kalerkantho


কোরবানির চামড়াবাণিজ্য: কার হক কে খায়

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

৩১ আগস্ট, ২০১৮ ১০:৪২



কোরবানির চামড়াবাণিজ্য: কার হক কে খায়

কোরবানি মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যাদের ওপর জাকাত ওয়াজিব, তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য স্বার্থত্যাগ, আত্মত্যাগ ও সম্পদ ত্যাগই হলো কোরবানি। কোরবানি শুধু একটি আনন্দ উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও দর্শন। ঈদুল আজহা আত্মত্যাগের  প্রেরণায় উজ্জীবিত এক অনন্য আনন্দ উৎসব। যে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ মূর্ত হয় মানুষের জীবনে, তার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকারের এক প্রতীকী আচার এই কোরবানি। ঈদুল আজহার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিজের অহমিকা ও উচ্চাভিলাষ উৎসর্গ করা। পশু কোরবানির ভেতর দিয়ে মানুষের ভেতরে থাকা পশুশক্তি, কাম-ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপুকে ত্যাগ করতে হয়। কোরবানিদাতা শুধু পশুর গলায় ছুরি চালায় না, সে তার সব কুপ্রবৃত্তির ওপর ছুরি চালিয়ে তাকে নির্মূল করে। এটাই হলো কোরবানির মূল শিক্ষা। কোরবানির রক্ত-গোশত-চামড়া কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। পৌঁছে শুধু তাকওয়া বা খোদাভীতি। কোরআনে এসেছে : ‘আল্লাহর কাছে কখনোই পশুর রক্ত ও মাংস পৌঁছে না। বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া বা খোদাভীতি।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)

কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারি হয়। তাই এর কোনো অংশ বিক্রি করা জায়েজ নেই। কোরবানি একটি ইবাদত। তাই কোরবানি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে শরিয়তের বিধান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কোরবানির পশুর গোশত ও চামড়া কোরবানিরই অংশ। এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো—এক. কোরবানির পশুর কোনো অংশ যেমন—গোশত, চর্বি, হাড্ডি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েজ নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৫/৮১)

দুই. পশুর চামড়া কোরবানিদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে, তাহলে বিক্রিলব্ধ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩০১)

তিন. কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তিকে সদকা করে মালিক বানিয়ে দেওয়া জরুরি। তা মাদরাসা-মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণে খরচ করা জায়েজ নয়। তবে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের জন্য দেওয়া যাবে। (ফাতাওয়া কাজিখান : ৩/৩৫৪)

চার. কোরবানির চামড়া গরিবের হক। গরিব লোকদের না দিয়ে কোরবানির চামড়ার মূল্য দিয়ে ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন, শিক্ষক ও কর্মচারীর বেতন দেওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ২/৩৩৯)

কিন্তু আশ্চর্য হলো, গরিবের হক মেরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার মুনাফাখুরির যে মহড়া দেখিয়েছে, তাতে গোটা বিশ্বে বাঙালি মুসলমানের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

সারা দেশে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কোরবানিদাতারা পশুর চামড়া বিক্রির টাকা এলাকার এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিংসহ গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। কেউ কেউ মসজিদ-মাদরাসা ও কবরস্থানের জন্যও দান করেন। এবার চামড়া নামমাত্র দামে বিক্রি হওয়ায় দুস্থ-অসহায়রা চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, কয়েক বছর ধরেই পরিকল্পিতভাবে কোরবানির পশুর চামড়ার দর আগের বছরের তুলনায় কমিয়ে নির্ধারণ করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। এটাও বলা হয়ে থাকে যে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছে।

এ বছর সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম হচ্ছে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা।

বাস্তবে এর চেয়েও কম দামে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে কোরবানির দিন ও তার পরের দিন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন। আর ঢাকার বাইরে কেনাবেচা হয়েছে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। অথচ লবণ দেওয়ার পর কোরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুট চামড়া এক হাজার থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকায় কেনাবেচা হওয়ার কথা।

প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এক কোটি পাঁচ লাখ পশু কোরবানির জন্য বিক্রি হয়েছিল। এবার তার পরিমাণ এক কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার। অর্থাৎ গতবারের চেয়েও এবার বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। কিন্তু এর পরও এবার চামড়া নিয়ে কারসাজির শেষ নেই। কেন এমনটি হলো—

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চামড়া নিয়ে এবার একটা সংকট দেখা দিয়েছে। আমি যখন দামটা কমালাম, তখন সাংবাদিকদের মধ্যেও তার প্রতিক্রিয়া দেখেছি যে দাম কেন কমালাম? কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দাম কমানোর পরও কিন্তু এখন তা বিক্রি হচ্ছে না। তার এক নম্বর কারণ হলো, গতবারের চামড়া রয়ে গেছে। দুই নম্বর কারণ, ট্যানারি মালিকরা বলছেন যে তাঁরা ব্যাংকের ঋণ সঠিক সময়ে পাননি। আর তিন নম্বর কারণ, সাভারে যে শিল্পগুলো হওয়ার কথা, সব শিল্প সেখানে গড়ে ওঠেনি। এসব কারণে এবার চামড়া কেনাবেচা নিয়ে একটা সংকট দেখা দিয়েছে।’

কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে নতুন কিছু তথ্য। তথ্য মতে, চামড়াশিল্প সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, এবার কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সরকারকে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। আর এটা করা হয়েছে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারিপল্লী স্থানান্তর করতে মালিকদের বাধ্য করার প্রতিশোধ হিসেবে! ফলে চামড়া কিনতে সরকার ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার পরও কাজে লাগেনি। টাকার সংকট দেখিয়ে চামড়া কিনতে পারেনি বলে দাবি করছেন ট্যানারি মালিকরা। অথচ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে প্রায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে এ সময়ে। (কালের কণ্ঠ : ২৬-০৮-২০১৮)

গার্মেন্টের পর আমাদের অর্থনীতিতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত চামড়াশিল্প। চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শুধু জুতার চাহিদা ছয় হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে এককভাবে ৭৫ শতাংশ বাজার চীনের দখলে। আমাদের রপ্তানি তৃতীয়। রপ্তানি খাতে চামড়ার অবদান ৯ শতাংশেরও বেশি। ১৯৯০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত রপ্তানি আয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ সালে এ শিল্পে বার্ষিক গড় রপ্তানি আয় ছিল ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি থেকে আয় হয় ২২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয় ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি থেকে আয় হয় ২৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৭৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া ২০১২-১৫ রপ্তানি নীতিতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের তালিকায় রাখা হয়েছে।

কোরবানির চামড়া আমাদের দেশের সম্পদ। সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের দ্রুত বিকাশের স্বার্থে কোরবানির চামড়া নিয়ে অসাধু বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। দেশে চামড়ার দাম না পেলে চোরাই পথে এই চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। এতে ক্ষতি দেশেরই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোরবানির পশুর চামড়া গরিবের হক। এর অর্থ মেরে খেয়ে বিত্তবিলাস করা শুধু নৈতিক অপরাধই নয়, সমাজ ও ধর্মের দিক থেকেও এটি গর্হিত অপরাধ। এসব অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। চামড়া গরিবের হক। এ হক মেরে যারা ‘বড়লোক’ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, দুনিয়ার আদালতে হয়তো তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু পরকালের আদালতে তাদের রেহাই নেই। জাহান্নামই হবে তাদের শেষ ঠিকানা।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা। 



মন্তব্য