kalerkantho


অস্থির সমাজে স্বস্তির খোঁজে

আলী হাসান তৈয়ব   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৯:০২



অস্থির সমাজে স্বস্তির খোঁজে

নগরজীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ সকালে প্রাতরাশের সঙ্গে পত্রিকার পাতা ওল্টানো। মন ভালো করা সকালে আজকাল পত্রিকার পাতা ওল্টানোর অভ্যাসে অনেকে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ খবরের কাগজগুলো বের হচ্ছে যেন একগুচ্ছ অপরাধ আর দুঃসংবাদের বাহন হয়ে। প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠায় রঙিন ছবি আর মোটা হরফের শিরোনাম মানেই যেন ভীতির বার্তা। প্রতিদিন খুন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতনসহ নানাবিধ অনাচার-অবক্ষয়ের সংবাদ পড়তে পড়তে পাঠকের মন বিষিয়ে উঠেছে। ই-পেপারে ঢুকে যেকোনো পত্রিকার আর্কাইভ খুলে যদি আপনি গত এক মাসের পত্রিকার প্রথম ও শেষ পাতায় চোখ বুলান, দেখবেন খবরের ছবি, শিরোনাম ও স্থান-কালেরই কেবল পরিবর্তন ঘটেছে; চরিত্র ও ধরনে কোনো পরিবর্তন নেই। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে সবই অপরাধের খবর। অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগোচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়ছে। সার্বিকভাবে জনগণের জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে বৈকি। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক অঙ্গনে অশান্তি ও অস্থিরতাও বাড়ছে সমানতালে। শিক্ষার হার বাড়ছে, কমছে সততা। আপাত ভদ্রলোক বাড়ছে, কমছে নিখাদ ভালো মানুষ। জনসংখ্যা বাড়ছে, কমছে ‘মানুষ’। আইন কঠোর হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যও বাড়ছে; কমছে না অপরাধপ্রবণতা। রোজ অপরাধ দেখতে দেখতে অপরাধগুলোই যেন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

মিউজিকে মাত জাতির ভবিষ্যৎ

পৃথিবীতে এখন মুসলিমের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। অথচ মুসলমান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে করুণ অবস্থা অতিক্রম করছে। ভূগোলকের মানচিত্রে চোখ রাখলে দেখা যায় সবখানে মুসলমানের রক্তের ছাপ। এর অন্যতম কারণ জাতির চেতনাহীনতা। মুসলমানকে চেতনাহীন বানানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র অবৈধ গান ও গানসামগ্রী। গানবাজনার চরম উৎকর্ষকাল চলছে এখন। গান ও গায়কের, বাদ্য ও বাদকের এবং নাচ ও নর্তকের জালে বন্দি হয়ে পড়েছে পুরো উম্মাহ ও সমগ্র মানবজাতি। এসবে মুসলমানের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এতটাই বিভোর যে কোরআনের একাধিক সতর্কবার্তা ও হাদিসের বহুবিধ হুঁশিয়ারিতেও তাদের হুঁশ ফিরছে না। আজ দেশে সামাজিক যত অপরাধ নিত্য ঘটমান, এসবের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা অনৈতিক নাচ-গানের। আজকের তারুণ্য সত্যিকার তারকাদের দেখতে আগ্রহী নয়। জগতের সেরা বিজ্ঞানী, সেরা শিক্ষাবিদ, সেরা গবেষক, সেরা মানবসেবীকে দেখতে যায় না বিনা খরচেও। অথচ নৈতিক মূল্যবোধহীন শিল্পী, নর্তকী, অভিনেত্রীকে দেখতে পানির দরে টাকা ঢালে। কথিত তারকা দেখতে তাদের কী তোড়জোড়! এ আগুননেশার ঘোর না কাটাতে পারলে দেশ, জাতি ও উম্মাহর অবশিষ্ট সম্ভাবনাও মিলিয়ে যাবে।

গত কয়েক বছরে নাচ-গানের চর্চা অকল্পনীয় মাত্রায় বেড়েছে। যে দেশে শিক্ষা-গবেষণা ও সুনাগরিক তৈরিতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই, সেখানে চরিত্রবিধ্বংসী নাচ-গানের পেছনে অনুদান বা বিনিয়োগ তথা আগ্রহের অন্ত নেই। যে দেশে রোজই চিকিৎসার অর্থ না পেয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহর গোনা অসহায় মানুষের করুণ মুখ পত্রিকায় ছাপা হয়, সে দেশেরই বহুজাতিক কম্পানি ও বড় ব্যবসায়িক ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের উপার্জিত অর্থের অনেকটাই ঢালে নৃত্য ও সংগীতের পেছনে! এখনো যে দেশের বিরাটসংখ্যক মানুষের বাস দারিদ্র্যসীমার নিচে, আজও যারা পেটের আগুন নেভাতে গিয়ে নিজের ইমান পর্যন্ত বিকিয়ে দিতে বাধ্য হয়, সে দেশেরই একশ্রেণির নাগরিক নির্দ্বিধায় পঞ্চাশ হাজার টাকায় কেনে এক সন্ধ্যার কনসার্টের টিকিট! যে মুসলিম দেশটিতে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়, সেখানে আবার অনেক কিন্ডারগার্টেনে নিষ্পাপ শিশুদের নৃত্য ও সংগীত শেখা বাধ্যতামূলক!

