং ৩০টি মাদরাসায় মাস্টার্স কোর্স চালু হয়েছে।

মসজিদ-মক্তবভিত্তিক শিক্ষার পুনঃপ্রচলন
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্ম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত UNESCO-এর  Studies on Compulsory Education -এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা ও ধর্মকে অত্যন্ত অঙ্গাঙ্গিভাবে বিবেচনা করা হতো।’ সে আমলে মুসলিম পরিবারের শিশুদের হাতেখড়ি হতো পবিত্র কোরআনের শিক্ষার মাধ্যমে। ইতিহাসবিদ এ আর মল্লিক লিখেছেন, ‘বাংলার মুসলমানদের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখন কোনো সন্তানের বয়স চার বছর চার মাস চার দিন পূর্ণ হতো, তখন তার বিদ্যাশিক্ষার সূচনা হতো। একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের কিছু অংশ শিশুকে পাঠ করে শোনানো হতো। শিশু তা পুনরাবৃত্তি করত। এ ছিল প্রতিটি মুসলিম পরিবারের অপরিহার্য প্রথা।

|’ (A. R. Mallic, British policy and Muslim in Bengal, p. 149) মাদরাসা শিক্ষা বিস্তারে মুসলিম শাসকদের অবদান প্রসঙ্গে এফ ফজলুর রহমান লিখেছেন, ‘ডাব্লিউ অ্যাডমের মতে, সে আমলে অতি সুলভে এমনকি বলতে গেলে বিনা পয়সায় শিক্ষা লাভ করা যেত। প্রতিটি মসজিদ ছিল মুসলিম জনগণের কেন্দ্রীয় আকর্ষণস্থল। আর মসজিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল মাদরাসা।’  (The Bengali Muslim and English Education, p. ১৪০)

কিন্তু পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থায় অনিবার্য পরিণতিতে এই মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বিলুপ্ত হতে থাকে। এটা নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করতে থাকে। আশার কথা হলো, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই মসজিদ-মক্তবভিত্তিক শিক্ষাধারা পুনঃপ্রচলন ঘটিয়েছে। বিগত ১০ বছরে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় ২৬ হাজার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে ৪৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক ও নৈতিকতা শিক্ষা, ১৭ হাজার ৪০০টি কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে ৩১ লাখ ২৯ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীকে পবিত্র কোরআন শিক্ষা এবং ৭৬৮টি বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে এক লাখ ৬৯ হাজার বয়স্ক ব্যক্তিকে সাক্ষরতা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। (তথ্যসূত্র : ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের এক দশক’, আইসিএলডিএস ও তথ্য মন্ত্রণালয়)



মন্তব্য