kalerkantho


গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম

আবু আমিন   

২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ২০:৪৭



গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম

পৃথিবীর সব মানুষ সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যে এক হলেও সামাজিক বিভাজন মানুষকে বিভক্ত করে রেখেছে বহু ভাগে। বংশ, বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণি, পেশা-বিভক্তির কত যে ধরন তার হিসাব মেলানো ভার।

তবে অর্থনৈতিক বিভাজনটিই মানবসমাজে সবচেয়ে মারাত্মক আকারে বিরাজ করছে সেই আদিকাল থেকে। ধনী আর দরিদ্র যেন প্রভু আর ভৃত্য হয়েই পৃথিবীতে আগমন করেছে। প্রাচীনকালের দাস-দাসীপ্রথা ইসলামের কল্যাণে মানবসমাজ থেকে বিদায় নিলেও সম্পদশালীদের নিগ্রহ থেকে গরিব মানুষের মুক্তি মেলেনি আজও। দরিদ্র জনগোষ্ঠী পেটের জ্বালায় ধনিক শ্রেণির যাবতীয় কায়কারবার আঞ্জাম দেয় কায়িক শ্রমের মাধ্যমে দুমুঠো খাবার জোগাড় করার তাগিদে। কাজের ধরনানুসারে এদের একেকজন একেক অভিধায় পরিচিত। গৃহকর্মী যারা, তারা কাজের বেটা-কাজের বেটি, চাকর-চাকরানি, আয়া, বুয়া, ঝি ইত্যাদি যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, তাদের অবস্থা বড়ই সঙ্গিন আমাদের সমাজে। বিত্তবানদের দৈনন্দিন জীবনে বিলাসিতার যাবতীয় বিষয়ের আঞ্জাম দিতে হয় তাদেরই। বাজার করা, খাবার তৈরি, খাবার পরিবেশন, এঁটো থালা-বাসন মাজা, ঘরদোর পরিষ্কার করা, কাপড় কাচা-হেন কাজ নেই যা তাদের করতে হয় না। অথচ তিন বেলা সম্মানজনকভাবে চারটি খাবার তাদের কপালে জোটে না। বেতন বা পারিশ্রমিকের কথা না হয় বাদই দিলাম। উপরন্তু ভদ্রবেশীর অশ্রাব্য গালি তাদের হজম করতে হয় আশীর্বাদ হিসেবেই। গৃহকর্মীদের ওপর গৃহকর্তার শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, যা একটি জাতির হীনতাকেই স্পষ্ট করে তোলে বিশ্বদরবারে। ৯০ শতাংশের ওপরে মুসলমান যে দেশে বাস করে, সে দেশের এমন অবস্থা মুসলিম পরিচয়টিকেই বিদ্ধ করে বইকি! অথচ ইসলাম এসেছে দরিদ্র মানুষের কাঁধে চড়ে আর মহান আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাত লাভের বড় মাধ্যমও ওই দরিদ্র জনগোষ্ঠী। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতে গিয়ে বলেন : হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দান করুন এবং মিসকিনদের দলের সঙ্গে আমার হাশর করুন। ’ তখন হজরত আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল কেন? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! মিসকিনরা ধনীদের থেকে ৪০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা! তুমি কোনো মিসকিনকে আমার দরজা থেকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। অন্তত একটি খেজুরের টুকরা হলেও তাদের দিয়ো। হে আয়েশা! মিসকিনদের ভালোবেসে তাদের নিজের কাছে স্থান দিয়ো। তাহলে আল্লাহ কাল কিয়ামতের দিন তোমাকে নিজের কাছে স্থান দান করবেন। (তিরমিজি-ইবনে মাজাহ)গৃহকর্মীদের অধিকার

(ক) সুন্দর নামের অধিকার : প্রতিটি মানবসন্তানের জন্মের পর তার মা-বাবা আদর করে নাম রাখেন। তাই তার অধিকারের অন্যতম একটি হলো তাকে তার নামেই ডাকা হবে। কিন্তু গৃহকর্মীদের যেন সে অধিকারটুকু নেই। তাদের নাম বাদ দিয়ে কাইল্যা, ধইল্যা, বুয়া, বেটি ইত্যাদি ও নামের বিকৃত উচ্চারণে ডাকা হয়, যা তাদের অধিকারের পরিপন্থী এবং তাদের প্রতি চরম উপহাসের শামিল। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অন্য কোনো পুরুষকে উপহাস না করে। কেননা হতে পারে উপহাসকারী অপেক্ষা সে উত্তম। আর কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে। কেননা হতে পারে উপহাসকারিণী অপেক্ষা সে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ কোরো না এবং মন্দ নামে ডেকো না। কেউ ইমান আনার পর কাউকে মন্দ নামে ডাকা গুনাহর কাজ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা করে না, তারাই জালেম। ’ (সুরা আল হুজুরাত : ১১)

(খ) খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা লাভের অধিকার : গৃহকর্মীরা বাড়ির সব সদস্যের খাবার শেষে তাদের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করবে, গৃকর্তার ছেলেমেয়ের কাপড় বাতিল হয়ে গেলে সেটি তারা পরবে, আর সিঁড়িঘর বা রান্নাঘর অথবা দরজার এক  কোণে মেঝেতে মাদুর পেতে তারা শোবে, অসুখ-বিসুখ হলে ধুঁকে ধুঁকে মরবে-এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইসলামের বিধান হলো, বাড়ির অন্য সদস্যের মতো তাদের বেলায়ও একই ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, তোমরা অধীনস্থ ভৃত্য ও মজুরদের সম্পর্কে সাবধান থাকবে! তোমরা যা খাবে তাদেরও তা-ই খেতে দেবে আর তোমরা যেমন পোশাক পরবে, তাদেরও তেমন পোশাক পরতে দেবে। (সহিহ বুখারি)

(গ) শিক্ষা লাভের অধিকার : যে মানুষটি দৈনিক গৃহস্বামীর ছেলেমেয়ের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যায়, অথচ তার ও তার সন্তানদের শিক্ষাগ্রহণের ন্যূনতম সুযোগ দেওয়া হয় না। দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা গ্রহণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেয়ে বড় জুলুম আর কিছুই হতে পারে না।

(ঘ) উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অধিকার : নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হলো অধীনস্থদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার যাবতীয় ব্যবস্থা করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : কিয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির মানুষের বিবাদী হব। (ক) ওই ব্যক্তি, যে আমার নামে প্রতিজ্ঞা করার পর তা ভঙ্গ করে। (খ) ওই ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে। (গ) ওই ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার কাছ থেকে কাজ পুরোপুরি আদায় করে নেয়; কিন্তু তার পারিশ্রমিক ঠিকমতো দেয় না। (সহিহ বুখারি)

মানুষের জীবনের প্রয়োজনেই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার উদ্ভব। দরিদ্র মানুষরা আর্থিক প্রয়োজনে ধনীদের দ্বারস্থ হয়; কিন্তু ধনীদের জীবনের একটি প্রহরও চলতে পারে না গরিব মানুষের সহযোগিতা ছাড়া। এই যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, এটিই সামাজিক বন্ধন।   আর এ বন্ধনটি যদি আন্তরিকতা ও মানবিক বোধের দ্বারা সংরক্ষিত হয়, তাহলেই সামাজিক শান্তি স্থায়ী রূপ পায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও শ্রেণিতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিতি অর্জন করতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ-সব কিছুর খবর রাখেন। ’ (সুরা আল-হুজুরাত : ১৩)

লেখক : ধর্মীয় গবেষক


মন্তব্য