kalerkantho


হজযাত্রীদের কান্না কি এবারও থামবে না

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ১৮:০৬



হজযাত্রীদের কান্না কি এবারও থামবে না

পবিত্র হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)

ইসলামে হজ আদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, সর্বাধিক উত্তম আমল কোনটি? তিনি বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ঈমান আনা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, এরপর কোনটি? তিনি বলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বলেন, হজে মাবরুর বা মকবুল হজ।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ১৪২৯)

হজ মানুষকে পূতপবিত্র করে নতুন জীবনে ফিরিয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনোরূপ অশ্লীল কথা বা গুনাহর কাজে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হজ সম্পন্ন করে, সে সদ্যোভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১)

হজ ফরজ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে। এক. মুসলিম হওয়া। দুই. আকল থাকা। অর্থাৎ বিবেকবান হওয়া, পাগল না হওয়া। তিন. বালেগ হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। চার. আজাদ বা স্বাধীন হওয়া। অর্থাৎ কারো গোলাম বা দাস না হওয়া। পাঁচ.  দৈহিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া।

ধর্মীয় আবেগের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশের লাখো বিত্তশালী মানুষ পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরব গিয়ে থাকেন। এতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রতিবছরই হজযাত্রীরা অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে হজে যান; কিন্তু অশ্রুভেজা চোখে তাঁদের ফিরে আসতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাই যেন তাঁদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের একটি মন্ত্রণালয় থাকলেও কার্যত পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যায় না। আর পরিস্থিতির উন্নতিই বা হবে কিভাবে, যখন এই অব্যবস্থাপনার সঙ্গে খোদ ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জড়িত! আসলে পরকালের আদর্শবিচ্যুত ভোগবাদী সমাজে সব কিছুকে পণ্যই ভাবা হয়। ভাবা হয় ব্যবসা ও পুঁজি সংগ্রহের মাধ্যম। সে ধারাবাহিকতায় হজের ব্যবসা এ দেশে খুবই রমরমা। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চরম সুযোগ এটি! বাংলাদেশে সমাজব্যবস্থায় যেখানে সব জায়গায় দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে মন্ত্রণালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম; কিন্তু এ ব্যবসার সঙ্গে তো অসংখ্য ‘আলেম’ও জড়িত আছেন, তাঁদের কী হবে? সত্যিই চোর কখনো ধর্মের কাহিনি শোনে না।

প্রতিবছরই হাজারো হজপ্রত্যাশী হজে যেতে পারেন না। এর বিভিন্ন কারণ আছে—

এক. কোনো টাকা জমা না দিয়েই রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ থাকায় কিছু অসাধু এজেন্সি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতির এই আইনি সুযোগকে ব্যবহার করে নামে-বেনামে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করে হাজার হাজার কোটা দখল করে ফেলে। এই ভুয়া নামের স্থলে রিপ্লেসমেন্ট করে অন্যদের নাম ঢুকিয়ে মানবপাচারও করা হয়। ফলে একদিকে যেমন হাজার হাজার হজ গমনেচ্ছু ব্যক্তি বঞ্চিত হন, অন্যদিকে মানবপাচার করে বিপুল অর্থ উপার্জন করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায় কিছু মানুষ।

দুই. ২০১৬ সালে ই-হজ রেজিস্ট্রেশনে পাসপোর্টের তথ্যভাণ্ডার যুক্ত না থাকায় অনেক হজযাত্রী ভোগান্তিতে পড়েন। 

তিন. ঢাকার আশকোনা হজ কার্যালয়ে শুধু বাংলাদেশ বিমানের হজ ফ্লাইটের যাত্রীর ইমিগ্রেশনের কাজ হয়। কারণ সেখানে সৌদি এয়ারলাইনসের কোনো কাউন্টার নেই। তাদের ৬৩ হাজার হজযাত্রী মূল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন হয়ে সৌদি আরব যান। হজ কার্যালয়ের বিদ্যমান অবকাঠামো প্রশস্ত করলে তা লাখো হজযাত্রীর জন্য সহায়ক হবে।

চার. বাংলাদেশ থেকে ১৪ জুলাই এ বছরের হজ ফ্লাইট শুরু করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ফ্লাইট শুরুর মাত্র ৯ দিন বাকি থাকলেও এখনো ১৫ হাজার হজযাত্রীর জন্য টিকিট কেনেনি হজ এজেন্সিগুলো। বিমান বলছে, এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টিকিট সংগ্রহ না করলে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নতুন সময়সীমা দেবে না সৌদি আরব। এতে হজযাত্রীদের একটি অংশ সৌদি আরব যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিমান।

