kalerkantho


যেসব মুসলমান নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন

মুফতি তাজুল ইসলাম   

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০৮:৪৯



যেসব মুসলমান নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন

নোবেল পুরস্কার আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। সর্বপ্রথম তা প্রবর্তিত হয় ১৯০১ সালে। পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফলতা ও অনন্যসাধারণ গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণে দৃষ্টান্তমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ওই বছর থেকে ধারাবাহিক এ পুরস্কার দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ এ পুরস্কারের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মোট ১৩ জন মুসলিম ব্যক্তিত্ব নোবেলের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের ব্যাপারে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

মুহাম্মদ আনওয়ার সাদাত
(১৯৭৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

মিসরের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি আনওয়ার সাদাত ছিলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রথম মুসলমান। ১৯৭৩ সালে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ উদ্ধারের জন্য ইয়ম কিপুর যুদ্ধে তিনি মিসরের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল তা দখল করে নিয়েছিল। এরপর তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির কারণে আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিম ১৯৭৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। 

মুহাম্মদ আবদুস সালাম
(১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

প্রফেসর মুহাম্মদ আবদুস সালাম। তিনি পাকিস্তানি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৭৯ সালে স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ও শেল্ডন লি গ্ল্যাশোর সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। দুর্বল তড়িত্তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য তাঁরা এ পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ তত্ত্বের মাধ্যমে তড়িৎ চৌম্বক বল এবং দুর্বল নিউক্লিয় বলকে একীভূত করা সম্ভব হয়েছিল।

নাজিব মাহফুজ
(১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

নাজিব মাহফুজ নোবেল বিজয়ী মিসরীয় সাহিত্যিক। ১৭ বছর বয়স থেকে নাজিব মাহফুজ লেখালেখি শুরু করেন। জীবনে মোট ৩০টি উপন্যাস লিখলেও ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত ‘কায়রো ট্রিলজি’ তাঁকে আরবি সাহিত্যের অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে। এতে তিনি মিসরের ঐতিহ্যবাহী শহুরে জীবনধারা নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন। উচ্চমার্গীয় এ উপন্যাসের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৮ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ইয়াসির আরাফাত
(১৯৯৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

ইয়াসির আরাফাত ছিলেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী একজন নেতা। ১৯৯৪ সালে ঐতিহাসিক অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের পর আইজাক রবিন, শিমন পেরেজ ও ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার লাভকারী প্রথম ফিলিস্তিনি মুসলমান তিনি। 

আহমদ জুয়েল হাসান
(১৯৯৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

ফেমটোসেকেন্ড স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের জন্য রাসায়নিক ক্ষেত্রে গবেষণা করে ১৯৯৯ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি প্রথম মুসলিম রসায়নবিদ ও দ্বিতীয় মুসলিম বিজ্ঞানী হিসেবে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন। 

শিরিন এবাদি
(২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

তিনি প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি প্রথম ও একমাত্র ইরানি, যাঁকে শান্তির জন্য এ সম্মান দেওয়া হয়। শিরিন এবাদি ব্যক্তিগত জীবনে একজন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় অবদান রাখার জন্য তিনি এ পুরস্কার লাভ করেন।

মুহাম্মদ আল-বারাদি
(২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

মুহাম্মদ আল-বারাদি মিসরের উপরাষ্ট্রপতি এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় মিসরীয়, যাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে তিনিও আইএইএ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস
(২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি একমাত্র বাংলাদেশি মুসলিম, যাঁকে শান্তির জন্য এ সম্মান দেওয়া হয়। এবং তিনি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী তৃতীয় বাঙালি। 

ওরহান পামুক
(২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

ওরহান পামুক একজন তুর্কি ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্য সম্পাদক ও শিক্ষক। ২০০৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হন। তুরস্কের অন্যতম প্রধান লেখক ওরহানের বই বিশ্বের ৬০টির বেশি ভাষায় ও ১০০টির বেশি দেশে এবং ১৪ মিলিয়নের বেশি বিক্রি হয়েছে। তিনি তুরস্কের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ উপন্যাস হচ্ছে ‘নিউ লাইফ’। 

তাওয়াক্কুল কারমান
(২০১১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

তাওয়াক্কুল কারমান একজন ইয়েমেনি সাংবাদিক ও ইয়েমেনের আল-ইসলাহ রাজনৈতিক দলের প্রবীণ সদস্য। তিনি ‘উইমেন জার্নালিস্ট উইদাউট চেইন্স’ নামের নারী সাংবাদিকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দেন।  তিনি ২০১১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন। তিনিই প্রথম ইয়েমেনি ও প্রথম আরবি নারী হিসেবে এ পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া তিনি দ্বিতীয় মুসলিম নারী ও দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে নোবেল শান্তি পদক লাভ করেন। 

মালালা ইউসুফ জাই
(২০১৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

মালালা একজন পাকিস্তানি শিক্ষা আন্দোলনকর্মী। তিনি সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত উপত্যকা অঞ্চলে শিক্ষা এবং নারী অধিকারের ওপর আন্দোলনের জন্য তিনি পরিচিত। 

আজিজ সানজার
(২০১৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন)

আজিজ সানজার তুর্কি বংশোদ্ভূত একজন আমেরিকান প্রাণরসায়নবিদ ও কোষবৈজ্ঞানিক। ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ পুনরায় উৎপাদনসংক্রান্ত গবেষণার জন্য ২০১৫ সালে থমাস লিন্ডাল ও পল মড্রিকের সঙ্গে যৌথভাবে রসায়নে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

তিনি প্রথম তুর্কি রসায়নবিদ এবং দ্বিতীয় তুর্কি ও তৃতীয় মুসলিম বিজ্ঞানী হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। 

নাদিয়া মুরাদ
(২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ)

এ বছর শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ইরাকের কুর্দি মানবাধিকারকর্মী নাদিয়া মুরাদ এবং কঙ্গোর চিকিৎসক ডেনিস মুকওয়েগে।

২৫ বছর বয়সী নাদিয়া মুরাদ ইরাকের সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে নির্যাতিত ও ধর্ষিত হয়েছিলেন। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে উত্তর ইরাকের কোজো এলাকা থেকে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে আইএসের একটি পক্ষের কাছে যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয় আরেকটি পক্ষ। অনেক কষ্ট-সংগ্রাম-কৌশল করে কয়েক মাস পর পালিয়ে আসেন নাদিয়া। এরপর তিনি আইএসের হাতে বন্দি ইয়াজিদি নারীদের মুক্তির জন্য লড়াই শুরু করেন।

নাদিয়া মুরাদ শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ। সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে ১৭ বছর বয়সে ২০১৪ সালের শান্তিতে নোবেল লাভ করেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক



মন্তব্য