মিডিয়ার অকল্পনীয় উন্নতির সুবাদে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই মাতাল আজ এসব আয়োজনকে ঘিরে। দুঃখজনক সত্য হলো- এসবে শুধু তরুণ প্রজন্মই মাতে নেই, মেতে আছে একশ্রেণির অপরিণামদর্শী অভিভাবক মহলও। নাচ-গান শেখানোর পেছনে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ যদি তাঁরা না ঢালেন, তবে তো নৃত্য-সংগীতের স্কুলগুলো এত রমরমা ব্যবসা করতে পারে না। ইদানীং বিশ্বে অনেক কিছু নিয়েই জরিপ চালানো হয়। নাচ-গানে বিনিয়োগ-আত্মনিয়োগ নিয়ে যদি কোনো জরিপ পরিচালিত হয় তবে বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের নাম যে ওই তালিকার অন্যতম শীর্ষস্থানে থাকবে তাতে সন্দেহের কিছু নেই।

এত সব আয়োজন ও আয়োজকের বদান্যতায় এ জাতি এতটাই মেতেছে যে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষ কোনো শ্রেণির মানুষই গানের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে বসে থাকছে না। আর সে জোয়ারেই ভেসে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের নীতি-আদর্শ ও কাম্য সচ্চরিত্র। যে ইভ টিজিং, ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের ব্যাপক বৃদ্ধিতে এ দেশের চিরসবুজ শান্তির নিবাসগুলোতে জ্বলছে অশান্তির আগুন তার অনেকখানি দায় এসব নাচ-গানকেন্দ্রিক আয়োজনের। অবৈধ ভালোবাসা আর ভোগ জীবনের আহ্বানে সদা সরব এসব গান কাউকে স্বস্তি দিচ্ছে না। বরং তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে পাপের আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে।

গানের নিন্দা করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘একশ্রেণির লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। ‘ (সুরা লুকমান : ৬) অনৈতিক নাচ-গান ও নেশার ঘোরের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমণীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাদের মাটিতে ধসিয়ে দেবেন। ‘ (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৬৭৫৮) তিনি আরো বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে। ‘ (বুখারি : ৫৫৯০) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, ‘পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে, তেমনি গান মানুষের অন্তরে মুনাফেকি সৃষ্টি করে। ‘ (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসিরে কুরতুবি ১৪/৫২)

মারণনেশা ও মাদকাসক্তি

সাম্প্রতিককালের আরেক সামাজিক সমস্যা মাদক। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মাদক ও পাপাসক্তির বিস্তার প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ইয়াবার মতো নিত্যনতুন নামে তরুণ-তরুণীরা নেশার জালে আটকা পড়ছে। হাজার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনেও নেশার ছোবল থেকে এদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। সমাজের সবচেয়ে নিম্ন ও সবচেয়ে উচ্চস্তরের ছেলেমেয়েরাই বেশি জড়াচ্ছে এ অপরাধে। এদের হাতেই রোজ খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। মাদকের ছোবলে ঘর ভাঙছে। পরিবারে আগুন লাগছে। ছেলের হাতে জন্মদাতা মা-বাবা ও প্রিয়তম স্ত্রী থেকে নিয়ে নিজ সন্তান পর্যন্ত খুন হচ্ছে। এসবই মাদকের স্বাভাবিক প্রতিফল। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো- যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনো কি নিবৃত্ত হবে?’ (সুরা মায়িদা : ৯০-৯১)

বস্তুত পরকাল ভাবনা মানুষের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের ভেতরের সুপ্রবৃত্তি ও সদগুণাবলি জাগিয়ে তোলে। আর নাচ-গান ও মাদক আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়। মানুষের সুকুমার বৃত্তির ওপর পর্দা ফেলে ক্ষণিকের বস্তুতে মজিয়ে রাখে। যার মধ্যে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় কিংবা পরকালের ভাবনা কাজ করে না, তাকে আইন দিয়ে নিবৃত্ত রাখা কঠিন। তাই সামাজিক সব অপরাধ দমনে অন্য সব উদ্যোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি জরুরি নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা। সবার ভেতর ধর্মীয় অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়া। পরিতাপের বিষয়, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে যখন সমাজ ধুঁকছে ও ভুগছে, তখন মুক্তমত ও বিজ্ঞানচর্চার নামে কিছু তরুণ ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতায় মেতে উঠছে। এদের অযৌক্তিক, অজ্ঞতাপ্রসূত ও একচোখা সমালোচনামূলক লেখালেখির ফলেও মাঝেমধ্যে অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে। রাষ্ট্রকে তাই শুধু ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে হবে না, রাষ্ট্রের স্থিতির জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী বলয়ের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তখন কারো জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না, সুযোগও থাকবে না।

লেখক : খতিব, আন-নুর জামে মসজিদ, টঙ্গী, গাজীপুর


মন্তব্য