গত বছর বাংলাদেশ বিমানের শিডিউল বিপর্যয় বড় শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছিল। প্রথম দিকে বিমানে যাত্রীই পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। শেষ দিকে সৌদি আরব বিমানের জন্য অতিরিক্ত স্লট বরাদ্দ করায় কোনো রকমে পরিস্থিতি সামলানো গিয়েছিল। কিন্তু এ বছর তারা জানিয়ে দিয়েছে, কোনো অতিরিক্ত স্লট বরাদ্দ করা যাবে না। অথচ এখনো বিমানের প্রায় ১৪ হাজার টিকিট অবিক্রীত রয়ে গেছে। ফলে এ বছরও শেষ দিকে জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাঁচ. বাংলাদেশি হজযাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হজগাইড না থাকায় মিনা, মুজদালিফা ও আরাফায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় হাজিদের। লাখ লাখ লোকের ভিড়ে পর্যাপ্ত হজগাইড না থাকায় আরাফা, মুজদালিফা ও মিনায় অনেকে হারিয়ে যান একাধিকবার। একবার হারিয়ে গন্তব্যে যথাসময়ে পৌঁছতে না পেরে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতাই সম্পাদন করতে পারেন না অনেকে। তাঁদের হজ থেকে যায় অপূর্ণ। অন্যদিকে জেদ্দা বিমানবন্দরে নামার পর দেখা যায়, প্রত্যেক দেশের হাজিদের সে দেশের হজগাইডরা সাহায্য করছেন। কিন্তু একদিকে বাংলাদেশি হজগাইডের পরিমাণ খুবই কম, অন্যদিকে গাইডরাই অনভিজ্ঞ। ফলে জেদ্দা বিমানবন্দরে নামার পর দেখা যায় অন্য দেশের হজযাত্রীরা চলে গেছেন তাঁদের আবাসনে, কিন্তু বাংলাদেশি হজযাত্রীরা ঘোরাঘুরি করেন।

ছয়. প্রতিবছরই সরকার হজে প্রশাসনিক টিম পাঠিয়ে থাকে। হজ মিশনের লোকজনের মন্ত্রণালয়ের লোকেরা এই সুবিধা লুফে নেয়। কিন্তু এই টিমের লোকজন হজ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ হওয়ায় তাঁরাও  সেখানে গিয়ে হজযাত্রীদের জন্য তেমন কিছু করতে পারেন না। আমলাদের না পাঠিয়ে হজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমদের নেতৃত্বে হজ প্রশাসনিক টিম পাঠালে এর তদারকি জোরদার হবে।

সাত. হজে মিডিয়া টিম না থাকায় হজযাত্রীদের সমস্যা উঠে আসে না মিডিয়ায়। আমাদের দেশের হজযাত্রীদের খবরের জন্যও অন্য দেশের মিডিয়ার দারস্থ হতে হয়। বিদেশের মাটিতে লক্ষাধিক হজযাত্রীর খবরের জন্য আমাদের নিজেদের একটি মিডিয়া টিম পাঠানো প্রয়োজন। বিদেশে খেলাধুলা, আন্তর্জাতিক সেমিনার ইত্যাদির জন্য নিজেদের খরচে গণমাধ্যমের প্রতিনিধি পাঠানো হয়। অথচ হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে কোনো প্রতিনিধি পাঠানো হয় না। যদিও এক-দুটি মিডিয়া এর ব্যতিক্রম। তথাপি হজ নিয়ে সামষ্টিকভাবে মিডিয়ার এই উদাসীনতা মেনে নেওয়া যায় না। মিডিয়ার হজ কাবারেজ বরাবরই গতানুগতিক। অথচ হজ থেকে বাংলাদেশ বিমান বিশেষভাবে লাভবান হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে হজের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের মিডিয়ায় হজ গুরুত্বহীন। আসলে সদিচ্ছা থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাদের সহযোগিতায় প্রতিনিধি পাঠানো যায়। হতে পারে, হজে প্রতিনিধি না পাঠানোর পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ আছে, যা ইসলামবিদ্বেষ থেকে উৎসারিত।

আট.  প্রতিবছরই হজের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ হয় না। শত আইন করেও লাভ হবে না, যদি আইন প্রয়োগ না হয়।

নয়. প্রতিবছরই অসাধু এজেন্সিগুলোর তালিকা করা হয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কখনো কখনো কারো কারো লাইসেন্স বাতিল করার কথা উঠলে তাদের জন্য বিভিন্ন ফাঁকফোকর থাকে। ফলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ থাকে না। এসব চলতে দেওয়া যায় না। পবিত্র হজ নিয়ে এসব তামাশার শেষ কোথায়?

হজ ব্যবসা নিয়ে বর্তমানে যে অরাজকতা চলছে, এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। প্রয়োজনে হজ ব্যবস্থাপনা নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হোক।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা।



মন্তব্য